ফ্রান্স ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনতে দিনরাত কাজ করছেন হাজারো দমকলকর্মী। কিন্তু নতুন করে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়া এবং বাতাসের পরিবর্তিত গতিপ্রকৃতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বোর্দো শহরের উপকণ্ঠে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, চলতি সপ্তাহজুড়ে বৃষ্টির সম্ভাবনা খুবই কম থাকায় দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
ফ্রান্স
ফ্রান্সের গিরন্দ (Gironde) অঞ্চলে চলমান দাবানল ইতোমধ্যে প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর এলাকা পুড়িয়ে দিয়েছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটির অন্যতম বড় অগ্নিকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আগুন এখন বোর্দো শহরের দক্ষিণে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। সামান্য বৃষ্টি ও বাতাসের গতি কমে যাওয়ায় রাতের দিকে আগুনের বিস্তার কিছুটা ধীর হলেও পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ফরাসি আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সপ্তাহের মাঝামাঝি পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে। কোথাও কোথাও ৪০ ডিগ্রিরও বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উচ্চচাপ বলয়ের কারণে শুষ্ক আবহাওয়া বজায় থাকবে এবং বিচ্ছিন্ন কিছু বজ্রবৃষ্টি হলেও তা দাবানল নিয়ন্ত্রণে তেমন ভূমিকা রাখতে পারবে না। বাতাসের দিক পরিবর্তনের কারণে আগুন নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি মন্ত্রিসভার বৈঠক করেছেন। স্থানীয় প্রশাসন পর্যটকদের গিরন্দ অঞ্চলে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্প, স্কাউট ক্যাম্প এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আবাসিক ক্যাম্প সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
দাবানলের কারণে ফ্রান্সে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অনেকেই খেলাধুলার স্টেডিয়াম, প্রদর্শনী কেন্দ্র এবং অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। বোর্দো শহরে ঘন ধোঁয়ার চাদরে আকাশ ঢেকে যাওয়ায় অনেক বাসিন্দা মাস্ক ব্যবহার শুরু করেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে এবং মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে।
ফ্রান্সের জাতীয় দমকল বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডেভিড অ্যানোটেল জানিয়েছেন, আগুনের তীব্রতা কমলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। নতুন তাপপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আবারও আগুনের জন্য অনুকূল করে তুলছে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
দাবানল মোকাবিলায় ফ্রান্সে বিশেষায়িত বিমান ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব বিমান থেকে আগুন প্রতিরোধক রাসায়নিক (ফায়ার রিটার্ড্যান্ট) ছিটিয়ে আগুনের বিস্তার কমানোর চেষ্টা চলছে। এই রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের দহনপ্রক্রিয়া ধীর করে আগুনের অগ্রগতি কমায়। পাশাপাশি লালচে রঙের এই পদার্থ কয়েকদিন দৃশ্যমান থাকায় পাইলট ও দমকলকর্মীদের জন্য আক্রান্ত এলাকা শনাক্ত করতেও সহায়ক ভূমিকা রাখে।

স্পেন
স্পেনেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলের দাবানল এখনও ‘সক্রিয় ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। যদিও রাজধানীর দিকে আগুনের অগ্রগতি কিছুটা ধীর হয়েছে, তবুও স্থানীয় প্রশাসন বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে। মাদ্রিদ অঞ্চলের আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট ইসাবেল দিয়াজ আয়ুসো আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত দমকলকর্মীদের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন।
মাদ্রিদ, আভিলা ও তোলেদো অঞ্চলে দাবানলে প্রায় ৭৭ হাজার হেক্টর এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব এলাকা থেকে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় সান মার্টিন দে ভালদেইগলেসিয়াস এলাকার কিছু বয়স্ক বাসিন্দাকে বাড়ি ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সীমিত সময়ের জন্য খামারের পশুদের খাবার দেওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু এলাকায় প্রবেশের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।
স্পেনের পূর্বাঞ্চলীয় ভ্যালেন্সিয়ার উপকূলীয় ভাল দ'উইশো এলাকায় নতুন করে আরেকটি বড় দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। এতে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে এবং প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনে আবহাওয়া আরো প্রতিকূল হয়ে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভয়াবহ দাবানল কখনও কখনও নিজস্ব আবহাওয়াও তৈরি করতে পারে। বোর্দোর আগুনে তৈরি হওয়া বিশাল ‘পাইরোকিউমুলোনিম্বাস’ মেঘ এরই একটি উদাহরণ। আগুনের তীব্র তাপে গরম বাতাস দ্রুত ওপরে উঠে ধোঁয়া, ছাই ও জলীয়বাষ্প বহন করে বজ্রগর্ভ মেঘ সৃষ্টি করে। এই মেঘ থেকে বজ্রপাত হলে নতুন করে আরও দাবানল সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একই সঙ্গে এসব মেঘের ভেতরের অনিয়ন্ত্রিত বাতাস আগুনকে বিভিন্ন দিকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, সপ্তাহজুড়ে ফ্রান্স ও স্পেনের অধিকাংশ অঞ্চলে শুষ্ক ও গরম আবহাওয়া অব্যাহত থাকবে। ফলে দাবানল দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসার সম্ভাবনা কম। তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে ইউরোপের এই দুই দেশে মানবিক ও পরিবেশগত সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









