মস্কোয় রুশ সংবাদপত্র নোভায়া গাজেতার কার্যালয়ে এখন নীরবতা। একসময় যে কার্যালয় ছিল রাশিয়ার স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র, সেখানে এখন শূন্যতার ছাপ।
নোভায়া গাজেতার সাবেক প্রধান সম্পাদক দিমিত্রি মুরাতভ বলেন, ‘এখন আর কোনো সংবাদপত্র নেই।’ ৬৪ বছর বয়সী মুরাতভ তিন দশকের বেশি আগে নোভায়া গাজেতা প্রতিষ্ঠা করেন। মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি ও সরকারের নানা অনিয়ম নিয়ে সাহসী প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য পত্রিকাটি পরিচিত হয়ে ওঠে।
২০২১ সালে সাংবাদিকতার মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় অবদানের জন্য মুরাতভ যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। নোবেল কমিটি তখন নোভায়া গাজেতার সাংবাদিকদের সাহসী ভূমিকার কথা উল্লেখ করে। পত্রিকাটির ছয় সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাংবাদিক আন্না পলিতকভস্কায়া, যিনি চেচনিয়া যুদ্ধ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছিলেন।
নোবেল পুরস্কারও পত্রিকাটিকে রক্ষা করতে পারেনি। মুরাতভের ভাষ্য, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি ডিক্রি জারি করেন। এরপর পত্রিকাটির ছাপাখানা জাতীয়করণ করা হয় এবং এর নিবন্ধন বাতিল করা হয়।
নোভায়া গাজেতার অনলাইন কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে রাশিয়ায় পত্রিকাটির ওয়েবসাইটে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দেশের বাইরে থেকে অথবা ভিপিএনের মাধ্যমে ওয়েবসাইটটি দেখা যায়।
ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরুর পর দেশটিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর দমন-পীড়ন আরও বেড়েছে বলে মনে করেন মুরাতভ। তাঁর ভাষ্য, অনেক পরিচিত মতামত-নির্মাতাকে ‘বিদেশি এজেন্ট’, ‘চরমপন্থী’ বা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মুরাতভ বলেন, ‘রক্ষণশীল হিসাবেও ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ায় রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে অন্তত ১ হাজার ৫০০ মানুষ এখন কারাগারে আছেন। তাঁর দাবি, সোভিয়েত ইউনিয়নের কেজিবির কঠোর সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় তিন গুণ।’
সোভিয়েত আমলের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনাও টেনেছেন মুরাতভ। ১৯৭৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণের ভাষণে সোভিয়েত ভিন্নমতাবলম্বী আন্দ্রেই শাখারভ ১২০ জনের বেশি রাজনৈতিক বন্দীর নাম উল্লেখ করেছিলেন। পরে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নে বিবেকের কারণে বন্দী মানুষের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছিল।

‘এ যুদ্ধের কোনো বিজয় নেই’
২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ হামলা শুরুর সময় পুতিন এটিকে রাশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। রুশ প্রেসিডেন্ট এখনো যুদ্ধে বিজয়ের প্রত্যাশার কথা বলেন।
তবে মুরাতভ মনে করেন, এই যুদ্ধে রাশিয়ার কোনো বিজয় হতে পারে না।
তিনি বলেন, ‘বিজয় বলে কিছু হবে না। প্রায় পাঁচ বছর ধরে যা চলছে, এর পরিণতি যা-ই হোক না কেন, এটিকে আর বিজয় বলা যাবে না।’
মুরাতভের মতে, দুই স্লাভ জাতির মধ্যে যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছেন। তার ভাষায়, ‘যখন দুই স্লাভ জাতি একে অপরকে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে, তখন এটিকে বিজয় বলা যায় না।’
ইউক্রেনের বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, দেশটিকে ধ্বংস করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু জয় করা সম্ভব নয়। তাঁর আশঙ্কা, সংঘাত আরও বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
পুতিন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন?
পুতিন সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন কি না—এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে চাননি মুরাতভ। তিনি বলেন, পুতিনের মাথায় কী চলছে, তা কেউ জানে না। যারা নিশ্চিতভাবে দাবি করেন যে পুতিন কী ভাবছেন বা কী করতে ভয় পাচ্ছেন, তাদের ‘ভণ্ড’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মুরাতভ বলেন, তিনি একজন সাংবাদিক হিসেবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং বড় পরিসরের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তাঁর দাবি, বছরের শুরু থেকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার কথা ৫০০ বারের বেশি বলা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। এমনকি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় আয়োজনে অনুষ্ঠিত সেন্ট পিটার্সবার্গ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামেও একজন বক্তা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পক্ষে কথা বলেছেন বলে দাবি করেন মুরাতভ।
তার মতে, এসব বক্তব্যকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, রাশিয়ায় রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম ও গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের মতো বিষয় প্রকাশ্যে আলোচিত হচ্ছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেওয়ার সময় পুতিন বলেছিলেন, রাশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। প্রায় পাঁচ বছর পর সেই যুদ্ধই রাশিয়ার রাজনীতি, সংবাদমাধ্যম ও সমাজে গভীর পরিবর্তন এনেছে। মুরাতভের চোখে, এই দীর্ঘ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় পরাজয় হলো মানুষের জীবন ও স্বাধীনতার ক্ষতি।
সূত্র: বিবিসি


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









