শিশুরা যে জায়গায় শেখে, খেলে এবং বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে, সেই অনলাইন জগতই অনেক সময় তাদের জন্য হয়ে উঠছে ভয় ও নির্যাতনের জায়গা। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের নতুন এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই উদ্বেগজনক চিত্র। সংস্থাটি বলছে, ২১টি দেশে প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি শিশু অনলাইনে যৌন নির্যাতন বা শোষণের শিকার হয়।
১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনে একজনের বেশি কোনো না কোনোভাবে অনলাইনে যৌন হয়রানি বা শোষণের মুখোমুখি হয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ২১টি দেশের প্রায় ২১ হাজার ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুর ওপর জরিপ চালিয়ে এই তথ্য পাওয়া গেছে। নির্যাতনের অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ১০০ তরুণের সঙ্গেও বিস্তারিত কথা বলেছেন গবেষকেরা।
নির্যাতন শুরু হয় একটি বার্তা থেকেই
অনলাইনে নির্যাতনের ঘটনা অনেক সময় খুব সাধারণভাবেই শুরু হয়—একটি বন্ধুত্বের অনুরোধ, একটি বার্তা কিংবা একটি মন্তব্য দিয়ে। এরপর ধীরে ধীরে অপরাধীরা শিশুর ব্যক্তিগত জীবনে ঢুকে পড়ে।
ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে অপরাধীরা শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে। এরপর যৌন কথা বলা, ব্যক্তিগত ছবি চাওয়া, ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো কিংবা ব্ল্যাকমেইলের মতো ঘটনা ঘটে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ শতাংশের বেশি নির্যাতনের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটেছে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম এসব ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হল—শিশুরা কথা বলে না
অনলাইনে নির্যাতনের শিকার হলেও অধিকাংশ শিশু কাউকে কিছু জানায় না। পুলিশ, সমাজকর্মী বা সহায়তা কেন্দ্রে জানানো হয় ১ শতাংশেরও কম ঘটনা। চারটির বেশি ঘটনার মধ্যে একটি শিশুই কাউকে কিছু বলে না।
কেন?
কারণ অনেক শিশু জানে না, কোথায় গেলে সাহায্য পাওয়া যাবে। কেউ ভয় পায় পরিবার বা সমাজের প্রতিক্রিয়াকে। কেউ লজ্জায় চুপ থাকে। আবার কেউ বুঝতেই পারে না যে তার সঙ্গে যা ঘটছে, সেটি নির্যাতন।
বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে ‘সম্মান’ ও সামাজিক লজ্জার ভয় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ছেলেদেরও বলা হয়, শক্ত হতে হবে, নিজের সমস্যা নিজেকেই সামলাতে হবে। ফলে দুই ক্ষেত্রেই নীরবতা অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে।
কোটি কোটি শিশুর অনিচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন কনটেন্ট
ইউনিসেফের হিসাবে, গবেষণার সময়কালে ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি শিশু অনিচ্ছাকৃত যৌন কনটেন্টের মুখোমুখি হয়েছে প্রায় ৯০ লাখ শিশুকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন বিষয়ে কথা বলতে বা যৌন ছবি পাঠাতে বলা হয়েছে। প্রায় ৪০ লাখ শিশুর যৌন ছবি তাদের অনুমতি ছাড়াই ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই সংখ্যাগুলো শুধু সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন শিশু—যে হয়তো ভয় পেয়েছে, কেঁদেছে, নিজের ওপর দোষ চাপিয়েছে কিংবা কাউকে কিছু বলতে পারেনি।

অনলাইন নির্যাতনের ক্ষত অনলাইনে থাকে না
একটি ছবি মুছে ফেললেই সব শেষ হয়ে যায় না। একটি বার্তা বন্ধ করলেই ভয় শেষ হয় না। ইউনিসেফ বলছে, অনলাইনে যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুরা অন্য শিশুদের তুলনায় আত্মহত্যার চিন্তা ও আত্মক্ষতির ঝুঁকিতে প্রায় চার গুণ বেশি থাকে। তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও মানসিক চাপও বেশি দেখা যায়।
মেক্সিকো ও উত্তর মেসিডোনিয়ায় নির্যাতনের শিকার শিশুদের আত্মহত্যার চিন্তা বা এ ধরনের আচরণের ঝুঁকি আট গুণেরও বেশি ছিল। পাকিস্তানে আত্মক্ষতির ঝুঁকি ছিল গড়ের তুলনায় সাত গুণের বেশি।
অর্থাৎ, নির্যাতনটি অনলাইনে শুরু হলেও তার ক্ষত থেকে যায় শিশুর বাস্তব জীবনে—তার পড়াশোনায়, পরিবারে, বন্ধুত্বে এবং নিজের সম্পর্কে ধারণায়।
শিশুদেরই কেন নিজেদের রক্ষা করতে হবে?
ইউনিসেফ বলছে, শিশুদের নিরাপত্তার পুরো দায়িত্ব শিশুদের কাঁধে তুলে দেওয়া ঠিক নয়। একটি শিশু কীভাবে অপরাধীকে চিনবে, কখন তাকে ব্লক করবে, কীভাবে প্রমাণ সংরক্ষণ করবে বা কোথায় অভিযোগ করবে—এসব জানা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি অনলাইন ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে অপরাধীর জন্য শিশুকে টার্গেট করা কঠিন হবে।
সরকার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী বয়স যাচাই ব্যবস্থা, নিরাপদ গোপনীয়তা সেটিংস, অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণের সুযোগ এবং দ্রুত অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। কারণ শিশুকে বলা সহজ—‘সাবধানে থাকো’। কিন্তু যে প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন কোটি কোটি শিশু সময় কাটায়, সেটিকে নিরাপদ করা বড়দের দায়িত্ব।
নিরাপদ ইন্টারনেট বিলাসিতা নয়
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেছেন, কোটি কোটি শিশু এমন অনলাইন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা তাদের গভীর মানসিক কষ্ট দিচ্ছে। অনেক শিশু জানে না কোথায় সাহায্য চাইবে। এই বাস্তবতা আমাদের একটি সহজ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—শিশুদের কি এমন একটি ইন্টারনেট পাওয়ার অধিকার নেই, যেখানে তারা ভয় না পেয়ে শিখতে, খেলতে এবং বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে পারে?
শিশুদের কণ্ঠস্বর যেন শুধু তাদের বিপদের সময় শোনা না হয়। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পরিবার, স্কুল, সরকার এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান—সবার।
কারণ অনলাইনে একটি শিশুকে রক্ষা করা শুধু প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়। এটি তার মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









