৬ সেপ্টেম্বরের সকালটা অন্য সব সকালের মতোই ছিল। ঢাকার রাস্তায় মানুষ বেরিয়েছিল কাজে, দোকানের ঝাঁপ উঠেছিল, বাস ছুটেছিল নিজের গন্তব্যে। সিনেমাপ্রেমীদের কেউ হয়তো আগের রাতের কোনো সিনেমার কথা ভাবছিলেন, কেউ হয়তো পরের শুক্রবার প্রেক্ষাগৃহে কোন ছবি দেখবেন তা ঠিক করছিলেন।
কেউ জানত না, সেদিন বাংলাদেশের সিনেমার আকাশ থেকে এমন একজন মানুষ হারিয়ে যাবেন, যাকে হারানোর পরও দর্শক তাকে ভুলতে পারবে না।
সালমান শাহ।
নামটি উচ্চারণ করলেই নব্বইয়ের দশকের একটি মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একটু এলোমেলো চুল, চোখে সানগ্লাস, পরনে জিনস-শার্ট, ঠোঁটে অল্প হাসি। যেন পাশের বাড়ির সেই ছেলেটি, যে হঠাৎ সিনেমার পর্দায় উঠে এসে নায়ক হয়ে গেছে।
১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দিয়ে তার যাত্রা শুরু। তারপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ২৭টি সিনেমা। মৌসুমী, শাবনূরসহ জনপ্রিয় নায়িকাদের সঙ্গে জুটি। ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘তোমাকে চাই’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘বুকের ভিতর আগুন’—সিনেমাগুলো তখন শুধু সিনেমা ছিল না; তরুণ-তরুণীদের জীবনের অংশ ছিল।
সালমানের সবচেয়ে কৃতিত্ব ছিল, তিনি শুধু নায়ক হননি—নায়ক হওয়ার ধারণাটাই বদলে দিয়েছিলেন।
তার আগে নায়ক মানেই ছিল অনেকটা দূরের মানুষ। সালমান সেই দূরত্ব কমিয়ে দিলেন। তিনি প্রেম করতেন, অভিমান করতেন, কষ্ট পেতেন, গান গাইতেন। তার পোশাক ছিল আধুনিক, আচরণ ছিল স্বাভাবিক। তরুণেরা তাকে দেখত আর ভাবত—এই ছেলেটি তো আমাদেরই একজন।
তাই সালমান শাহ যখন চলে গেলেন, তখন শুধু একটি পরিবার একজন সন্তানকে হারায়নি। একটি প্রজন্ম হারিয়েছিল তাদের স্বপ্নের মানুষটিকে। তাদের স্বপ্নের নায়কে।

তারপর একদিন নায়ক আর ফিরলেন না
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে ঢাকার ইস্কাটনের বাসায় তার মৃত্যু হয়। সেদিন থেকে একটি প্রশ্ন বাংলাদেশের মানুষের মনে ঘুরতে শুরু করে—কীভাবে মারা গেলেন সালমান শাহ? প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা হয়েছিল। পরে তার পরিবার মৃত্যুকে হত্যা হিসেবে তদন্তের দাবি তোলে। সেই দাবির পর শুরু হয় এমন এক দীর্ঘ যাত্রা, যার শেষ ৩০ বছর পরও দেখা যায়নি।
১৯৯৭ সালে সিআইডি তদন্ত করে জানায়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। পরিবার মানল না। ২০০৩ সালে আদালত বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিল। প্রায় এক দশক পর, ২০১৪ সালে সেই তদন্তের প্রতিবেদন এল। সেখানেও মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হলো। পরিবার আবারও আপত্তি জানাল। ২০১৫ সালে সালমানের মা নীলা চৌধুরী নারাজি আবেদন করলেন। এরপর ২০১৬ সালে তদন্তের দায়িত্ব পেল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—পিবিআই।
একটি মানুষের মৃত্যুর উত্তর খুঁজতে ততদিনে গেছে ২০ বছর।
৬০০ পৃষ্ঠার উত্তর, তবু প্রশ্ন রয়ে গেল
২০২০ সালে পিবিআই প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিল। সিদ্ধান্ত আবারও একই—সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন। প্রতিবেদনে পারিবারিক টানাপোড়েন ও ব্যক্তিগত বিষয়কে মৃত্যুর পেছনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু পরিবারের কাছে সেটি উত্তর ছিল না। শাবনূরকে ঘিরে সালমানের সঙ্গে সম্পর্কের যে আলোচনা তদন্ত প্রতিবেদনে আসে, তিনিও তা প্রত্যাখ্যান করেন। তার বক্তব্য ছিল, সালমান তাঁর সহকর্মী ও বন্ধু ছিলেন; তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্কের অভিযোগ সত্য নয়। ২০২১ সালে আদালত পিবিআইয়ের প্রতিবেদন গ্রহণ করে। আইনের খাতায় যেন একটি অধ্যায় শেষ হয়ে গেল।
কিন্তু মানুষের মনে প্রশ্ন থেকেই গেল। সেখানে গল্পটা শেষ হলো না। কারণ সালমান শাহকে মানুষ শুধু নায়ক হিসেবে দেখেনি। সালমানের মৃত্যুর পরও তার সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। দর্শক প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে তাকে দেখেছে। এমন এক সময়ে, যখন সবাই জানত মানুষটি আর নেই। এটি ছিল এক অদ্ভুত অনুভূতি।
পর্দায় সালমান হাসছেন। প্রেম করছেন। গান গাইছেন। দৌড়ে যাচ্ছেন। অথচ পর্দার বাইরে তিনি আর নেই। সম্ভবত এখানেই তার জনপ্রিয়তার রহস্যের একটা অংশ লুকিয়ে আছে। তিনি চলে যাওয়ার পর তার বয়স আর বাড়েনি। তার মুখে বয়সের রেখা পড়েনি। তিনি বুড়িয়ে যাননি। তার অভিনয়ের ভুলগুলো নতুন করে চোখে পড়েনি। তিনি চিরকাল থেকে গেলেন সেই তরুণ সালমান হয়ে। একজন তারকার জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে?
সময় বদলেছে, সালমান বদলাননি
নব্বইয়ের দশক চলে গেল। মোবাইল ফোন বদলে গেল। ইন্টারনেট এল। ফেসবুক এল। ইউটিউব এল। সিনেমা দেখার পদ্ধতি বদলে গেল। নতুন নতুন নায়ক এলেন। কিন্তু সালমান শাহ রয়ে গেলেন। একসময় তার ছবি দেয়ালে টাঙানো হতো। পরে সেই ছবি চলে গেল কম্পিউটার স্ক্রিনে। তারপর মোবাইলের ওয়ালপেপারে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পুরোনো সিনেমার দৃশ্য, গান ও ছবি নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে। যে ছেলে তার মৃত্যুর সময় জন্মায়নি, সেও আজ সালমান শাহর ভক্ত।এটাই হয়তো তারকা আর কিংবদন্তির পার্থক্য।

২৯ বছর পর আবার বদলে গেল গল্প
২০২৫ সালে সালমান শাহর মৃত্যুর মামলায় নাটকীয় পরিবর্তন আসে। ঢাকার একটি আদালত আগের অপমৃত্যুর মামলাকে হত্যা মামলা হিসেবে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। পরদিন সালমানের মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে রমনা থানায় হত্যা মামলা করা হয়। মামলায় ১১ জনকে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে সালমানের সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, তার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই এবং অভিনেতা আশরাফুল হক ডনের নাম রয়েছে। তবে মামলার এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন; আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এত বছর পর আবার নতুন করে শুরু হলো সেই পুরোনো প্রশ্নের যাত্রা।
২০২৬, আবার অপেক্ষা
২০২৬ সালে মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি। আগস্টে অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে আদালতে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠানো হয়। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখও কয়েকবার পরিবর্তন হয়েছে। সর্বশেষ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন নির্ধারিত হয়েছে। অর্থাৎ, মৃত্যুর ৩০ বছর পরও সালমান শাহর গল্পের শেষ পাতাটি লেখা হয়নি। কিন্তু অন্য একটি গল্প শেষ হয়নি—ভালোবাসার গল্প
আইন তার নিজের পথে চলছে। তদন্ত তার নিজের পথে। আর মানুষ? মানুষ সালমানকে নিজের মতো করে রেখে দিয়েছে।
তার জন্মদিনে স্মরণ করে। মৃত্যুদিনে ছবি পোস্ট করে। তার সিনেমার গান শোনে। তার পোশাকের স্টাইল নিয়ে কথা বলে। পুরোনো সিনেমার দৃশ্য দেখে অবাক হয়—এই মানুষটি সত্যিই তিরিশ বছর আগে চলে গিয়েছিলেন? ২০২৬ সালে তার ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিএফডিসিতে তিন দিনের চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন হয়েছে। দেখানো হচ্ছে স্বপ্নের ঠিকানা, কেয়ামত থেকে কেয়ামত ও তোমাকে চাই।
দীপ্ত টিভিও সালমান শাহর সাতটি সিনেমা নিয়ে বিশেষ আয়োজন করেছে। ভাবলে অদ্ভুত লাগে। যে মানুষটি ৩০ বছর আগে চলে গেছেন, তার সিনেমা দেখানোর জন্য আজও নতুন করে আয়োজন করতে হয়।
একজন নায়ক কতটা বেঁচে থাকেন?
মানুষ মারা যায়। তারকারাও মারা যায়। কিন্তু কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও পুরোপুরি চলে যেতে পারেন না। সালমান শাহ তাদেরই একজন। তিনি হয়তো আর কোনো নতুন সিনেমায় অভিনয় করবেন না। নতুন কোনো গানে ঠোঁট মেলাবেন না। নতুন কোনো সাক্ষাৎকার দেবেন না। বয়স বাড়বে না তার।
কিন্তু ঢাকার কোনো এক বিকেলে যখন পুরোনো টেলিভিশনে কেয়ামত থেকে কেয়ামত শুরু হবে, কোনো তরুণ যখন ইউটিউবে তাঁর গান খুঁজবে, কিংবা কেউ যখন নব্বইয়ের দশকের সেই চুলের স্টাইল ফিরিয়ে আনবে—সালমান আবার ফিরে আসবেন।

পর্দায়। স্মৃতিতে। গানে। আর মানুষের কথায়। তার মৃত্যুর রহস্যের উত্তর আদালত হয়তো একদিন দেবে। ইতিহাসও হয়তো একদিন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে। কিন্তু সালমান শাহর জনপ্রিয়তার রহস্যের উত্তর খুঁজতে কোনো আদালতের দরকার নেই।
সেটি রয়ে গেছে মানুষের ভালোবাসায়। তিরিশ বছর আগে একজন তরুণ নায়ক চলে গিয়েছিলেন। তিরিশ বছর পরও তিনি ফিরে আসেন। প্রতি বার কোনো পুরোনো গান বাজলে। প্রতি বার কোনো সিনেমার দৃশ্য চোখে পড়লে। প্রতি বার কেউ বলে—‘সালমান শাহর মতো নায়ক আর আসেনি।’
হয়তো সত্যিই আসেনি। আর তাই, তার গল্পের শেষ দৃশ্য এখনও বাকি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









