ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস গাজায় ‘আরেকটি নাকবা’ ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি গাজা যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে নেওয়া শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া এক পূর্বধারণকৃত ভিডিও ভাষণে আব্বাস বলেন, ফিলিস্তিনিরা তাদের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়গুলোর’ একটি পার করছে। দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুতি, দখলদারত্ব এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বাধীনতা ও স্বাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ, অনাহার সৃষ্টি এবং ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের চেষ্টার অভিযোগ করেন আব্বাস। তার ভাষায়, এসবের ফলে সেখানে নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।
আব্বাস বলেন, ইসরায়েলি বাহিনীর সুরক্ষায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যেন ঘুমন্ত মানুষের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বেড়ে ওঠাও বন্ধ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গাজা শান্তি পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ নিয়েও উদ্বেগ জানান ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ প্রতিষ্ঠার প্রায় এক বছর পরও পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়িত হয়নি। তাই আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত তা কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি।
আব্বাস বলেন, ২০২৭ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকা অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা যেন স্থায়ী বা অনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরিণত না হয়।
পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়েও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন আব্বাস। তার দাবি, পূর্ব জেরুজালেমসহ অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ দ্রুত বাড়ছে এবং ইসরায়েলি বাহিনীর সুরক্ষায় বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ভূমি দখল, বাড়িঘর ভাঙা, চেকপয়েন্ট স্থাপন ও অভিযান চালানোর কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির ঘটনাকে ‘নাকবা’ হিসেবে উল্লেখ করে আব্বাস বলেন, বিশ্বকে আরেকটি নাকবা বা ১৯৪৮ সালের মতো হত্যাযজ্ঞ হতে দেওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, গাজা যুদ্ধের কারণে বাড়িঘরের পাশাপাশি স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ধ্বংস হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ইসরায়েলের কিছু নীতি এখন শুধু ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে বাধা তৈরি করছে না, বরং ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূমিতে অস্তিত্বের ওপরও হুমকি তৈরি করছে।
আব্বাস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষা, নিজেদের ভূমিতে তাদের অবস্থান নিশ্চিত করা, ইসরায়েলি দখলদারত্বের অবসান এবং আন্তর্জাতিক প্রস্তাবের ভিত্তিতে দুই-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
কিছু দেশ কেন নীরব রয়েছে বা কেন ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ করছে—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি। তার মতে, গাজা ও পশ্চিম তীরে সংঘাতের ‘ভয়াবহ মূল্য’ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইতোমধ্যেই দেখেছে।
ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট আরও অভিযোগ করেন, ইসরায়েলের কট্টরপন্থীরা ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাদের উপনিবেশিক প্রকল্প সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনি উপস্থিতি পুরোপুরি মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র আব্বাস ও অন্য ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের ভিসা না দেওয়ায় তিনি নিউইয়র্কে গিয়ে সরাসরি ভাষণ দিতে পারেননি। ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ জাতীয় সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে এবং আন্তর্জাতিক আইন, সহিংসতা ও সন্ত্রাস বর্জন, দুই-রাষ্ট্র সমাধান ও শান্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে।
আব্বাস যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আবার সংলাপ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে কাজ করার আহ্বান জানান।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









