টানা ৬০ ঘণ্টার বৃষ্টিতে ভারতের উত্তরপ্রদেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টি ও বৃষ্টিজনিত বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ৪৬ জন। এ ছাড়া ১০৭টি গবাদিপশু মারা গেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ২১টি ঘর। ভারী বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ও যান চলাচলে বিঘ্নের পাশাপাশি ফসলেরও ক্ষতি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে রাজ্য সরকারের সমালোচনা করেছে বিরোধীরা।
বৃষ্টিজনিত ঘটনায় সবচেয়ে বেশি সাতজনের মৃত্যু হয়েছে সীতাপুরে। লখিমপুর খেরি, বাহরাইচ ও বালরামপুরে পাঁচজন করে এবং অযোধ্যা ও গোরখপুরে চারজন করে মারা গেছেন।
আহতদের মধ্যে হারদইয়ে সাতজনের খবর পাওয়া গেছে। মইনপুরী, শ্রাবস্তী ও বারাবাঁকিতে পাঁচজন করে এবং সীতাপুর ও লখিমপুর খেরিতে তিনজন করে আহত হয়েছেন।
গবাদিপশুর মৃত্যুও হয়েছে বিভিন্ন জেলায়। হারদইয়ে সবচেয়ে বেশি ২৮টি প্রাণী মারা গেছে। সীতাপুরে ১৬টি এবং কনৌজে ১৪টি প্রাণী মারা গেছে। বাহরাইচ ও কানপুর দেহাতে সাতটি করে এবং উন্নাওয়ে ছয়টি প্রাণীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
এক হাজারের বেশি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত
বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হারদইয়ে—২৭২টি। সীতাপুরে ১০৮টি, চান্দৌলিতে ৭৫টি, আওরাইয়ায় ৬০টি, গোন্ডায় ৫৪টি, হামিরপুরে ৫১টি, শাহজাহানপুরে ৪৭টি এবং বাহরাইচে ৪৪টি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল পর্যন্ত ২১ ঘণ্টায় লখনউয়ে ১২৫ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ফারুকাবাদে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২০০ গুণ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। কানপুর নগরে ১৬০ গুণ এবং কনৌজ, কানপুর দেহাত ও হারদইয়ে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১৩০ গুণ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে।
শনিবার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বান্দায় ২২৭ দশমিক ৬ মিলিমিটার, ফতেহগড়ে ২২৪ মিলিমিটার, বাহরাইচের নানপাড়ায় ২১৭ মিলিমিটার, হারদইয়ে ২১৪ মিলিমিটার, ফারুকাবাদের কায়মগঞ্জে ২১০ মিলিমিটার, হামিরপুরে ২১০ মিলিমিটার এবং কনৌজে ২০৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
লখিমপুর খেরি, বাহরাইচ, শ্রাবস্তী, শাহজাহানপুর, কানপুর, লখনউ, বারাবাঁকিসহ আরও কয়েকটি জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে।
আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস
ভারতের আবহাওয়া দপ্তর (আইএমডি) শনিবার পূর্ব উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছিল। রবিবারও বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
উত্তর-পূর্ব মধ্যপ্রদেশ ও সংলগ্ন উত্তর ছত্তিশগড়ে অবস্থান করা একটি নিম্নচাপজনিত ব্যবস্থা উত্তর-উত্তর-পশ্চিম দিকে সরে দক্ষিণ-পূর্ব উত্তরপ্রদেশের দিকে এগোচ্ছিল। শনিবার ভোর সাড়ে ৫টায় এটি প্রয়াগরাজের প্রায় ২৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল।
আইএমডি জানিয়েছে, শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এটি নিম্নচাপজনিত ব্যবস্থা হিসেবে থাকার পর পরবর্তী ১২ ঘণ্টায় আরও দুর্বল হয়ে নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে।
আবহাওয়া দপ্তর উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করেছে। মধ্যাঞ্চল ও তেরাই এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে অত্যন্ত ভারী বৃষ্টির আশঙ্কাও রয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় মধ্য ও তেরাই উত্তরপ্রদেশের কয়েকটি নদী অববাহিকায় আকস্মিক বন্যার হালকা থেকে মাঝারি ঝুঁকি রয়েছে বলে জানিয়েছে আইএমডি।
জলাবদ্ধতায় ভোগান্তি
টানা বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ব্যাহত হয়েছে যান চলাচল। নিচু এলাকার বাসিন্দাদেরও দুর্ভোগ বেড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা প্রবীণ সিং বলেন, সকালে বেশ কয়েকটি সড়কে পানি জমে যায়। অনেক জায়গায় চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।
আরেক বাসিন্দা জানান, বৃষ্টির সঙ্গে জোরালো বাতাস পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এ কারণে বিভিন্ন স্থানে মানুষ আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
অযোধ্যায় রামপথ, রামমন্দির, হনুমানগড়ি, কনক ভবন ও সরযূ নদীর আশপাশে বৃষ্টি ও প্রবল বাতাসে চলাচলে সমস্যা হয়। তবে বৃষ্টির মধ্যেও মন্দিরে দর্শনার্থীদের যাওয়া বন্ধ হয়নি।
ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা
গ্রামাঞ্চলে কৃষকেরা জমিতে থাকা ফসলের ক্ষতির কথাও জানিয়েছেন। হারদইয়ের কৃষক প্রমোদ কুমার বলেন, বৃষ্টি ও বাতাস আরও চলতে থাকলে জমির ফসল নষ্ট হয়ে ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে পারে।
জলাবদ্ধতা নিয়ে সরকারের সমালোচনায় অখিলেশ
জলাবদ্ধতা নিয়ে উত্তরপ্রদেশ সরকারের সমালোচনা করেছেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব। এক্সে তিনি গঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের জলমগ্ন একটি ভিডিও পোস্ট করে ব্যঙ্গাত্মকভাবে এর নাম ‘গঙ্গা এক্সপ্রেস ওয়াটারওয়ে’ রাখার কথা বলেন।
তিনি অভিযোগ করেন, গঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে দুর্নীতির ‘নদী’ বইছে এবং পরিস্থিতিকে অত্যন্ত নিন্দনীয় বলে মন্তব্য করেন।
ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার আহ্বান মায়াবতীর
ভারতের বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি) প্রধান ও উত্তরপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী ভারী বৃষ্টি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সব রাজ্য সরকারকে সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
শনিবার উত্তরপ্রদেশে বৃষ্টিজনিত ঘটনায় ১০ জন নিহত ও ১৭ জন আহত হওয়ার খবরের পর তার এই বক্তব্য আসে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজ্যের ৬৩টি জেলায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং কয়েকটি এলাকায় আকস্মিক বন্যার মাঝারি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









