জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে নতুন প্রস্তাব দেওয়ার মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় সাত মাসের যুদ্ধের পর নিউইয়র্কে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ওয়াশিংটন তেহরানের শর্ত মেনে নিলে সাত দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া সম্ভব। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও কাছাকাছি পরিমাণ গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হয়।
শুনলে মনে হতে পারে, এটি যুদ্ধের উত্তেজনা কমানোর একটি উদ্যোগ। কিন্তু প্রস্তাবটি একটু গভীরভাবে দেখলে অন্য একটি হিসাবও স্পষ্ট হয়। ইরান যে চাপ তৈরি করেছে, সেটিকেই এখন দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। আর সেই দর-কষাকষির একটি অংশের মূল্য দিতে হবে ইয়েমেনকে ঘিরেও।
আরাঘচির প্রস্তাব অনুযায়ী, লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে সাত দিনের যুদ্ধবিরতি হবে। ইরানের জব্দ করা অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলার সম্পদ ছাড়তে হবে, ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নৌ অবরোধ শেষ করতে হবে। বিনিময়ে ইরান ও ওমানের নির্ধারিত একটি নতুন পথ দিয়ে হরমুজ খুলে দেওয়া হবে। শেষ শর্তটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব নয়। বরং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকে এমন একটি নতুন ব্যবস্থার অধীন করার প্রস্তাব, যেখানে ইরানের নির্ধারিত নিয়মের ভূমিকা থাকবে।
ইরান এরই মধ্যে হরমুজ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের কাছ থেকে আগাম অনুমোদন চায়। যারা তা মানে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এখন তেহরান চীনের সমর্থন এবং ওমানের সহযোগিতা নিয়ে যদি এই ব্যবস্থার রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে, তাহলে পরে সেটি বদলানো কঠিন হতে পারে।
প্রস্তাবের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে। এর আগে জ্বালানির দাম বাড়লে মার্কিন ভোক্তা ও প্রশাসন—দুই পক্ষের ওপরই চাপ বাড়বে। তেহরানের হিসাব তাই পরিষ্কার- নির্বাচনের সময় যত এগোবে, হরমুজ বন্ধ থাকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য ওয়াশিংটনের কাছে তত বাড়বে। সেই মুহূর্তে একটি সমাধানের প্রস্তাবও তত বেশি মূল্যবান হয়ে উঠবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এসেছে ইয়েমেনকে ঘিরে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের ইয়েমেনবিষয়ক মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি এএফপিকে বলেছেন, ইয়েমেনে যুদ্ধ বন্ধ করাও তেহরানের দাবির অংশ। তবে এই শর্ত আরাঘচির প্রকাশ্য পরিকল্পনায় রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
আরও কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাত দিনের পরিকল্পনা ঘোষণার আগে আরাঘচি মার্কিন প্রতিনিধিদের একটি লিখিত নথি দিয়েছিলেন। সেখানে ৬০ দিনের আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি, ধাপে ধাপে হরমুজ খুলে দেওয়া এবং মার্কিন নৌ অবরোধ শেষ করার কথা ছিল। ওই নথির প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, ইরান প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার জব্দ সম্পদ ছাড়ার দাবি করেছে এবং হুতিদের ওপর অবরোধ কার্যকর করা বন্ধের কথাও বলেছে। তবে আলাদা এই ৬০ দিনের নথির অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত তথ্য নেই। এটি কোনো অপ্রকাশিত নথির ফাঁস হতে পারে, আবার সংবাদমাধ্যমের বিভ্রান্তিও হতে পারে। তাই এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

এই ৬০ দিনের কাঠামো সম্ভবত ১৭ জুন ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে হওয়া সমঝোতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ওই সমঝোতার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিরতি ধরে রাখা এবং ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো। ওয়াশিংটন এখন বলছে, সেই সমঝোতার মেয়াদ শেষ হয়েছে। ট্রাম্পও যুদ্ধবিরতি শেষ হয়েছে বলে ঘোষণা করেছেন। অন্যদিকে আরাঘচি ওই সমঝোতায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
ওয়াশিংটন অবশ্য ইরানের শর্ত মানতে রাজি নয়। ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান হরমুজ খুলে দেওয়া ও পরমাণু আলোচনা শুরুর বিনিময়ে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, অবরোধ তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা তাদের নেই। এখানেই আসল প্রশ্ন- ইরান কি শুধু হরমুজ খুলে দেওয়ার বিনিময়ে সুবিধা চাইছে, নাকি প্রণালিটির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে? হরমুজ আন্তর্জাতিক জলপথ। আন্তর্জাতিক আইনে সেখানে বেসামরিক ও সামরিক জাহাজ চলাচলের অধিকার রয়েছে। আগাম কোনো রাজনৈতিক অনুমতির ওপর সেই চলাচল নির্ভর করার কথা নয়। ফলে ইরান ও ওমান নির্ধারিত পথ এবং অনুমোদনের শর্ত স্থায়ী হলে হরমুজের চরিত্র বদলে যেতে পারে। একটি আন্তর্জাতিক জলপথ তখন রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত করিডরে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
ইয়েমেনকে এর সঙ্গে যুক্ত করলে ঝুঁকিটা আরও স্পষ্ট হয়। হরমুজ এড়িয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির একটি বিকল্প পথ লোহিত সাগরের বন্দর। কিন্তু সেই পথের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দাব প্রণালি, যেখানে হুতিদের প্রভাব রয়েছে। অর্থাৎ হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব দুটি আলাদা সংকট নয়। একটি মূল সরবরাহপথ, অন্যটি বিকল্প পথ। একদিকে হরমুজে চাপ, অন্যদিকে লোহিত সাগরের পথে হুমকি—দুটি মিলে উপসাগরীয় জ্বালানি সরবরাহের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। এই কারণেই ইরানের প্রস্তাব শুধু একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ এবং ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ।
এমন কোনো ব্যবস্থা মেনে নেওয়া হলে তার প্রভাব শুধু ইরান বা উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল মিসর থেকে শুরু করে উপসাগর ও লোহিত সাগর দিয়ে জ্বালানি আনা এশিয়া ও ইউরোপ—সবাই এর প্রভাব অনুভব করবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই হরমুজ খোলা বা বন্ধ থাকার চেয়েও বড়: যুদ্ধ ও রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথের প্রবেশাধিকার কি ভবিষ্যতে নির্ধারিত হবে? হরমুজ ও বাব আল-মান্দাবে যে সমঝোতা হবে, তার উত্তর হয়তো শুধু এই যুদ্ধ নয়, ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়মও প্রভাবিত করবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









