একটি সিনেমাকে ঘিরে এতটা আগ্রহ সচরাচর দেখা যায় না। চলচ্চিত্রপ্রেমী তো বটেই, সাধারণ দর্শকেরাও জানতে চাইছেন,‘দ্য ব্ল্যাক বল’ কেমন সিনেমা? উৎসবের পুরস্কার, ব্যাপক প্রচার এবং সমকালীন সাংস্কৃতিক আবহ—সব মিলিয়ে ছবিটির চারপাশে তৈরি হয়েছে অস্বাভাবিক প্রত্যাশা। এমনকি কোথাও কোথাও যেন ধরে নেওয়া হয়েছে, পুরস্কার মানেই ছবির শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত স্বীকৃতি। অথচ শিল্পের ক্ষেত্রে এমন নিশ্চয়তা বিপজ্জনক। পুরস্কার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দর্শকের নিজের রুচি, সংশয় ও পক্ষপাতও গুরুত্বপূর্ণ।
তারপরও জাভিয়ের আমব্রোসি ও জাভিয়ের কালভোর সিনেমা নিয়ে আগ্রহী হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। তাদের আগের সিরিজ ‘দ্য মেসায়াহ’-তেই দেখা গেছে, তাঁরা কীভাবে অন্ধকার ও জাদুময় এক জগৎ তৈরি করতে পারেন। রহস্য, ভয়, সৌন্দর্য ও কাব্যিকতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ সেখানে কাজ করেছে। ‘দ্য ব্ল্যাক বল’-এ সেই ক্ষমতা আরও বিস্তৃত হয়েছে। দুঃখ, আকাঙ্ক্ষা, ভয় ও যন্ত্রণাকে তারা শুধু গল্পের অংশ করেননি; আলো, শরীর, নীরবতা, মুখের অভিব্যক্তি এবং পরিবেশের মধ্যেও ছড়িয়ে দিয়েছেন।

ছবির গল্প বিস্তৃত এক শতাব্দীজুড়ে। একাধিক কাহিনি পাশাপাশি এগোয়, পরে একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। এই কাঠামোর সৌন্দর্য যেমন আছে, ঝুঁকিও আছে। কখনো কখনো দর্শক গল্পের সুতো হারিয়ে ফেলতে পারেন। কিছু জায়গায় বর্ণনার ধারাবাহিকতা অনুসরণ করা কঠিন। কিন্তু ‘দ্য ব্ল্যাক বল’-এর শক্তি কেবল তার গল্পে নয়। বরং তার কিছু দৃশ্য এত তীব্র যে সেগুলো আলাদা করেই মনে থেকে যায়।
ছবির শুরুটি তার চমৎকার উদাহরণ। আন্দালুসিয়ার একটি গ্রামের রাস্তায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার দৃশ্য—সাদামাটা, অথচ নান্দনিক। এর পরেই আসে ভোরের আগের ভয়াবহতা: রিপাবলিকান বন্দীদের মৃত্যুদণ্ড। দৃশ্যটি নির্মম, কিন্তু তার শক্তি কোনো অতিরঞ্জিত নাটকীয়তায় নয়। বরং নির্মাতারা ভয়াবহতাকে প্রায় নির্বিকারভাবে সামনে রাখেন। একা ঘরে ছবিটি দেখলে এমন দৃশ্যের পর হাততালি দিতে ইচ্ছে করতে পারে—কারণ দৃশ্যটি হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে। সিনেমা হলে সেই প্রতিক্রিয়া হয়তো অস্বস্তিকর। কিন্তু সেই অস্বস্তিই বলে দেয়, ছবিটি দর্শককে স্পর্শ করেছে।
ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা ছবিতে আসেন প্রায় শেষদিকে। তার উপস্থিতি ক্ষণিকের, কিন্তু অর্থে গভীর। তিনি কী বলেন এবং কীভাবে বলেন—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। তার কণ্ঠে ব্যক্তিগত স্মৃতি যেন ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়ার সঙ্গে মিশে যায়। লোরকা এখানে শুধু একজন নিহত কবি নন; তিনি হয়ে ওঠেন এমন এক সময়ের প্রতীক, যখন ব্যক্তিগত পরিচয় ও আকাঙ্ক্ষার জন্য মানুষকে ভয়াবহ মূল্য দিতে হয়েছে।

ছবিতে কিছু দৃশ্য অবশ্য অতিরিক্ত প্রতীকী মনে হতে পারে। কোথাও কোথাও রূপক এত স্পষ্ট যে দর্শকের নিজস্ব ব্যাখ্যার জায়গা সংকুচিত হয়। তবু ছবির কেন্দ্রীয় বিষয়টি সরাসরি। এটি সমকামী প্রেমের এক দীর্ঘ ইতিহাস—প্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ভয়, সামাজিক নিপীড়ন এবং তার মূল্য দেওয়ার ইতিহাস।
নগ্নতা ও যৌনতার দৃশ্যও আছে। কিন্তু সেগুলো নিছক প্রদর্শনী নয়। শরীর এখানে কামনার বস্তু হওয়ার পাশাপাশি পরিচয়, আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র। ফলে যৌনতার দৃশ্যগুলো ছবির আবেগ ও বক্তব্যের বাইরে বিচ্ছিন্ন কোনো উপাদান হয়ে ওঠে না। বরং চরিত্রগুলোর জীবনযাপনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই আসে।
এই ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত তার আবহ। প্রায় সবকিছুতেই এক ধরনের সত্যতা আছে। চরিত্রগুলো ভয়, উদ্বেগ, অসহায়ত্ব ও আকাঙ্ক্ষার মধ্যে বাস করে। তাদের যৌন পরিচয় শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়; সমাজ কীভাবে একজন মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, ছবিটি তারও গল্প বলে।
অভিনয়ের ক্ষেত্রেও নির্মাতাদের সিদ্ধান্ত আকর্ষণীয়। তরুণ ও তুলনামূলক অপরিচিত অভিনেতাদের পাশে আছেন প্রতিষ্ঠিত কয়েকজন অভিনেত্রী। তাঁদের কেউ কেউ খুব অল্প সময়ের জন্য পর্দায় আসেন, কিন্তু চরিত্রে ছাপ রেখে যান।
পেনেলোপে ক্রুজের উপস্থিতি সংক্ষিপ্ত হলেও শক্তিশালী। তিনি এক ক্যাবারে গায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেছেন—বাস্তববাদী, আকর্ষণীয়, ক্লান্ত এবং একই সঙ্গে দৃঢ় এক নারী। চরিত্রটির জীবনে যে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা জমে আছে, ক্রুজ তা অল্প সময়েই প্রকাশ করেন।
গ্লেন ক্লোজও তার চরিত্রে স্বচ্ছন্দ। লোলা দুয়েনাসের অভিনয়ে তীব্রতা আছে; তার চরিত্র যেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা তিক্ততার আগ্নেয়গিরি। পুরুষ অভিনেতাদের মধ্যে মিগেল বার্নারদোর অভিনয়ে রাগ ও বিষণ্নতার যে পাশাপাশি অবস্থান, তা বিশেষভাবে মনে থাকে।
‘দ্য ব্ল্যাক বল’ নিখুঁত ছবি নয়। কোথাও গল্পের জটিলতা দর্শককে দূরে সরিয়ে দিতে পারে, কোথাও প্রতীকী ভাষা একটু বেশি স্পষ্ট। কিন্তু তার অনুভূতির জায়গাটি সত্য। আর এই সত্যতাই ছবিটিকে আলাদা করে।
এক শতাব্দীর গল্প বলেও ছবিটি শেষ পর্যন্ত সময়ের দূরত্ব তৈরি করে না। বরং দেখায়, মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও ভয় কীভাবে প্রজন্ম পেরিয়ে বেঁচে থাকে। যে প্রেম একসময় অপরাধের মতো বিবেচিত হয়েছে, তার স্মৃতি শুধু ইতিহাসে থাকে না—তা শরীরে, ভাষায়, সম্পর্কের মধ্যে এবং নীরবতার ভেতরও থেকে যায়।
এই অর্থে ‘দ্য ব্ল্যাক বল’ শুধু প্রেমের ছবি নয়। এটি ভয়কে অতিক্রম করে নিজের অস্তিত্বকে স্বীকার করার ছবিও। আর তার সবচেয়ে বড় অর্জন—এই কঠিন ইতিহাসকে সে কেবল বক্তব্যে নয়, সিনেমার আবহ ও অনুভূতির মধ্য দিয়ে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়।
দ্য ব্ল্যাক বল। পরিচালনা: জাভিয়ের আমব্রোসি, জাভিয়ের কালভো। অভিনয়: গিতারিকাদেলাফুয়েন্তে, মিগেল বার্নারদো, কার্লোস গনসালেস, মিলো কুইফেস, লোলা দুয়েনাস, পেনেলোপে ক্রুজ, গ্লেন ক্লোজ। ধরন: ড্রামা। দেশ: স্পেন, ২০২৬। দৈর্ঘ্য: ১৫৯ মিনিট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









