ম্যানচেস্টারে ইংল্যান্ডের চ্যাম্পিয়ন ম্যানচেস্টার সিটির মুখোমুখি হয়ে পাউ কেসাদার রিয়াল মাদ্রিদ বুঝিয়ে দিল, তারা এবার চ্যাম্পিয়নস লিগে আগের চেয়ে অন্য রকম কিছু করতে চায়। ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী লিগের চ্যাম্পিয়নের মাঠে ১–১ গোলে ড্র—ফলটা হয়তো খুব বড় কিছু নয়, কিন্তু ম্যাচের গল্পটা রিয়ালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি পারফরম্যান্স তাদের মনে করিয়ে দিতে পারে, এবার কোয়ার্টার ফাইনালের বাধা পেরোনোর মতো দল তারা হয়ে উঠছে।
সামনে আরও বড় পরীক্ষা। রোববার ক্যাম্প ন্যুতে বার্সেলোনার বিপক্ষে ম্যাচ। তার আগে ম্যানচেস্টারে রিয়ালের এই পারফরম্যান্স আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর মতোই। এমনকি ম্যাচটি তারা জিতেও ফিরতে পারত। শেষ মুহূর্তে সিলভিয়া ক্রিস্তোবালের গোলটি বাতিল না হলে ফলটা অন্য রকম হতে পারত। মাত্র পাঁচ দিন আগেই পোল্যান্ডের লদজ শহরে স্পেনের অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে মেতেছিলেন এই তরুণ ডিফেন্ডার।
৮৮ মিনিটে ক্রিস্তোবালের বাঁ পায়ের শক্তিশালী শট সিটির গোলের ওপরের কোণে গিয়ে জালে জড়ায়। কিন্তু ইতালিয়ান রেফারি গোলটি বাতিল করেন। তার মতে, আক্রমণের সময় ক্রিস্তোবালের অবস্থান ম্যানচেস্টার সিটির মিয়েডের চলাচলে বাধা তৈরি করেছিল।
রিয়ালের শুরুটা অবশ্যই ছিল ম্যাচের অন্যতম বড় গল্প। প্রথম ৩০ সেকেন্ডেই তারা বুঝিয়ে দেয়, ভয় পাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। সিটির রক্ষণে সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। সেই চাপেই ওয়ামজার সতীর্থকে দেওয়া ব্যাকপাসে ভুল করেন। শ্রোডার গোলরক্ষক ইয়ামাশিতাকে সামনে এগিয়ে আসতে দেখে তাকে টপকে বল পাঠানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু শটটি বাইরে চলে যায়।
রিয়ালের সাহস শুধু আক্রমণে ছিল না। বল হারানোর পর তাদের প্রেসিং ছিল সংগঠিত, আর পেছন থেকে আক্রমণ গড়ার সময় ছিল ধৈর্য। সেন্স ও আন্দ্রেয়া জাকিন্তো মাঝমাঠ থেকে সেই কাজটি করছিলেন। দুজনের দ্রুত পাস, বল ধরে রাখার দক্ষতা এবং মাঝখানে লিন্ডার বারবার উঠে আসা রিয়ালকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ এনে দেয়।
অন্যদিকে সিটির ব্লিন্ডকিল্ড, হাসেগাওয়া ও ফুজিনো রিয়ালের চাপের মধ্যে থেকে হেম্প, ফাউলার ও শ-কে নিয়মিত খেলায় যুক্ত করার সুযোগ পাচ্ছিলেন না। প্রথমার্ধে সিটির ভয়ংকর আক্রমণভাগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুহূর্তটি আসে গ্রিনউডের ফ্রি-কিক থেকে। ফাউলারের হেড ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে।
সেই মুহূর্তে রিয়াল কোচ কেসাদা হয়তো নিজের আগের নির্দেশের কথা মনে করছিলেন। ফাউলের ঠিক আগে সাইডলাইন থেকে তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘দূরের পোস্ট! দূরের পোস্ট!’ কিছুক্ষণ পর ঠিক সেই দূরের পোস্টেই ফাউলারের হেড গিয়ে লাগে।
তবে রিয়ালের আক্রমণ থামেনি। কারুসোর শট থেকে ফিরে আসা বল পেয়ে শ্রোডার বক্সের ভেতর দারুণ এক কৌশলে বলটি রোজের পাশ দিয়ে বের করে নেন। এরপর ইয়ামাশিতার সামনে একা। জাপানি গোলরক্ষক দ্রুত জায়গা কমিয়ে এনে গোলের সুযোগ নষ্ট করেন। কয়েক মিনিট পর শ্রোডারের আরেকটি দুর্বল শটও ঠেকিয়ে দেন তিনি।
গ্রীষ্মে প্রায় ১৫ লাখ ইউরোর রেকর্ড ফিতে রিয়ালে যোগ দেওয়ার পর এটাই ছিল শ্রোডারের এমন একটি ম্যাচ, যেখানে তিনি গোল করতে পারেননি।
কিন্তু রিয়ালের গোল এল অন্য একজনের পায়ে। আধঘণ্টা পার হওয়ার পর লিন্ডা এমন এক গোল করলেন, যা তার খেলার ধরনকেই যেন সংক্ষেপে বলে দেয়। মাঝমাঠে বল পেয়ে তিনি দৌড় শুরু করেন। সামনে থাকা সিটির রক্ষণ একে একে পেছনে পড়ে যায়। এরপর নিচু, জোরালো শটে দূরের কোণে বল পাঠান কলম্বিয়ান ফরোয়ার্ড। রিয়াল ১–০ এগিয়ে যায়।
বিরতির সময় পরিসংখ্যানও রিয়ালের সাহসের কথা বলছিল—তাদের ১১টি শটের বিপরীতে সিটির শট ছিল মাত্র পাঁচটি।
দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য ছবিটা বদলে যায়। আন্দ্রে জেগল্যার্তজের সিটি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। রিয়ালকে চাপে ফেলে তারা দ্রুত বল দখল করতে থাকে। আর সেই চাপ থেকেই আসে সমতা। রিয়ালের একটি দুর্বল ক্লিয়ারেন্সের সুযোগ নিয়ে শ গোল করেন। ম্যাচ ১–১।
এরপর শুরু হয় আসল লড়াই। দুই দলের কোচের বদলগুলো ম্যাচে নতুন গতি আনে। একদিকে সিটি জয়ের জন্য এগিয়ে আসে, অন্যদিকে রিয়ালও নিজেদের সুযোগ খুঁজতে থাকে। মিয়েড ও শ-এর হেড অল্পের জন্য গোলের ওপর দিয়ে যায়। লিন্ডা ও ইরুনে দোরাদোর শটও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
শেষ পর্যন্ত ক্রিস্তোবালের গোল বাতিল হওয়ার পর আর কোনো গোল হয়নি। ১–১ স্কোরলাইনেই ম্যাচ শেষ।
কাগজে-কলমে এটি হয়তো দুই দলের জন্য আরেকটি পয়েন্ট। কিন্তু রিয়ালের জন্য এর মূল্য একটু বেশি। তারা শুধু ইংল্যান্ডের চ্যাম্পিয়নের সঙ্গে লড়েনি; তারা দেখিয়েছে, এই পর্যায়ের ম্যাচে নিজেদের ফুটবল চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও তাদের আছে। আর এখন সামনে বার্সেলোনা। ম্যানচেস্টারে যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, ক্যাম্প ন্যুতে সেটিই হবে তাদের পরবর্তী পরীক্ষা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









