যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা অন্তর্বর্তী সমঝোতার সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলবে না বলে জানিয়েছে ইরান।
রবিবার দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার ও শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এ কথা বলেছেন বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় ইরান একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। সেখানে বলা হয়, নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ করা হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া এবং স্বাভাবিক নৌ চলাচল চালু করা সম্ভব। গত সপ্তাহে কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ওই প্রস্তাবের জবাব দিয়েছে।
মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের অবস্থান সম্পূর্ণ স্পষ্ট ও দৃঢ়। আমাদের সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খোলা হবে না।”
তিনি আরও বলেন, “কূটনৈতিক আলোচনা দীর্ঘায়িত করা এবং একতরফা শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার সময় শেষ হয়ে গেছে—এ বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝতে হবে।”
পরমাণু ইস্যুতে আলোচনা নয়: ইরান
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাবের বিষয়ে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরানের অবস্থান জানানো হয়েছে। তবে ওয়াশিংটনকে আরও কিছু বিষয় জানানো বাকি রয়েছে।”
বাঘাই বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব মোটামুটি তাদের আগের অবস্থানেরই প্রতিফলন, বিশেষ করে পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে। তবে এই পর্যায়ে ইরানের মূল গুরুত্ব হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে।”
তিনি বলেন, “হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
এদিকে ইরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তাদের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শনের প্রস্তাব দিয়েছে—এমন খবরও অস্বীকার করেছে তেহরান।
বাঘাই বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু ইস্যুতে কোনো আলোচনা শুরু করেনি ইরান।”
তবে আলোচনার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা গত সপ্তাহে জানিয়েছিলেন, দুই দেশের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনের জন্য সাত দিনের একটি প্রক্রিয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এর মাধ্যমে জুনে হওয়া সমঝোতাকে আরও কার্যকর রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ওই পরিকল্পনায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপও রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, দুই দেশের মতবিরোধ মূলত কোন পদক্ষেপ আগে নেওয়া হবে, তা নিয়ে; পরিকল্পনার মূল বিষয়গুলো নিয়ে নয়।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় কাতার
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে কাতার। সংঘাত বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল পুনরায় চালুর লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে দোহা।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ থাকায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জুনের সমঝোতার পর দুই পক্ষের মধ্যে অল্প সময়ের জন্য যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। ওই সমঝোতায় হরমুজ প্রণালি এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি—দুই বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পথে গেলে জবাবের হুঁশিয়ারি
রবিবার তেহরানে বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, ইরান আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতির পথ বেছে নেবে। তবে ওয়াশিংটন আবার সামরিক পদক্ষেপ নিলে ইরানও জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলে সতর্ক করেন তিনি।
আরাকচি বলেন, “তারা যদি আবার সামরিক সমাধানের দিকে যায়, তাহলে আমরা আগের চেয়ে বেশি প্রস্তুত এবং আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় যেকোনো পদক্ষেপ নেব।”
এর আগে বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক হামলা আবার শুরু করলে ইরান আরও ব্যাপক ও শক্তিশালী পাল্টা জবাবের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এদিকে ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আক্রামিনিয়া রবিবার ফারস নিউজ এজেন্সিকে জানিয়েছেন, ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বাড়ানোর উদ্যোগ নেবে।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা, পরমাণু কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতা—এই তিনটি বিষয় এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। তবে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পাশাপাশি সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাও পুরোপুরি কাটেনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









