শিক্ষার্থীদের তীব্র বিক্ষোভ, কাঁদানে গ্যাস আর জ্বলতে থাকা প্যারিসের রাজপথ—সব মিলিয়ে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছাত্র ক্ষোভের সাক্ষী হলো ফ্রান্স। সরকারি নতুন নীতি ও শিক্ষা সংস্কার বিল বাতিলের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অবশেষে রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে। গত দুই দিনে রাজধানী প্যারিসসহ লায়ন, মার্শেই ও বর্দো শহরের রাজপথে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, ভাঙচুর এবং যান চলাচলে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ব্যাপক টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করলেও পিছু হটতে নারাজ হাজার হাজার শিক্ষার্থী, যা পুরো দেশকে ঠেলে দিয়েছে এক নজিরবিহীন অস্থিরতার মুখে।
রয়টার্স জানিয়েছে, এদিন রাজধানী প্যারিসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরের বিক্ষোভগুলোতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের বাবা-মা ও শিক্ষকরাও রাস্তায় নেমে আসেন।
প্যারিস, স্ত্রাসবুর, রেন ও তুলুজসহ অন্যান্য শহরে বিক্ষোভকারীরা সহিংস হয়ে উঠলে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস ছোড়ে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কয়েক ডজন শহরে হওয়া মিছিলগুলোতে আড়াই লাখেরও বেশি মানুষ যোগ দিয়েছে। কিন্তু আয়োজকদের ধারণা অনুযায়ী, শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীদের সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখের কাছাকাছি।
মঙ্গলবারের প্রতিবাদের অন্যতম সংগঠক ফ্রান্সের হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের প্রধান ছাত্র সংগঠন উঁনিয়ঁ সাঁদিকাল লিসিয়েন (ইউএসএল) জানিয়েছে, এদিন প্রায় দুই হাজার হাইস্কুল অবরুদ্ধ অথবা বন্ধ ছিল।
প্যারিস থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের এসব বিক্ষোভে বিভিন্ন দলমতের লোকজন যোগ দিচ্ছে। কৃষক ইউনিয়ন, জ্বালানি শ্রমিক, শিক্ষক পরিষদ জানিয়েছে, তারা শিক্ষার্থীদের সমর্থন দেওয়ার জন্য রাস্তায় নেমেছে।
শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও শিক্ষকরা জানিয়েছেন, তারা তাদের সন্তানদের সমর্থন করার পাশাপাশি ‘অনুপ্রবেশ করে উপদ্রব সৃষ্টিকারীদের’ আর পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ থেকে তাদের রক্ষার জন্যও রাস্তায় নেমেছেন।
প্যারিসের পুলিশ জানিয়েছে, রাজধানীতে প্রায় ৩০০ মানুষ, যাদের অধিকাংশই মুখোশ পড়া, নিরাপত্তা বাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। অন্যান্য শহরে সহিংসতায় কিছু দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বড় কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার ৪৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আর ৪৮ জন নিরাপত্তা সদস্য আহত হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী ল্যকর্ন্যু ফ্রান্সজুড়ে হাইস্কুলে ক্লাস সপ্তাহের বাকি সময়ের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছেন। পার্লামেন্টকে তিনি জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত বিভিন্ন সংঘর্ষে অন্তত ২১৫ জন কিশোর বয়সী এবং ৮৫ জন স্কুল কর্মী আহত হয়েছেন।
তিনি বলেছেন, “স্কুল ব্যবস্থায় কয়েক দশকের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় ক্ষতি।”
তার দপ্তর জানিয়েছে, সহিংসতায় ৭০০ জনেরও বেশি পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।
আসছে বসন্তে ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তার আগে দেশটিতে চরম ডান ও চরম বামপন্থি দলগুলোর প্রতি সমর্থন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তার মধ্যেই জনরোষের প্রকাশ দেখা গেল এই বিক্ষোভগুলোতে।
মন্থর প্রবৃদ্ধির মধ্যে সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে সরকার চাপের মুখে রয়েছে। ২০২৪ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মিত্র দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর থেকে বাজেট পাসের মতো মৌলিক কাজগুলো সম্পন্ন করতেও সরকারকে হিমশিম থেকে হচ্ছে।
ম্যাক্রোঁ মঙ্গলবার ল্যকন্যু ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের একটি জরুরি বৈঠকে তলব করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ফ্রান্সে অভিবাসন ‘নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যাওয়ার’ প্রমাণ এসব বিক্ষোভ।
ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে তিনি বলেছেন, “এটি স্কুলের বিষয় নয়, এটি হচ্ছে ইসলাম এক সময়ের এই মহান দেশটিকে অধিকার করে নিতে চাইছে।”
রয়টার্স লিখেছে, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোতে ধর্ম বা অভিবাসন নিয়ে কোনো কিছু নেই, বরং সেগুলোতে শিক্ষক সংকট ও অপ্রতুল তহবিলের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। ফ্রান্সের চরম ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি পার্টি এই প্রতিবাদকে ফ্রান্সের অভিবাসন নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত করেনি।
মার্সেই, নঁত ও লিওঁ শহরের আন্দোলনকারীরা ‘তারা আসলে আমাদের নিয়ে ভাবে না’ এবং ‘বেঁচে থাকা না কি পড়াশোনা’, এমন সব লেখা সম্বলিত প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন।
সেপ্টেম্বরে প্যারিসের সুবিধাবঞ্চিত শহরতলীতে এই ছাত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার পর এখন সারাদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, স্কুলগুলো পানি চুঁইয়ে পড়া থেকে শুরু করে ইঁদুরের উপদ্রবের মতো সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণজনিত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









