২০২৪ সালে ট্রাইকন্টিনেন্টাল: ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল রিসার্চ দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ প্রকাশ করেছিল—‘হাইপার-ইম্পেরিয়ালিজম: আ ডেঞ্জারাস ডেকাডেন্ট নিউ স্টেজ’ এবং ৭২ নম্বর ডসিয়ার ‘দ্য চার্নিং অব দ্য গ্লোবাল অর্ডার’। এই দুটি কাজকে একসঙ্গে পড়লে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা সম্পর্কে পাঁচটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদ নতুন, আরও আগ্রাসী এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ট্রাইকন্টিনেন্টাল এই পর্যায়কে বলছে ‘হাইপার-ইম্পেরিয়ালিজম’ বা অতি-সাম্রাজ্যবাদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের প্রকাশ ঘটেছে তার ৯০০টির বেশি বিদেশি সামরিক ঘাঁটি, ‘গ্লোবাল ন্যাটো’র ধারণা এবং উত্তর আটলান্টিকের বাইরেও রাজনৈতিক বিরোধ মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র-ন্যাটো জোটের সামরিক শক্তি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, তথ্যযুদ্ধ, নজরদারি এবং আইনকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মতো নানা পদ্ধতি। ট্রাইকন্টিনেন্টালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক উত্তরের আপেক্ষিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতাই এই আগ্রাসী প্রবণতাকে আরও তীব্র করছে।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র এখনো বৈশ্বিক উত্তরের কেন্দ্রীয় শক্তি। ট্রাইকন্টিনেন্টাল এই ব্যবস্থাকে ন্যাটো প্লাস নামে চিহ্নিত করে—একটি সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সংযুক্ত পশ্চিমা জোট, যার কেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্র। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই জোট চীনের মতো উদীয়মান শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় এবং বৈশ্বিক দক্ষিণে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে চায়। তৃতীয়ত, এই ক্ষমতাকাঠামোর একটি বড় লক্ষ্য হলো বৈশ্বিক দক্ষিণের ওপর নব্য-ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং চীন ও রাশিয়ার মতো ইউরেশীয় শক্তির কৌশলগত উত্থান ঠেকানো। ট্রাইকন্টিনেন্টাল মনে করে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠান এবং সামরিক জোটের ওপর প্রভাব ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্বার্থ রক্ষা করে। এর উদাহরণ হিসেবে তারা ইউক্রেনের যুদ্ধ ও গাজার পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বহুপক্ষীয় চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার ঘটনাকেও তারা এই প্রবণতার অংশ হিসেবে দেখেছে। এখানে একটি তথ্যগত সংশোধন জরুরি— যুক্তরাষ্ট্র ২০০২ সালে অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল বা এবিএম চুক্তি এবং ২০১৯ সালে ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস বা আইএনএফ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। আর ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন—ইউএনএফসিসিসি—থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। তবে সেই প্রত্যাহার ‘কার্যকর হবে ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এ’।
চতুর্থত, বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্র উত্তর আটলান্টিক থেকে এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে। ট্রাইকন্টিনেন্টালের গবেষণা অনুযায়ী, ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পিপিপি-র হিসাবে বৈশ্বিক দক্ষিণ ইতিমধ্যে বৈশ্বিক উত্তরের চেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। চীনসহ উদীয়মান অর্থনীতিগুলো কাঁচামাল, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অর্থব্যবস্থার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। পশ্চিমা জোটের কাছে এটি একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ।
পঞ্চমত, সাম্রাজ্যবাদের এই নতুন পর্যায় সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ট্রাইকন্টিনেন্টালের যুক্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি আপেক্ষিকভাবে কমে আসায় সামরিক শক্তি এবং বিভিন্ন ধরনের ‘হাইব্রিড’ কৌশল বিশ্বজুড়ে তার প্রভাব ধরে রাখার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে উঠেছে। এর ফলে যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ছে, জলবায়ু সংকট আরও তীব্র হচ্ছে এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের ওপর চাপ বাড়ছে। এই বাস্তবতাই ‘হাইপার-ইম্পেরিয়ালিজম’ ধারণার কেন্দ্রে। আর এখন আমরা যা দেখছি, তাকে বলা যায়—‘হাইপার-ড্রাইভে হাইপার-ইম্পেরিয়ালিজম’। ৩ জানুয়ারি ২০২৬ ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এই ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে হাজির হয়েছে। ট্রাইকন্টিনেন্টালের মতে, একই দিনে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের যুদ্ধবিমান সিরিয়ার পালমিরার কাছে পাহাড়ের একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় হামলা চালায়। এর কয়েক সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র নাইজেরিয়ার সোকোতো রাজ্যের গ্রামগুলোতে হামলা চালিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হামলার কোনোটির জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছিল না এবং তারা এগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। এর সঙ্গে আরেকটি সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে সামরিক ব্যয় দাঁড়ায় ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারে।
বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সালে তা ৪ দশমিক ৭ থেকে ৬ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ৬ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের হিসাবটি শীতল যুদ্ধের শেষ সময়ের সামরিক ব্যয়ের প্রায় পাঁচ গুণ এবং ২০২৪ সালের ব্যয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। একই জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ব থেকে চরম দারিদ্র্য দূর করতে ১০ বছরে আনুমানিক ২ দশমিক ৩ থেকে ২ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। ট্রাইকন্টিনেন্টাল আরও বলছে, বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে ন্যাটো প্লাস দেশগুলো থেকে এবং যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক ব্যয়কারী। বৈশ্বিক দক্ষিণে নতুন মানসিকতা এখানে গল্পের আরেকটি দিক আছে। গত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের পরিবর্তন আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু দেশের সামনে নিজেদের সার্বভৌমত্ব জোরালোভাবে প্রকাশের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে—এমনটাই মনে করে ট্রাইকন্টিনেন্টাল।
সাহেল অঞ্চলে বুরকিনা ফাসো, মালি ও নাইজারের উদ্যোগে অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটস বা এইএস গঠন তার একটি উদাহরণ। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের মামলায় বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়াও আরেকটি উদাহরণ। আবার ইন্দোনেশিয়া থেকে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ কাঁচামাল অপরিশোধিত অবস্থায় রপ্তানি না করে নিজেদের দেশে তার মূল্য সংযোজনের চেষ্টা করছে। তবে এখানে একটি শব্দ খুব গুরুত্বপূর্ণ—‘মুড’ বা মানসিকতা। বৈশ্বিক দক্ষিণে নতুন একটি রাজনৈতিক অনুভূতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু এটিকে এখনো পশ্চিমা জোটের বিরুদ্ধে একটি পূর্ণাঙ্গ, সুসংগঠিত রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বলা যায় না। এটি এমন একটি প্রবণতা, যা বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরীক্ষা করা হচ্ছে। ভেনেজুয়েলার ঘটনাটি সেই সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো কারাকাসে চীনের লাতিন আমেরিকাবিষয়ক বিশেষ দূত চিউ শিয়াওছির সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। তারা চীনের তৃতীয় লাতিন আমেরিকা নীতিপত্র, চীন-ভেনেজুয়েলার প্রায় ৬০০টি যৌথ উন্নয়ন প্রকল্প এবং ভেনেজুয়েলায় প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের চীনা বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভেনেজুয়েলার টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। এরপর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কারাকাসে হামলা হয়। হামলার পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘আধিপত্যবাদী কর্মকাণ্ড’ আন্তর্জাতিক আইন ও ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করেছে। কিন্তু সামরিকভাবে এই হামলা ঠেকানোর মতো বৈশ্বিক উপস্থিতি চীনের নেই।
চীন ও রাশিয়ার বড় সামরিক শক্তি রয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্রও আছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বজুড়ে তাদের সামরিক ঘাঁটি ও উপস্থিতি নেই। ট্রাইকন্টিনেন্টালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তাই তাদের সামরিক সক্ষমতা মূলত প্রতিরক্ষামুখী। ভেনেজুয়েলার ঘটনা ফলে বৈশ্বিক দক্ষিণের নতুন রাজনৈতিক মানসিকতার দুর্বলতা দেখিয়েছে। কিন্তু সেই মানসিকতার পরাজয় ঘটেছে—এমন নয়। বরং বিভিন্ন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের নিন্দা করেছে। নতুন রাজনৈতিক অনুভূতি টিকে আছে, যদিও তার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট।
বিশেষ ধরনের উগ্র ডানপন্থার উত্থান
ট্রাইকন্টিনেন্টালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘বিশেষ ধরনের উগ্র ডানপন্থা’। বিভিন্ন মহাদেশে এই শক্তি দ্রুত রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে তা ঘটেছে আরও দ্রুত। এর পেছনে কয়েকটি কারণ দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রথমত, সামাজিক গণতন্ত্রীদের ব্যর্থতা। বেকারত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও অপরাধের মতো গভীর সংকট তারা সমাধান করতে পারেনি। আইএমএফের আর্থিক শৃঙ্খলা ও কৃচ্ছ্রসাধনের নীতিও তাদের নীতিনির্ধারণকে সীমিত করেছে। দ্বিতীয়ত, পণ্যের দাম কমে যাওয়া। পণ্যের উচ্চমূল্যের সময়ে লাতিন আমেরিকার সামাজিক গণতান্ত্রিক সরকারগুলো জাতীয় আয়ের একটি অংশ পুনর্বণ্টন এবং সীমিত সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচির মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য কমানোর চেষ্টা করেছিল। সেই সময় শেষ হওয়ার পর তাদের রাজনৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়েছে।
তৃতীয়ত, অপরাধ ও মাদকবাণিজ্যের বিস্তার। শ্রমজীবী মানুষের এলাকাগুলোতে অপরাধ বেড়েছে, কিন্তু বাম ও সামাজিক গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো অনেক ক্ষেত্রে তার কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি। চতুর্থত, দুর্নীতির ভাষাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আইন ও বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন প্রক্রিয়া ব্যবহার করে কেন্দ্র-বাম ও সামাজিক গণতান্ত্রিক নেতাদের রাজনৈতিক বৈধতা দুর্বল করা হয়েছে। পঞ্চমত, ভয়কে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করা হয়েছে। ‘জেন্ডার আইডিওলজি’, নারীবাদ, কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ, আদিবাসীদের ভূমির দাবি এবং পরিবেশবাদী আন্দোলনকে একটি কল্পিত ‘সভ্যতাগত সংকটের’ অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে মানুষের মনে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে তাদের জীবনযাত্রা ও ঐতিহ্য নষ্ট করছে বামপন্থী, নারীবাদী কিংবা প্রগতিশীল শক্তি—নব্যউদারবাদী অর্থনৈতিক সংকট নয়।
ষষ্ঠত, বৈশ্বিক উত্তর থেকে বৈশ্বিক দক্ষিণে অর্থের প্রবাহ। স্পেনের ফোরো মাদ্রিদ-এর মতো আন্তঃদেশীয় ডানপন্থী প্ল্যাটফর্ম, ধর্মীয় নেটওয়ার্ক এবং ডিজিটাল অপতথ্যের নতুন পরিবেশ এই রাজনীতিকে শক্তিশালী করেছে। সপ্তমত, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও সুইফট-এর মতো আর্থিক কাঠামোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এবং প্রয়োজনে সরাসরি সামরিক শক্তি ব্যবহারের সক্ষমতাও এই বাস্তবতার অংশ। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে এই উগ্র ডানপন্থাকে ট্রাইকন্টিনেন্টাল দেখছে সার্বভৌমত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে এক ধরনের সাম্রাজ্যবাদী প্রতিক্রিয়া হিসেবে। সিমন বলিভার থেকে হুগো চাভেজ পর্যন্ত যে রাজনৈতিক ধারায় সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক পুনর্বণ্টনের প্রশ্ন সামনে এসেছিল, তারই একটি প্রকাশ ছিল ‘পিংক টাইড’। সেই ঢেউ যখন পিছু হটল, তার জায়গায় উঠল ‘ক্ষোভের ঢেউ’। চাভেজ, এভো মোরালেস ও নেস্তর কির্চনারের জায়গায় এলেন জাইর বোলসোনারো, হাভিয়ের মিলেই, দানিয়েল নোবোয়া, হোসে আন্তোনিও কাস্ত এবং নায়িব বুকেলে। ভবিষ্যৎ মানে আশা সবশেষে আসে ভবিষ্যতের প্রশ্ন। ট্রাইকন্টিনেন্টালের কাছে ভবিষ্যৎ মানে শুধু সমাজতন্ত্র নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘আশা’। অর্থাৎ বর্তমান পৃথিবীর সংকটকে চিরস্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে মেনে না নিয়ে ইতিহাস ও মানুষের সংগ্রামের ভেতর ভবিষ্যতের সম্ভাবনা খুঁজে নেওয়া। বিশেষ ধরনের উগ্র ডানপন্থা ‘সমৃদ্ধির ধর্মতত্ত্ব’-এর মাধ্যমে নিজেকে ভবিষ্যতের শক্তি হিসেবে হাজির করে।
কিন্তু ট্রাইকন্টিনেন্টালের মতে, তাদের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কৃচ্ছ্রসাধন, যুদ্ধ ও বৈষম্যের একটি স্থায়ী বর্তমান তৈরি করে এবং বামপন্থাকে অতীত হিসেবে দেখায়। ইতিহাস অবশ্য সেখানে থেমে থাকে না। বৈশ্বিক দক্ষিণ এখনো পশ্চিমা সামরিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছায়নি। ভেনেজুয়েলার ঘটনাই তার প্রমাণ। কিন্তু একই সময়ে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশে সার্বভৌমত্ব, উন্নয়ন ও নতুন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দাবি জোরালো হচ্ছে। একদিকে অতি-সাম্রাজ্যবাদ তার সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি আরও দ্রুত ব্যবহার করছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক দক্ষিণে তৈরি হচ্ছে নতুন এক রাজনৈতিক মানসিকতা। এই দুই প্রবণতার টানাপোড়েনই ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠতে পারে। এই কারণেই ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা জরুরি। কারণ বর্তমান যতই কঠিন হোক, ইতিহাস কখনো এক জায়গায় স্থির থাকে না।
কোয়ামে নক্রুমার ভাষায়— ‘সামনে এগিয়ে চলো, কখনো পেছনে নয়।’
লেখক: ইতিহাসবিদ, লেখক ও সমাজচিন্তক।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









