মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব সামলে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। তবে জরুরি তেলের মজুত কমে আসা, সরকারি ঋণ বৃদ্ধি ও বাজেটের ওপর চাপ বাড়ায় নতুন সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা কমছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতি শিগগিরই তার সহনশীলতার সীমায় পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ব্যাংককে প্রকাশিত সংস্থাটির সর্বশেষ ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানির বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হলে অনেক দেশের পক্ষে সাধারণ ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়া কঠিন হবে।
আইএমএফের মতে, গত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব আশঙ্কার তুলনায় কম ছিল। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথে তেল সরবরাহ এবং কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার ফলে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে জরুরি মজুত কমে আসা এবং সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে।
এ বছরের মার্চে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জরুরি তেলের মজুত বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দেয়। গত মাসে এ উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দেয় সংস্থাটি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বিগত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সমঝোতার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে রাশিয়ার ডিজেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এতে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা কম।
ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় সংস্থাটির অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সিলভানা তেনরেইরো বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখন পর্যন্ত সংকট মোকাবিলায় সহনশীলতা দেখালেও সেই সক্ষমতা ক্রমে সীমিত হয়ে আসছে। নীতিনির্ধারকদের অর্থনীতির সুরক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এর আগে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সরকারি ঋণ বৃদ্ধি ঠেকাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

নতুন প্রতিবেদনে ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ করেছে আইএমএফ। ২০২৭ সালের পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রেখে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২০২৬ ও ২০২৭—উভয় বছরেই ২ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত করা হলেও ২০২৭ সালের পূর্বাভাস কমিয়ে ১ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে ভোগ ও বিনিয়োগ কমে প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি সাময়িকভাবে বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে তড়িঘড়ি পদক্ষেপ না নেওয়ার পরামর্শ দিলেও চাপ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে বলেছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী বা বিস্তৃত হলে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়তে পারে। জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, সাইবার আক্রমণ ও চরম আবহাওয়াও পরিস্থিতি জটিল করতে পারে। ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলার আশঙ্কা এবং শান্তিচুক্তির আলোচনায় অগ্রগতির অভাব অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক বিনিয়োগের কারণে শেয়ারবাজারে বড় ধসের ঝুঁকিও রয়েছে। সব মিলিয়ে, প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়লেও জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









