ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হওয়ার মধ্যে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে মিসর। তবে কায়রোর প্রস্তাবিত সহায়তা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে সৌদি ভূখণ্ডের সুরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরোধ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দেওয়ার অনুমোদন চেয়ে পার্লামেন্টে জরুরি অধিবেশন আহ্বান করেছেন। রবিবার মিসরের স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় অধিবেশন বসার কথা। মিসরের আইন অনুযায়ী, পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ ঘোষণা করতে বা বিদেশে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য সেনা পাঠাতে পারেন না। প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য নিম্নকক্ষের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন।
শনিবার এক ভাষণে আল-সিসি বলেন, সৌদি আরবকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে মিসর। তবে তিনি পার্লামেন্টের অনুমোদন পাওয়ার আশা প্রকাশ করেন। রোববার মিসরের জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদও সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ভূখণ্ডের অখণ্ডতা, সম্পদ ও ইসলামি পবিত্র স্থানগুলো রক্ষায় দেশটির পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে।
কেন সৌদির পাশে মিসর?
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে মিসরের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদার। আল-সিসি গত মাসে বলেছিলেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তা মিসরের নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে দুই দেশের সম্পর্কের পাশাপাশি মিসরের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও উপসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ থমাস বনি জেমসের মতে, সৌদি আরবের ওপর হুতিদের নিরাপত্তাগত চাপ এবং অর্থনৈতিক উদ্বেগ—দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবেই মিসরের এই সিদ্ধান্ত।
হুতিরা লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হুমকি তৈরি করছে। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজ লক্ষ্য করে তাদের হামলার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে হামলা শুরুর পর থেকে সুয়েজ খাল প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব হারিয়েছে।
সুয়েজ খাল মিসরের বৈদেশিক আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ফলে লোহিত সাগরে অস্থিতিশীলতা দীর্ঘায়িত হলে তার অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হবে কায়রোকেও।
সৌদি আরবে বসবাস ও কাজ করেন লাখ লাখ মিসরীয় নাগরিক। দেশটি মিসরের রেমিট্যান্সের সবচেয়ে বড় একক উৎস। রিয়াদের বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক হামলায় একজন মিসরীয় নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন জেমস। এসব কারণে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি মিসরের জন্য শুধু আঞ্চলিক কূটনীতির বিষয় নয়, সরাসরি অর্থনৈতিক ও মানবিক স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত। এ ছাড়া তুরস্ক ও পাকিস্তানও সৌদি আরবকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আগস্টে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি সক্রিয় করার পর এই উদ্যোগগুলো সামনে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদির পাশে না দাঁড়ালে আঞ্চলিক মিত্র হিসেবে মিসরের অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

কী ধরনের সামরিক সহায়তা দিতে পারে মিসর?
সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, অনুমোদন পেলে মিসরের সহায়তার প্রধান ক্ষেত্র হতে পারে ড্রোন প্রতিরোধ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা, নৌপথে জাহাজ চলাচল সুরক্ষিত রাখা এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ, বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলো হুতিদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। সৌদি বাহিনী রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চলের কাছে ড্রোন প্রতিহত করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার ও হুতিদের মধ্যে লড়াই ছড়িয়ে পড়ার পর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অন্তত ২০ বার হামলার শিকার হয়েছে। সামরিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আলেক্সান্দ্রু হুদিস্তেয়ানুর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা জোরদার করা সবচেয়ে জরুরি। তার মতে, মিসরের সহায়তার প্রস্তাব শত্রুপক্ষকে নিরুৎসাহিত করার কৌশল হিসেবেও কাজ করতে পারে।
জেমসের ধারণা, সৌদি আরবের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা, ড্রোন প্রতিহত করা এবং নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে মিসরের সম্ভাব্য ভূমিকা। ইয়েমেনের সম্মুখযুদ্ধে মিসরের সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।
ইয়েমেনের পুরোনো অভিজ্ঞতা
মিসরের জন্য ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস সুখকর নয়। ষাটের দশকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছিলেন। সে সময় সৌদি আরব প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষকে সমর্থন করেছিল। যুদ্ধে মিসরের ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়। এই অভিজ্ঞতা বর্তমান সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবকে রক্ষা করা আর ইয়েমেনের যুদ্ধের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া এক বিষয় নয়। মিসর সম্ভবত এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা বজায় রাখতে চাইবে।

প্রতিরক্ষার সীমা কত দূর?
ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলা এবং হুতিদের পাল্টা আক্রমণে সংঘাত আরও বিস্তৃত হচ্ছে। তাই সৌদি ভূখণ্ড রক্ষায় মিসরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে স্থলবাহিনী ও বিমানশক্তির সাহায্যে উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখল করা সম্ভব হলেও পাহাড়ি অঞ্চল থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। মিসরের সামনে তাই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা দেওয়া, অন্যদিকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে চলা।
আল-সিসি স্পষ্ট করেছেন, তার প্রস্তাবের উদ্দেশ্য কাউকে আক্রমণ করা নয়, বরং সৌদি আরবকে রক্ষা করা। পার্লামেন্টের অনুমোদন মিললে সেই অবস্থান বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









