ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধের পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় দেশগুলোর সম্ভাব্য সামরিক বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। এই বাহিনীর সদস্যদের ওপর রুশ সেনারা হামলা চালালে আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালানোর অনুমতি থাকবে।
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনে সম্ভাব্য এই বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পোল্যান্ডে ‘এক্সারসাইজ কোয়ালিৎসজা’ নামে একটি সামরিক মহড়ার আয়োজন করা হয়েছে। এতে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ ১১টি দেশের প্রায় ২ হাজার ৮০০ সেনাসদস্য অংশ নিচ্ছেন। মহড়ার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে দ্রুত ইউক্রেনে সেনা মোতায়েন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের সক্ষমতা যাচাই করা হবে।
পরিকল্পিত এই বাহিনী ন্যাটোর অধীনে পরিচালিত হবে না। এতে ইউরোপীয় দেশগুলোর সেনাসদস্যরাই প্রধান ভূমিকা পালন করবেন। যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণ ছাড়াই বাহিনীটি পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এমনকি মহড়ায় মার্কিন যোগাযোগব্যবস্থা বা স্টারলিংকের মতো প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউক্রেনে মোতায়েন করা হলে এই বাহিনীর সদস্যরা আক্রান্ত হলে পাল্টা জবাব দিতে পারবেন। তবে তাদের সামরিক কার্যক্রম হবে আত্মরক্ষামূলক। বাহিনীটির অবস্থানও রাশিয়া-ইউক্রেনের সম্মুখযুদ্ধের সরাসরি রেখা থেকে দূরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীকে পুনর্গঠন ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এই মিশনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। পাশাপাশি যুদ্ধের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউক্রেনের বাণিজ্যিক বিমান চলাচল পুনরায় চালু করতে আকাশসীমায় যুদ্ধবিমান দিয়ে টহল দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে তুরস্কের নেতৃত্বে মাইন অপসারণের উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে।
মহড়ায় অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, জার্মানি, বেলজিয়াম, এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেন ও তুরস্ক। ব্রিটিশ বাহিনীর প্রায় ৩০০ সেনাসদস্য এতে অংশ নিচ্ছেন।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে দেশটির পাশে দাঁড়াতে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও তাদের মিত্ররা প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার ভাষায়, এটি শুধু কল্পনাভিত্তিক পরিকল্পনা নয়; যুদ্ধ বন্ধ হলে ইউক্রেনকে সহায়তা করার জন্য একটি বাস্তব সামরিক কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।
তবে এই বাহিনী আদৌ ইউক্রেনে মোতায়েন করা সম্ভব হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। কারণ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। ভূখণ্ড ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্যও রয়ে গেছে।
এ ছাড়া রাশিয়া আগেই সতর্ক করেছে, ইউক্রেনে বিদেশি সেনা মোতায়েন করা হলে তাদের বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। ফলে ইউরোপীয় সেনাদের ওপর রুশ হামলার ঘটনা ঘটলে তা সরাসরি রাশিয়া ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইউক্রেনে মার্কিন সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা নাকচ করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে যুদ্ধবিরতির পর ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইউরোপের এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের কূটনৈতিক ও সামরিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার আপত্তি এবং সম্ভাব্য পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকি এই পরিকল্পনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









