‘রাজনৈতিক আবহাওয়া বদলে গেছে’—গত বছর এমন কথাই শোনা যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নানা মহলে। কলাম লেখক থেকে শুরু করে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ—অনেকের ধারণা ছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরা শুধু রাজনীতির পুরোনো নিয়মই বদলে দেবে না, বদলে দেবে সামাজিক আচরণ ও কথাবার্তার ধরনও।
একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছিলেন, তিনি নিজেকে এখন অনেক বেশি স্বাধীন মনে করছেন। তার কথায়, এখন এমন সব শব্দ ব্যবহার করা যাবে, যা আগে বললে সামাজিকভাবে বর্জিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। যেন নতুন এক যুগের সূচনা হয়েছে।
সেই নতুন যুগে সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়ার কথা ছিল ধনকুবেরদের। প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীরা ট্রাম্পের মধ্যে এমন এক রাজনীতিককে পেয়েছিলেন, যিনি তাদের সঙ্গে শ্রমজীবী আমেরিকার মানুষের স্থায়ী রাজনৈতিক জোট গড়ে তুলতে পারেন। ট্রাম্পবাদের সবচেয়ে বড় কৌশল ছিল এই জোট। ন্যূনতম মজুরিতে কাজ করা মানুষ আর দেশের এক শতাংশ শীর্ষ ধনী—দুজনকেই একই রাজনৈতিক শিবিরে রাখা। লাতিন ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের পাশে দাঁড় করানো অভিবাসীবিদ্বেষী ও বর্ণবাদী মনোভাবের মানুষদের। এমনকি জেফরি এপস্টিনের মতো ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের বিরোধিতা করা মানুষের সঙ্গে সেই অভিজাত মহলের সম্পর্কও আড়াল করে রাখা।
কীভাবে সম্ভব হয়েছিল এই অদ্ভুত রাজনৈতিক সমীকরণ? শ্রেণিগত অসন্তোষকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল সংস্কৃতি ও পরিচয়ের লড়াইয়ে। মানুষের বেতন বাড়ছে না, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে—এসব প্রশ্নের বদলে সামনে আনা হয়েছিল অভিবাসী, জাতিগত বিদ্বেষ ও সামাজিক বিভাজনের নানা ইস্যু। ট্রাম্পের রাজনীতি বোঝাতে এটাই ছিল সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
সিলিকন ভ্যালি, ওয়াল স্ট্রিট এবং পূর্ব উপকূলের সংবাদমাধ্যমের মালিকদের অনেকেই ভেবেছিলেন, ট্রাম্পবাদের উত্থান কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশল নয়; যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতিই ডান দিকে মোড় নিচ্ছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনের ফলাফল সেই ধারণাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইলন মাস্কের মতো অতি ধনী দাতারা ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থীদের পেছনে বিপুল অর্থ ঢেলেছেন। কিন্তু শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের বড় অংশ তাদের সঙ্গে থাকেনি। যে জোট ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে ফিরিয়ে এনেছিল, পুরোনো শ্রেণির রাজনীতিই সেই জোটে ফাটল ধরিয়েছে।
এর কারণ খুঁজতে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি। গাড়িনির্ভর দেশে জ্বালানির রেকর্ড দাম, ডিম থেকে মাংস পর্যন্ত নিত্যপণ্যের দামের ওঠানামা, বাড়িভাড়া পরিশোধের চাপ—সব মিলিয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবন কঠিন হয়ে উঠেছে। এসবকে অনেকে শুধু ‘অর্থনৈতিক সমস্যা’ বা ‘সাশ্রয়ক্ষমতার সংকট’ বলে বর্ণনা করেন। কিন্তু এর গভীরে রয়েছে শ্রেণিবৈষম্যের প্রশ্ন। গত বছর নিউইয়র্কের গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী জোহরান মামদানি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিকে নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন। সেটি ছিল নিছক জনপ্রিয় স্লোগান নয়; বরং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্দশাকে রাজনৈতিক আলোচনার মূল জায়গায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। ২০২৬ সালের শেষ দিকে এসে নিউইয়র্কের মেয়র মামদানি এখন জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাবশালী।
মামদানির রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে আয়ের বৈষম্যের সম্পর্কটি সামনে এনেছেন। মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার সামর্থ্য কমে যাওয়ার কারণ শুধু পণ্যের অতিরিক্ত দাম নয়; অনেক ক্ষেত্রে তাদের আয়ও ন্যায্য হারে বাড়ছে না। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলই করব্যবস্থায় এমন পরিবর্তন এনেছে, যাতে শ্রমের আয়ের চেয়ে সম্পদের মালিকানা বেশি সুবিধা পায়। ফলে দেশটির সবচেয়ে ধনী ৪০০টি পরিবার এখন যুক্তরাষ্ট্রের দরিদ্রতম অর্ধেক মানুষের তুলনায় কম হারে কর দেয়। অর্থনীতিবিদ ফ্রেড ম্যাগডফ ও জন বেলামি ফস্টার তাদের নতুন বই ‘গ্র্যান্ড থেফট ক্যাপিটাল: হোয়াট ওয়ার্কার্স শুড নো অ্যাবাউট দ্য অ্যাফোর্ডেবিলিটি ক্রাইসিস’-এ দেখিয়েছেন, ১৯৬০-এর দশকে জাতীয় আয়ের ৩০ শতাংশ পেতেন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। এখন তাদের অংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২০ শতাংশে। অর্থাৎ উৎপাদন ও অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে শ্রমিকদের অবদান থাকলেও তার সুফল তাদের কাছে আগের তুলনায় কম পৌঁছাচ্ছে। এই সংকট তৈরিতে দুই প্রধান দলেরই ভূমিকা রয়েছে। আর ২০১৬ সালে এই ক্ষোভই ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতির সবচেয়ে স্পষ্ট বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে ধনীদের সম্পদ আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি করা।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় ভরসা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ জেসন ফারম্যানের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধির ৯২ শতাংশ এসেছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির সুফল যাচ্ছে মূলত অল্প কয়েকজন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীর হাতে। তাদের অধিকাংশের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের প্রযুক্তি-শিল্পকেন্দ্রিক এলাকায়। অক্টোবরে বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান অ্যাপোলো জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ৫০০ কোম্পানির তালিকা এসঅ্যান্ডপি ৫০০-তে থাকা মাত্র সাতটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ভালো করছে। বাকি ৪৯৩টি প্রতিষ্ঠানের আয় ও মুনাফায় তেমন প্রবৃদ্ধি নেই। অ্যাপোলোর প্রধান অর্থনীতিবিদ টর্স্টেন স্লকের মন্তব্য, বিপুল বিনিয়োগ ও প্রচারণা সত্ত্বেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ কোম্পানির জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুফল বয়ে আনতে পারেনি। অর্থাৎ এআইয়ের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, কিন্তু তার লাভ যাচ্ছে স্যাম অল্টম্যান, দারিও আমোদেই ও জেনসেন হুয়াংয়ের মতো প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের দিকে। সিলিকন ভ্যালির বাইরে থাকা সাধারণ মানুষের ভাগে পড়ছে সামান্যই।
এ কারণেই এবারের নির্বাচনে অনেক এলাকার ভোটারদের কাছে সবচেয়ে অপছন্দের বিষয় হয়ে উঠেছিল ডেটা সেন্টার। এআই প্রযুক্তি চালাতে প্রয়োজনীয় এসব স্থাপনা বিপুল বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার করে। স্থানীয় পরিবেশ ও জনজীবনের ওপরও এগুলোর চাপ তৈরি হয়। অথচ এসব অবকাঠামোর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ইকোনমিস্টের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব এলাকায় ডেটা সেন্টার গড়ে উঠেছে, সেসব এলাকার ট্রাম্প-সমর্থকদের একটি অংশ দ্রুত ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকছেন। অর্থাৎ এআই নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের প্রচারণার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার সংঘাত তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ টেক্সাস। একসময় রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই অঙ্গরাজ্যে এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জয় পেয়েছেন। অথচ সেখানে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পেছনে একাই প্রায় ২৫ কোটি ডলার ব্যয় করেছিলেন ইলন মাস্ক।
টেক্সাস মাস্কের ব্যবসা ও প্রযুক্তি সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আগামী কয়েক বছরে অঙ্গরাজ্যটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ডেটা সেন্টারকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, দুই বছরের মধ্যে দেশটির এআই শিল্পে নতুন যুক্ত হওয়া কম্পিউটিং সক্ষমতার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি আসবে টেক্সাস থেকে।
কিন্তু ডেটা সেন্টারবিরোধী অবস্থান নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন জেমস তালারিকো। বিজয়ের পর তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত লড়াই বাম ও ডানের মধ্যে নয়, ওপরের তলার মানুষ আর নিচের তলার মানুষের মধ্যে। তার ভাষায়, ক্ষমতাবানেরা দল, বর্ণ, লিঙ্গ, ধর্ম ও সংস্কৃতির বিভাজন তৈরি করে সাধারণ মানুষকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করান, যাতে তাদের পকেট থেকে অর্থ তুলে নেওয়ার বিষয়টি আড়ালে থাকে। এবারের নির্বাচনে মানুষ সেই বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। এবারের নির্বাচনে যেসব ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় এসেছেন, তাদের অনেকের প্রচারের কেন্দ্রে ছিল বৈষম্য ও ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির প্রশ্ন। মেইনে ট্রয় জ্যাকসন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিই বিলুপ্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে জয়ী হয়েছেন। মিশিগানে আবদুল এল-সাইয়েদ জয় পেয়েছেন সবার জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা বা মেডিকেয়ার চালুর প্রতিশ্রুতি নিয়ে।
এসব ফলাফল ডেমোক্র্যাটদের জন্য নতুন রাজনৈতিক পথের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুর্নীতি, যুদ্ধ এবং ধনকুবেরদের রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে আরও জোরালো অবস্থান নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিল ও হিলারি ক্লিনটনের সময় এ ধরনের অবস্থানকে হয়তো দলের জন্য অতিরিক্ত বামপন্থী বলে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রার্থীদের ভাষা সম্ভবত বার্নি স্যান্ডার্সের রাজনৈতিক অবস্থানের কাছাকাছি হবে। ট্রাম্পের জন্য অবশ্য সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন সময়। ক্ষমতায় থেকেও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে তার। একসময় তিনি বলেছিলেন, নিউইয়র্কের ফিফথ অ্যাভিনিউয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কাউকে গুলি করলেও তাঁর ভোট কমবে না। নিজের জনপ্রিয়তা নিয়ে এমন আত্মবিশ্বাসই ছিল ট্রাম্পবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু এবারের নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়ে দিল, সেই আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি দুর্বল। সংস্কৃতির লড়াই দেখিয়ে শ্রেণিবৈষম্যের প্রশ্নকে অনন্তকাল আড়াল করে রাখা যায় না। মানুষ যখন বাড়িভাড়া, খাবার, জ্বালানি ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে হিমশিম খায়, তখন শেষ পর্যন্ত রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসে একটি পুরোনো প্রশ্ন: দেশের সম্পদ কারা তৈরি করছে, আর তার সুফল ভোগ করছে কারা?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









