চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার খলনায়ক আশরাফুল হক ডনকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
রবিবার (৯ আগস্ট) বিকেলে ডনকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। এ সময় তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন সিআইডির পরিদর্শক আরিফুর রহমান। এ আবেদনের ওপর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক শাহ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সিআইডির আবেদনে বলা হয়েছে, আসামি আশরাফুল হক ডনকে রোববার ভোর ৫টার দিকে বিমানবন্দর থেকে আটক করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এ মামলায় পলাতক ছিলেন। বর্তমানে তাকে পুলিশ হেফাজতে এনে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া চলছে।
আবেদনে আরও বলা হয়, ডন জামিনে মুক্ত হলে মামলার তদন্তে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে এবং তিনি আবারও পলাতক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে তাকে কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ। তার মৃত্যুর ঘটনায় তখন অপমৃত্যুর মামলা করেন বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরের বছর ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ তুলে ওই মামলাকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি। আদালত অপমৃত্যু ও হত্যার অভিযোগ একসঙ্গে তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন।
১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় সিআইডি। এতে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত ওই প্রতিবেদন গ্রহণ করেন। তবে সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী।
সবশেষ গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদীপক্ষের রিভিশন মঞ্জুর করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
এরপর ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় মামলাটি করেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর। মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও অনেককেও আসামি করা হয়েছে।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন—শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ফরহাদ।
মামলার বাদী মোহাম্মদ আলমগীর অভিযোগে উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার বোন নিলুফার জামান চৌধুরী (নীলা চৌধুরী), বোনের স্বামী কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী এবং তাদের ছোট ছেলে শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহর সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, সালমান ঘুমিয়ে আছেন।
কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে জানান, সালমানের কিছু হয়েছে। এরপর তারা দ্রুত বাসায় ফিরে সালমানকে শয়নকক্ষে নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। কয়েকজন বহিরাগত নারী তখন তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন। পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসেছিলেন।
সালমানের মা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ করেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখতে পান বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সালমান শাহকে মৃত ঘোষণা করেন।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, মৃত্যুর আগে সালমানের বাবা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী ছেলের মৃত্যুকে হত্যা বলে সন্দেহ করেছিলেন। এ কারণে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করে রমনা থানার অপমৃত্যুর মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ এবং সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের অনুরোধ করেন।
সালমান শাহর বাবার মৃত্যুর পর তার বোনের পক্ষ থেকে মামলাটি পরিচালনা করছেন মোহাম্মদ আলমগীর। মামলায় অভিযুক্তদের কেউ মারা গিয়ে থাকলে প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে গত ২০ মে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তার মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। পরে ২৪ মে মরদেহ উত্তোলন, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্তের অনুমতি দেওয়া হয়।
তবে মরদেহ উত্তোলনের আদেশ বাতিল চেয়ে বাদীপক্ষ আবেদন করলে আদালত তা নথিভুক্ত করেন। পরে গত ২২ জুন দেহাবশেষ উত্তোলনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ-সংক্রান্ত আদেশের অনুলিপি আদালতে দাখিল করা হলে সেটিও নথিভুক্ত করা হয়।
সালমান শাহ হত্যা মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৩০ আগস্ট দিন ধার্য রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









