চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফর শুধু আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর ছিল না। এর মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে—তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে, মতবিরোধও থাকবে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যেন সরাসরি সংঘাতে না গড়ায়।
বুধবার ওয়াশিংটনের অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে শি জিনপিং ও তার স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানকে স্বাগত জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। ছয় দশকের মধ্যে এই প্রথম কোনো বিদেশি নেতাকে তার দেশে পৌঁছানোর পর বিমানঘাঁটিতে এভাবে স্বাগত জানাতে প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রী একসঙ্গে উপস্থিত হলেন।
মাত্র পাঁচ মাসেরও কম সময়ে ট্রাম্প ও শি দুবার বৈঠক করলেন। এই ঘন ঘন সাক্ষাৎই বলে দিচ্ছে, দুই দেশ আপাতত সংঘাতের বদলে প্রতিযোগিতাকে নিয়ন্ত্রণ করার পথ বেছে নিয়েছে।
ট্রাম্প একে বলেছেন চীনের সঙ্গে ‘ন্যায্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক’।
শি বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্ক হওয়া উচিত ‘অংশীদারত্বের’—যা শুধু চীন ও যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা বিশ্বের জন্যও উপকারী।
এই সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে, তার প্রভাব দুই দেশের সীমানার অনেক বাইরে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিশ্বের দুই প্রধান শক্তি। তাদের মধ্যে ভুল হিসাব, সামরিক উত্তেজনা বা আকস্মিক সংঘাত এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল তো বটেই, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকেও দীর্ঘ সময়ের জন্য অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
এক অর্থে, ওয়াশিংটন ও বেইজিং তাদের পার্থক্য কীভাবে সামলাবে, তার ওপর একুশ শতকের আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় অংশ নির্ভর করছে।
শি জিনপিংয়ের এই সফরে অবশ্য একটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর এমন ঘটনা আগে দেখা যায়নি। হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় দুই প্রেসিডেন্টই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের যৌথ লড়াইয়ের কথা বলেছেন।
এই স্মৃতিচারণ জাপানের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই ইতিহাসের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক সরাসরি জড়িত। ফলে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বিষয়টি কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করতেই পারে।
তবে এটিকে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র-জাপান সম্পর্কের বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখারও কারণ নেই। যুদ্ধের ইতিহাস স্মরণ করা আর বর্তমান সামরিক জোটের কাঠামো বদলে ফেলা—দুটি এক বিষয় নয়।
বৈঠকে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ, উত্তর কোরিয়া, ইরান এবং হরমুজ প্রণালিসহ নানা ভূরাজনৈতিক বিষয় উঠে এসেছে।
দুই নেতা একমত হয়েছেন, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। আন্তর্জাতিক জলপথ ব্যবহারের ওপর নতুন কোনো ফি আরোপেরও বিরোধিতা করেছেন তারা।
কিন্তু সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়—তাইওয়ান—সেভাবে আলোচনায় আসেনি। এর আগে ২৬ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তাইওয়ান বিষয়ে শি তার অবস্থান জানেন এবং বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়নি।
অথচ গত মে মাসে বেইজিংয়ে বৈঠকের সময় শি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, তাইওয়ান চীনের জন্য একটি ‘লাল রেখা’। যুক্তরাষ্ট্রকে এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে—এটাই ছিল বেইজিংয়ের বার্তা।
এদিকে তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন অস্ত্র প্যাকেজ এখনো ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়ে এটি আটকে থাকলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না—অন্তত যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক বা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বড় কোনো পরিবর্তন না এলে।
অর্থনীতির জায়গায় অবশ্য দুই দেশের মধ্যে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্য-যুদ্ধের বিরতি ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
চীন ১৭ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য কিনবে। ২০২৭ ও ২০২৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিবছর অন্তত এক কোটি মেট্রিক টন কয়লাও আমদানির কথা জানিয়েছে।
দুই দেশ যৌথভাবে বাণিজ্য বোর্ড ও বিনিয়োগ বোর্ড গঠনের ব্যাপারেও একমত হয়েছে। বিরল মাটি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগও আলোচনায় এসেছে। লক্ষ্য হচ্ছে এসব পণ্যের সরবরাহ আবার ‘উপযুক্ত মাত্রায়’ ফিরিয়ে আনা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও নতুন একটি কাঠামো তৈরির কথা হয়েছে। ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা এআই-এর বদলে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ বা এসআই নিয়ে দুই দেশ আলোচনা করবে। এ জন্য গঠন করা হবে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সুপার ইন্টেলিজেন্স ডায়ালগ। প্রযুক্তিটির ঝুঁকি ও সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময়ের পাশাপাশি কোনো অপব্যবহারের ঘটনা ঘটলে দ্রুত যোগাযোগের জন্য একটি হটলাইনও চালু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে এখানেও বাস্তবতা খুব সরল নয়। প্রযুক্তি নিয়ে সহযোগিতার কথা বলা যত সহজ, জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার জায়গায় সমঝোতা করা ততটা সহজ নয়। এআই এখন কেবল প্রযুক্তির বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, সামরিক শক্তি এবং ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতিরও অংশ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কূটনৈতিক যোগাযোগের ধারাবাহিকতা। নভেম্বরে চীনের শেনঝেনে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন বা এপেক সম্মেলন এবং ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে জি-২০ সম্মেলনে দুই দেশই একে অপরকে সহযোগিতা করার কথা জানিয়েছে। দুই প্রেসিডেন্টই সেখানে উপস্থিত থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
সব মিলিয়ে, এই বৈঠকের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি নয়। বরং দুই শক্তিধর রাষ্ট্র আপাতত একটি বিষয় মেনে নিয়েছে—তাদের প্রতিযোগিতা চলবে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতাকে যুদ্ধের দিকে যেতে দেওয়া যাবে না।
তবে এটিই শেষ কথা নয়। তাইওয়ান, বাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের স্বার্থের সংঘাত রয়ে গেছে।
আজকের স্থিতিশীলতা তাই কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; এটি বরং এমন এক বিরতি, যার ওপর আগামী দিনের আরও কঠিন দর-কষাকষি দাঁড়িয়ে আছে।
তবু এই বিরতিটুকুর মূল্য কম নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো দুই পরাশক্তি যখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে, তখন একটি ভুল পদক্ষেপের মূল্য শুধু তাদের দুজনকেই দিতে হয় না—তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্বে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









