যে সময়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধ, মৃত্যু, দমন-পীড়ন আর মানুষের অসহাত্ব বাড়ছে, সে সময়ে নোবেল পুরস্কারের মতো একটি আন্তর্জাতিক সম্মান শুধু পুরস্কার হিসেবে দেখা কঠিন। প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সময়ের রাজনীতি, নৈতিকতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
২০২৫ সালের নোবেল সাহিত্যে পুরস্কার পেয়েছেন হাঙ্গেরির লেখক ‘লাসলো ক্রাসনাহোরকাই’। নোবেল কমিটির ভাষায়, তার পুরস্কার পাওয়ার কারণ হলো—ধ্বংস ও বিপর্যয়ের সময়েও তার শক্তিশালী ও দূরদর্শী সাহিত্য শিল্পের ক্ষমতাকে নতুন করে তুলে ধরার যে অতুলনীয় ক্ষমতা।
ক্রাসনাহোরকাই দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির সরাসরি পরিচয় থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক চিন্তার মাঝে নিজেকে সপে দেওয়া মানে অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট সত্যের মধ্যে নিজেকে আটকে ফেলা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আজকের পৃথিবীতে একজন লেখক কি রাজনীতি থেকে সত্যিই দূরে থাকতে পারেন? একজন মানুষ কি সম্পূর্ণ রাজনীতি নিরপেক্ষ থাকতে পারেন?
ফরাসি লেখক মার্গারিত দ্যুরাসের বহুল আলোচিত ধারণা ছিল—রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বাইরে থাকা কঠিন। কারণ একজন লেখক যখন যুদ্ধ, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, মৃত্যু কিংবা মানুষের ভয়ের কথা লেখেন, তখন তার লেখার মধ্য দিয়েই সেই সময়ের রাজনীতি ঢুকে পড়ে।
ক্রাসনাহোরকাইয়ের সাহিত্যও তার ব্যতিক্রম নয়। তার ‘সাতানট্যাঙ্গো’, ‘দ্য মেলানকোলি অব রেজিটেনন্স’ এবং ‘ওয়্যার এন্ড ওয়্যার’–এর মতো মহাকাব্যিক উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই বিধ্বম্ত ভেঙে পড়া এক পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি। যেখানে বাস্তবতা আর স্বপ্নের সীমারেখা বিলিন হয়ে গেছে। বিশ্বাস ও সন্দেহ পাশাপাশি হাঁটে। রাজনীতি আছে, কিন্তু তার সঙ্গে আছে বিশাল শূন্যতা। মানুষের চারপাশে যেন সব সময় কোনো না কোনো বিপর্যয় আসন্ন। আর সেই বিপর্যয়, ভয়,শঙ্কা, স্বপ্নদৃশ্যের পর দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে আমাদের তাদের অস্তিত্বের শক্তিকে প্রতি মুহূর্তে জানান দেয়।
লাসলোর সাহিত্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি পাঠককে সহজ কোনো আশার কথা বলেন না। তাঁর দীর্ঘ বাক্য, বিরতিহীন মনোলগ, দর্শন আর বৃষ্টিস্নাত অন্ধকার পরিবেশ পাঠককে এক অস্থির জগতে নিয়ে যায়। তার সাহিত্য যেন সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য নয়; বরং পৃথিবীর বিপর্যস্ত মানুষ ও কষ্টের সামনে পাঠককে দাড় করিয়ে দেয়।
দস্তয়ভস্কি, কাফকা ও হারম্যান মেলভিল ক্রাসনাহোরকাইয়ের প্রিয় লেখক। দস্তয়েভস্কির প্রতি তার আকর্ষণের জায়গাটি বিশ্বাসের চেয়ে বেশি বিশ্বাসের সংকটের। দস্তয়েভস্কি সন্দেহ থেকে বিশ্বাসের দিকে এগিয়েছিলেন; ক্রাসনাহোরকাইয় ঠিক তার উল্টো—বিশ্বাস থেকে সন্দেহের দিকে।
যে কোন বিচারে লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের সাহিত্য অন্য অনেক পূর্ব ইউরোপীয় লেখকের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। যেমন ইভান ক্লিমার লেখায় মানবিকতা, নৈতিকতা ও সামান্য হলেও আশার আলো দেখা যায়। ক্রাসনাহোরকাইয়ের জগতে সেই আলো প্রায় নেই বললেই চলে। ক্লিমা যেখানে বিধ্বস্ত পৃথিবীকে আবার অর্থপূর্ণ করার চেষ্টা করেন, ক্রাসনাহোরকাই সেখানে শুধু ধ্বংসস্তূপের পর ধ্বংসস্তূপের দৃশ্যকাব্য লিখেন।
তিনি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের লেখক নন। কমিউনিজম হোক কিংবা পুঁজিবাদ—দুই ব্যবস্থার মধ্যেই তিনি মানুষের পতনের সম্ভাবনা দেখেছেন। তার কাছে ব্যবস্থার পোশাক বদলায়, কিন্তু মানুষের উদ্বেগ-ভয়-শঙ্কা-মর্যাদাহীনতা অবিকল একই রকম থেকে যায়।
আজকের পৃথিবীর সাপেক্ষে এখানেই লাসলো ক্রাসনাহোরকাইকে নিয়ে সমালোচনার জায়গাটিও তৈরি হয়। কেউ কেউ মনে করেন, সমকালীন যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের সময়ে একজন বিশ্বখ্যাত লেখকের ‘নীরবতা নিজেই’ একটি রাজনৈতিক অবস্থান। যখন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ রক্তাক্ত হচ্ছে, তখন শুধু ধ্বংসের বর্ণনা দেওয়া কি যথেষ্ট? নাকি লেখকের কণ্ঠ আরও সরাসরি কিছু শোনার জন্য পাঠক অপেক্ষা করে?
এর বিপরীতেও যুক্তি আছে। সাহিত্যিকের কাজ সব সময় রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া নয়। একজন লেখক হয়তো সরাসরি কোনো যুদ্ধের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন না, কিন্তু তার সাহিত্য যদি মানুষের ভয়, একাকিত্ব, পতন ও অসহাত্বতার গভীরে পৌঁছে যায়, সেটিও এক ধরনের প্রতিবাদ হতে পারে।
ক্রমশ ভেঙ্গে পড়া বিপর্যস্ত মানুষেরা যদি সত্যিই তাদের এই বাস্তবতাকে সত্যিকার অর্থেই উপলব্দি করতে সক্ষম হয় তখন অস্তিত্বের সম্পূর্ণ বিলোপ থেকে বাঁচতে বা মুক্তি পেতে মানুষ ও পৃথিবী তখন আর কোন নির্দিষ্ট চিন্তা বা ব্যবস্থার প্রতি আকর্ষণ বোধ করে না। বরং সে মানুষ হিসেবে নিজেকে অনুভব করার সময় পায়। আর এখানেই ক্রাসনাহোরকাই যেন সচেষ্ট থাকেন। মানুষের প্রতি, মানুষের সকল মানবিক অনুভবের প্রতি তিনি নিবিড় দৃষ্টি রাখেন। এক অপরিবর্তনীয় পৃথিবীতে কিভাবে সত্বা হিসেবে মানুষ এতো এতো ধ্বংস-বিপর্য-যুদ্ধ-মৃত্যুর মাঝেও সে টিকে থাকে। লাসলো ক্রাসনাহোরকাই চিরচেনা উদ্বেগ-ভয়-শঙ্কা-মর্যাদাহীনতা আর সন্দেহের ভেতর।
ক্রাসনাহোরকাইয়ের সাহিত্যে নোবেল শুধু একজন লেখকের পুরস্কার পাওয়ার গল্প নয়। এটি আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে আনে—‘ধ্বংসের সময়ে একজন লেখকের দায়িত্ব কী?’ লেখক কি শুধু ধ্বংসের ছবি আঁকবেন, নাকি সেই বিপর্যস্ত পৃথিবী বদলানোর আহ্বানও জানাবেন?
ক্রাসনাহোরকাই সচেতনভাবে প্রথম পথটি বেছে নিয়েছেন। তার সাহিত্য পৃথিবীর ক্ষতকে ঢেকে দেয় না; বরং ক্ষতটি আরও স্পষ্ট করে দেখায়। তাঁর রচনায় আশা ক্ষীণ, কিন্তু মানুষের ভয় ও যন্ত্রণা খুব বাস্তব। খুব জীবন্ত।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের সাহিত্যকে আমরা এভাবেও পড়তে পারি—তার সাহিত্য কোন পরিবর্তনের ম্যানিফেস্টো নয়, বরং বিপর্যস্ত ভেঙে পড়া ভয়ে থরো থরো পৃথিবীর দীর্ঘ সাক্ষ্যৎকার। আর সেই কারণেই হয়তো তার নোবেল ঘিরে প্রশ্নটি থেকে যাবে—
নীরবতা কি সত্যিই নিরপেক্ষতা, নাকি কখনো কখনো নীরবতাও একটি রাজনৈতিক ভাষা? সম্ভবত ক্রাসনাহোরকাইয়ে নীরবতাও একটা বিশেষ প্রতিবাদের ধরণ।

লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: সাহিত্য, অনুবাদ ও বদলে যাওয়া পৃথিবী
হাঙ্গেরীয় কথাসাহিত্যিক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই তার দীর্ঘ, প্রবহমান বাক্য এবং অন্ধকার অথচ গভীর মানবিক দৃষ্টির জন্য বিশ্বসাহিত্যে আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন। চলচ্চিত্র নির্মাতা বেলা তারর-এর সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক তার সাহিত্যকে চলচ্চিত্রের দর্শকদের কাছেও পৌঁছে দিয়েছে। ‘সাতানট্যাঙ্গো’, ‘দ্য মেলানকোলি অব রেজিটেনন্স’ এবং ‘ওয়্যার এন্ড ওয়্যার’ ও ‘সেইওবো দেয়ার বিলো’ ক্রাসনাহোরকাইয়ের উল্লেখযোগ্য বই। ২০১৫ সালে তিনি ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার ও ২০২৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান।
২০১২ সালে কবি জর্জ সিয়ার্তেস ই-মেইলে তার একটি সাক্ষাৎকার নেন। ‘দ্য হোয়াই রিভিউ’-তে সেপটেম্বর ১০১৩ সালে সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়। সাক্ষাৎকারে লাসলো ক্রাসনাহোরকাই অনুবাদ সাহিত্য, বার্লিন, লেখার অভ্যাস, প্রিয় লেখক এবং পৃথিবীর পরিবর্তন নিয়ে কথা বলেছেন। পাঠকের জন্য আমরা এখানে সাক্ষাৎকারটি তুলে রাখলাম।
প্রশ্ন: অনুবাদের সুবিধা, অসুবিধা বা ঝুঁকি কী?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: সুবিধা-অসুবিধার কথা না হয় বাদই দিলাম। ঝুঁকি আছে কি না, সেটাই বলি। আমার মনে হয়, অনুবাদের ক্ষেত্রে আসলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
অনুবাদ করা বইটি মূল বইয়ের হুবহু একই বই নয়। এটি অনুবাদকের ভাষায় একটি নতুন সৃষ্টি। মূল বইয়ের গল্প ও ভাবনা লেখকের, কিন্তু অনুবাদ করা বইটির ভাষা তৈরি করেন অনুবাদক। তাই অনুবাদক অনেকটা সেই নতুন বইয়ের স্রষ্টা।
আমি আমার বইয়ের অনুবাদ পড়ি। কখনো মনে হয়, মূল লেখার খুব কাছাকাছি এসেছে; কখনো আরও দূরে। ভালো হলে আমি আনন্দ পাই, খারাপ হলে রাগও হয়।
একবার জার্মান ভাষায় ‘ওয়্যার এন্ড ওয়্যার’-এর অনুবাদ দেখে খুব রেগে গিয়েছিলাম। বইটি এত খারাপ হয়েছিল যে সেটি ঠিক করাও প্রায় অসম্ভব মনে হয়েছিল। তবে আমার অন্যান্য অনুবাদকদের নিয়ে আমি খুবই আনন্দিত। তারা অসাধারণ কাজ করেছেন।
প্রশ্ন: আপনি বার্লিনে বেছে নিলেন কেন?
ক্রাসনাহোরকাই: ১৯৮৭ সালে প্রথম দীর্ঘ সময় বার্লিনে থাকার পর শহরটির সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। তখন পশ্চিম বার্লিন ছিল আহত মনের মানুষের আশ্রয়স্থল।
অনেক শিল্পী সেখানে আসতেন। যারা শিল্পী হতে চেয়েছিলেন, তারাও আসতেন। সবচেয়ে ভালো লাগত এই ভেবে যে, আমি এমন একটি বারে বসতে পারছি, যেখানে আমার পছন্দের বড় শিল্পীরাও বসেন। একই টেবিলেও বসা যেত। মনে হতো, আমরা যেন একই পরিবারের মানুষ।
সম্পর্কটি এখনো আছে। কিন্তু আজ আর বার্লিনকে আগের মতো ভালো লাগে না। এখন মনে হয়, অনেক শিল্পী সেখানে শিল্প সৃষ্টি করার চেয়ে নিজেদের কাজ বিক্রি করতেই বেশি আগ্রহী। যদি তাই হয়, তাহলে এই শহর আর অন্য শহরের মধ্যে পার্থক্যটা রইল কোথায়?

প্রশ্ন: আপনার লেখার অভ্যাস কেমন?
ক্রাসনাহোরকাই: আমি সাধারণভাবে টেবিলে বসে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে থাকি না, কখন একটা ভাবনা আসবে সেই অপেক্ষাও করি না। মাথার ভেতর লিখতে থাকি।
যখন লেখালেখি শুরু করি, তখন জীবন খুব সহজ ছিল না। লেখার জন্য আলাদা টেবিল ছিল না, একা থাকার সুযোগও ছিল না। তাই মাথার ভেতর বাক্য তৈরি করার অভ্যাস গড়ে উঠল।
একটি বাক্য শুরু করি। ভালো মনে হলে সেটিকে ধীরে ধীরে বাড়তে দেই। যতক্ষণ না বাক্যটি নিজের স্বাভাবিক শেষ খুঁজে পায়, ততক্ষণ সেটি মাথার মধ্যে থাকে। তারপর লিখে ফেলি।
এখনো একইভাবে লিখি। জায়গা বা সময় কোনো ব্যাপার নয়। যেখানেই থাকি, যখনই থাকি, মাথার মধ্যে লেখা চলতে থাকে। শেষে সব লিখে রাখি। পরে সাধারণ অর্থে খুব বেশি সংশোধন করতে হয় না, কারণ বেশির ভাগ সংশোধন মাথার মধ্যেই হয়ে যায়।
প্রশ্ন: কাফকার মতো ধ্রুপদি লেখকদের বাইরে আর কী পড়েন?
ক্রাসনাহোরকাই: আমি যখন কাফকা পড়ি না, তখন কাফকার কথা ভাবি। যখন কাফকার কথা ভাবি না, তখন তাকে ভাবতে ইচ্ছে করে। কিছুদিন তাকে না পড়লে আবার বই খুলে বসি।
হোমার, দান্তে, দস্তয়েভস্কি, প্রুস্ত, এজরা পাউন্ড, বেকেট, টমাস বার্নহার্ড, আতিলা ইয়োঝেফ, শান্দর ভেরেশ এবং পিলিনস্কির ক্ষেত্রেও প্রায় একই ব্যাপার ঘটে।

প্রশ্ন: এখন ‘সাতানট্যাঙ্গ’ এত জনপ্রিয় হলো কেন বলে মনে করেন?
ক্রাসনাহোরকাই: যারা আগে বেলা তার ও আমার তৈরি ‘সাতানট্যাঙ্গো’ চলচ্চিত্রটি দেখেছেন, অথবা ‘সাতানট্যাঙ্গো’, ‘দ্য মেলানকোলি অব রেজিটেনন্স’, ‘ওয়্যার এন্ড ওয়্যার’এ্যানিমেলসাইড’ পড়েছেন, তারা হয়তো বইটির জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
আমার মনে হয়, প্রকাশের সময় বইটি এমন অনেক পাঠকের কাছে পৌঁছেছে, যারা শুধু নতুনত্বের জন্য নতুন কিছু চাননি— এমন একটি বই চেয়েছেন, যা পৃথিবী সম্পর্কে কিছু বলে।
তারা শুধু বিনোদন চান না। জীবন থেকে পালিয়ে যেতে চান না। বরং সাহিত্য পড়ে নিজেদের জীবনকে আবার অনুভব করতে চান। তারা এমন সৌন্দর্য চান, যার মধ্যে একটু কষ্ট আছে।
আমার মনে হয়, আমাদের সময়ে বড় সাহিত্য কমে গেছে। কিন্তু পাঠকের বড় সাহিত্যের প্রয়োজন আছে। ওষুধ হিসেবে নয়, কোনো মিথ্যা সান্ত্বনা হিসেবেও নয়। বরং কখনো কখনো তাদের এমন একজনের প্রয়োজন হয়, যে বলে—এই পৃথিবীর জন্য কোনো সহজ নিরাময় নেই।
প্রশ্ন: আপনার লেখায় জায়গার পরিচয় এত স্পষ্ট কেন? নির্দিষ্ট স্থান বলা আপনার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
ক্রাসনাহোরকাই: কারণ কোনো কিছু কোথায় আছে, তা জানা সব সময় গুরুত্বপূর্ণ। আর কোনো জিনিস যেখানে আছে, সঠিকভাবে বলতে গেলে সেখানেই তার থাকা সম্ভব।
প্রশ্ন: Sátántangó লেখার সময়ের পৃথিবী আর ২০১৩ সালের পৃথিবীর মধ্যে কতটা মিল আছে?
ক্রাসনাহোরকাই: মিলটা আশ্চর্য রকমের বেশি।
দেখতে মনে হয় সবকিছু বদলে গেছে। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়, মূল ব্যাপারটি একই আছে।
একটি দ্রুত বয়ে যাওয়া স্রোতের কথা ভাবুন। পানির ফেনার মধ্যে একটি ছোট বুদ্বুদ ঘুরছে। সেটি ভেঙে ছোট ছোট ফোঁটায় পরিণত হচ্ছে, আবার একসঙ্গে মিলছে, তারপর নতুন স্রোতের সঙ্গে চলে যাচ্ছে।
আমি সেই ফোঁটাগুলোর দিকে তাকিয়ে একটি ফোঁটাকে আলাদা করে দেখতে চাই। কিন্তু তা সম্ভব নয়। আসলে আলাদা কোনো ফোঁটা নেই। আছে পুরো স্রোত—যা প্রতি মুহূর্তে বদলাচ্ছে, আবার একই রকমও থাকছে।
আবার পুরো স্রোতকেও এক মুহূর্তে ধরে রাখা যায় না। অংশও নেই, সমগ্রও যেন নেই।
তাহলে কী আছে?
আছে এমন এক স্থিরতা, যা প্রতিমুহূর্তে বদলে যাচ্ছে।
আর সেটিই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রহস্য—সবকিছু বদলায়, অথচ গভীরে কোথাও যেন একই থেকে যায়।
(সাহিত্য শুধু একটি ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি দেশের গল্প, একটি লেখকের চিন্তা কিংবা একটি ভাষার নিজস্ব সুর যখন অন্য ভাষার পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়, তখন তার পেছনে থাকেন একজন অনুবাদক। তিনি শুধু শব্দের অর্থ বদলে দেন না; তিনি একটি ভাষার ভেতরের ছন্দ, অনুভূতি, নীরবতা ও কণ্ঠস্বরকে অন্য ভাষায় নতুন করে বাঁচিয়ে তোলেন। হাঙ্গেরীয় সাহিত্যকে ইংরেজি ভাষার পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কবি ও অনুবাদক জর্জ সিজার্তেস এমনই একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। জর্জ সিজার্তেসের নিজের জীবনও যেন এক উপন্যাস। তিনি বুদাপেস্টে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৬ সালের হাঙ্গেরীয় বিপ্লবের পর ছোটবেলায় শরণার্থী হিসেবে ইংল্যান্ডে চলে আসেন। পরে তিনি ব্রিটিশ সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি ও অনুবাদক হয়ে ওঠেন। ২০২৪ সালে কবিতার জন্য তিনি হিজ ম্যাজেস্টিজ গোল্ড মেডাল লাভ করেন। তার কবিতার বইয়ের সংখ্যা অনেক। ২০০৪ সালে ‘রিল’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি টি. এস. এলিয়ট পুরস্কারও পান। কবি হিসেবে তার পরিচয়ের পাশাপাশি অনুবাদক হিসেবেও তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের কঠিন, দীর্ঘ এবং গভীর গদ্যকে ইংরেজিতে রূপ দেওয়ার কাজ তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও পরিচিত করে। ‘দ্য মেলানকোলি অব রেজিটেন্স’ ছিল ক্রাসনাহোরকাইয়ের প্রথম উপন্যাস, বইটি জর্জ সিজার্তেস অনুবাদ করেন। পরে তিনি ‘সাতানটাঙ্কো’-সহ আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন।)


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









