হাঙ্গেরীয় লেখকের চোখে এক কবি, এক বন্ধু এবং এক খোলা দরজার মানুষ
হাঙ্গেরীয় লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের সঙ্গে মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের বন্ধুত্ব ছিল গভীর। নিউইয়র্কে থাকার সময় গিন্সবার্গ শুধু তাকে আশ্রয় দেননি, তার উপন্যাস ‘ওয়ার এন্ড ওয়ার’ লেখার পদ্ধতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ক্রাসনাহোরকাই স্মরণ করেছেন সেই দিনগুলোর কথা—গিন্সবার্গের ছোট্ট বাড়ি, রাতভর সাহিত্য নিয়ে আলোচনা এবং মানুষের প্রতি তার সহজ উদারতা।
প্রশ্ন: অ্যালেন গিন্সবার্গের সঙ্গে আপনার পরিচয় কীভাবে?
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই: নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এক বন্ধুর মাধ্যমে তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তার মৃত্যুর কয়েক বছর আগে আমরা কাছাকাছি এসেছিলাম। খুব সহজেই তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত খোলামেলা ও প্রাণবন্ত মানুষ।
তিনি আমাকে বলেছিলেন, নিউইয়র্কে গেলে তার বাড়িতে থাকতে পারি। কথাটি এমনভাবে বলেছিলেন, যেন এটি খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। শুধু আমাকে নয়, তিনি অনেক মানুষকেই এমন কথা বলতেন।

প্রশ্ন: তার বাড়িটি কেমন ছিল?
ক্রাসনাহোরকাই: খুব ছোট। ছোট ছোট ঘর, একটি রান্নাঘর। খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তার রান্নাঘরের আলমারির রং ছিল অদ্ভুত সবুজ। আমি মজা করে তাঁকে বলেছিলাম, নিউইয়র্কে এমন রংয়ের আলমারি কোথায় পেলেন? তিনি বললেন, পোলিশদের কাছ থেকে পুরোনো জিনিসের বাজারে কিনেছেন।
গিন্সবার্গ সারা জীবন খুব সাধারণভাবে থাকতেন। কিন্তু তার দরজা সব সময় খোলা থাকত। মানুষ আসত, যেত। তার বাড়িতে থাকলে তার অনেক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। বিট প্রজন্মের কবি-শিল্পী এবং নিউইয়র্কের সাংস্কৃতিক জগতের অনেক পরিচিত মানুষ সেখানে আসতেন।
প্রশ্ন: ‘ওয়ার এন্ড ওয়ার’ লেখার সময় তিনি আপনাকে কীভাবে সাহায্য করেছিলেন?
ক্রাসনাহোরকাই: উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র খুবই অদ্ভুত। তাকে এমন একটি পরিবেশে দেখাতে চেয়েছিলাম, যা একেবারে নিরপেক্ষ। কিন্তু নিউইয়র্ক মোটেও নিরপেক্ষ শহর নয়। বিশেষ করে আমি যখন প্রথম সেখানে যাই, শহরটি আমার কাছে ছিল অত্যন্ত জীবন্ত, রঙিন ও ব্যস্ত।
আমি গিন্সবার্গকে বললাম, কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করব বুঝতে পারছি না।
তিনি আমার সঙ্গে অনেক রাত ধরে এ বিষয়ে কথা বললেন। শেষ পর্যন্ত তার পরামর্শ থেকেই আমি সমাধান পেলাম।
তিনি বললেন, পুরো পটভূমি নিয়ে চিন্তা না করে একটি ছোট জায়গা বা নির্দিষ্ট বিষয়ের দিকে মনোযোগ দাও। সেটিকে ভালোভাবে দেখাও। তখন বাকি সবকিছু আপনাআপনি ঠিক জায়গায় চলে আসবে।
এই পরামর্শ আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি তার কাছে এ জন্য গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।
প্রশ্ন: শুধু লেখালেখি নিয়েই কি আপনাদের আলোচনা হতো?
ক্রাসনাহোরকাই: না, অনেক বিষয় নিয়ে কথা হতো। সাহিত্য কীভাবে লেখা যায়, কোনো অনুভূতিকে কীভাবে লেখায় আনা যায়, ব্যক্তিগত আবেগকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়—এসব নিয়ে আমরা দীর্ঘ আলোচনা করতাম।
তিনি ছিলেন খুব জ্ঞানী। তার সঙ্গে কথা বললে মনে হতো, তিনি শুধু উত্তর দিচ্ছেন না; বরং আমাকে নিজের উত্তর খুঁজে নিতে সাহায্য করছেন।
প্রশ্ন: তার জীবনের শেষ সময়ের কোনো স্মৃতি কি বিশেষভাবে মনে পড়ে?
ক্রাসনাহোরকাই: একটি ঘটনা খুব মনে পড়ে। একবার ডেভিড বর্ন একটি নতুন ভারতীয় সংগীতদলকে গিন্সবার্গের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে তাঁর বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। আমরা সবাই সেই ছোট রান্নাঘরে বসেছিলাম।
পরে আমরা একসঙ্গে কিছু সংগীত করলাম। গিন্সবার্গ হারমোনিয়াম বাজালেন, তিনি গান গাইলেন, ডেভিড টেবিলে তাল দিলেন। কিছুক্ষণ পর অতিথিরা চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন।
তখন গিন্সবার্গ টেবিলের নিচে রাখা একটি টেপ রেকর্ডার বের করলেন। তিনি পুরো কথোপকথনটি রেকর্ড করেছিলেন। সেই ক্যাসেটটি তিনি অতিথিদের উপহার দিলেন।
তিনি জানতেন, তাদের সঙ্গে কাটানো সেই সময়টিকে ধরে রাখাই হয়তো তাদের জন্য সবচেয়ে সুন্দর উপহার।
প্রশ্ন: আপনার কাছে অ্যালেন গিন্সবার্গ কেমন মানুষ ছিলেন?
ক্রাসনাহোরকাই: তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি নিজের জীবনের শেষ সময়েও দিয়ে গেছেন—কখনো কয়েকটি জ্ঞানী কথা, কখনো পরামর্শ, কখনো একটি স্মৃতি।
তাঁর দরজা সব সময় খোলা ছিল। তার ঘর ছিল ছোট, জীবন ছিল সাধারণ, কিন্তু তার হৃদয়ের জায়গা ছিল অনেক বড়।
সেই ছিল আমার পরিচিত অ্যালেন গিন্সবার্গ—একজন কবি, একজন বন্ধু এবং এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের স্মৃতিও অন্যের জন্য উপহার করে যেতে জানতেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









