‘কাফকা পড়েছ?’ মিলান কুন্দেরা আমাকে জিজ্ঞেস করেন।
‘অবশ্যই,’ আমি বলি। ‘আমার কাছে তিনি বিশ শতকের সবচেয়ে জরুরি লেখক।’
কুন্দেরা একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হাসেন। ‘জার্মান ভাষায় পড়েছ?’ ‘না।’ ‘তাহলে কাফকা পড়নি।’
কুন্দেরার কথায় যুক্তি আছে। কাফকার জার্মান ভাষার যে অনুবাদ-অযোগ্য উৎকর্ষ, তার সামনে অন্য ভাষার অনুবাদ কতটা টিকে থাকে, সে নিয়ে সংশয় স্বাভাবিক। তবু স্প্যানিশ ভাষার ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। মিগেল সায়েন্সের অনুবাদ—‘ফ্রানৎস কাফকা, ওব্রাস কমপ্লেতাস’—এতটাই অসাধারণ যে আমার বন্ধু মিলান কুন্দেরার আপত্তিও হয়তো এখানে খুব একটা কাজে আসবে না।
কাফকা—ভয়াবহ বিশ শতকের মৌলিক লেখক। তাকে ছাড়া আমরা যে সময়ের মধ্যে বাস করি, তাকে সম্পূর্ণ বোঝা সম্ভব নয়। পিয়েত্রো চিতাতি নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সাহস নিয়ে এমন একটি কথা ভাবার ঝুঁকি নিয়েছেন, যা প্রথমে প্রায় অসম্ভব মনে হয়: ‘দ্য ট্রায়াল’-এর যোসেফ কে. আসলে অপরাধী। অর্থাৎ যে মানুষটিকে আমরা এত দিন নিপীড়িত, নির্দোষ এবং ব্যবস্থার শিকার বলে দেখে এসেছি, সম্ভবত অপরাধের দায় তারও আছে। চিতাতি কাফকার জীবনের নানা স্তরকে উপেক্ষা করেন না—পিতার সঙ্গে তার সম্পর্ক, ইহুদি পরিচয়, নিজের শহর প্রাগের মধ্যবিত্ত পেশাজীবী সমাজ, সেই ‘নখওয়ালা ছোট মা’—যে শহর জন্ম দিয়েছে এবং একই সঙ্গে বন্দীও করে রেখেছে।
সব হিসাব শেষে, চিতাতি বলেন, গ্রেগর সামসা হয়তো স্বাধীন এক পোকা হওয়ার চেয়ে বলি দেওয়া পুত্র হয়েই থাকতে চায়। সে যেন ইসহাক। কিন্তু ‘দ্য মেটামরফোসিস’-এ তার বলি দেওয়ার মুহূর্তে ঈশ্বরের দূত এসে তাকে রক্ষা করে না।
মেক্সিকান লেখক সেয়াস্তিয়েল আলাত্রিস্তের উপন্যাস ‘এল দানিও’—‘দ্য ড্যামেজ’—এ আমরা আরেক কাফকাকে পাই। এখানে কাফকা তার মায়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মা নিজের সংগীতের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করেন ছেলের সাহিত্যিক প্রতিভার জন্য। প্রথমে চিতাতির বক্তব্য—নিপীড়িত মানুষটিই হয়তো অপরাধী—বিস্ময়কর, এমনকি কেলেঙ্কারিপূর্ণও মনে হতে পারে। কিন্তু তিনি যখন আমাদের বুঝতে বাধ্য করেন যে ক্ষমতা আসলে একটি সম্ভাবনা, একটি ভার্চুয়াল শক্তি, তখন কথাটির আশ্চর্য স্পষ্টতা পায়।
ক্ষমতার শিকার ব্যক্তি এমন এক শক্তি প্রয়োগ করেন, যা তার না থাকলে হয়তো ক্ষমতারও থাকত না। আমরাই সম্রাটকে তার অদৃশ্য পোশাক পরিয়ে দিই। আমরাই ক্ষমতার ভূতকে ক্ষমতার দেহে পরিণত করি। কাফকা আসলে দেখান—বাস্তব ক্ষমতা আর ক্ষমতার মিথের মধ্যে যে বিপুল অসাম্য, সেটাই আমাদের জীবনের অন্যতম গভীর সত্য।
ক্ষমতা যদি নিজের কল্পনাকে বাস্তব করে তুলতে পারে, তাহলে সংস্কৃতি কীভাবে নিজের বাস্তবতাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে? শুধু ব্যক্তিসত্তা কি যথেষ্ট? চিলির দার্শনিক মার্তিন ওপেনহাইন-এর মতে, কাফকার ডায়েরি তাঁর উপন্যাসগুলোকে এমন এক অন্তর্জাগতিক প্রতিধ্বনি দিয়েছে, যা অন্যথায় সেগুলোতে থাকত না। কাফকার কথাসাহিত্যে যেন সরাসরি কোনো অন্তর্জগৎ নেই। অন্যদিকে ডায়েরিগুলো বাইরের আবেগ ও ঘটনার দিকে তাকানো এক অন্তর্গত আহ্বান। এই দুইয়ের সম্পর্ক অস্বস্তিকর, কিন্তু গভীর। কাফকার উপন্যাসের চরিত্রগুলো যুক্তির নায়ক হতে চায়। অথচ যুক্তির কারণেই তারা প্রান্তিক হয়ে পড়ে। যে ‘যুক্তি’ তাদের বাদ দেয়, সেই যুক্তির কারণ তারা বুঝতে পারে না।
তাদের যুক্তিবাদ শেষ পর্যন্ত এমন এক ব্যবস্থার মধ্যে নিজেদের হারিয়ে ফেলা, যেখানে সবকিছু একরকম, আলাদা হওয়ার কোনো জায়গা নেই। সামাজিক সম্পর্ককে যে আনুষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করে, তারা সেখানে নিজেদের বাইরের মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করে। এটাই কাফকার অসাধারণ নির্মাণ। ব্যক্তি আর ক্ষমতার সম্পর্ককে এমন স্বচ্ছ, এমন অস্বস্তিকর, এমন আধুনিকভাবে আর কে লিখেছেন?
গত একশ বছরে সম্ভবত খুব কম লেখকই। ওপেনহাইন বলেন, কাফকার জগতে ব্যক্তি এক ধরনের পরজীবী—সে পরজীবী হতে চায় না, অথচ নিজের অজান্তেই এমন এক পৃথিবীকে উন্মোচিত করে, যেখানে ক্ষমতার প্রয়োগের জন্য পরজীবীর প্রয়োজন। কাফকার ‘নায়ক’ শুধু চায় ক্ষমতা তাকে গ্রহণ করুক। কিন্তু ক্ষমতার কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে গিয়ে সে অজান্তেই ক্ষমতার মুখোশে আঁচড় কাটে। তার বুদ্ধি নয়, বরং তার অক্ষমতাই ক্ষমতার স্বেচ্ছাচারী ভিত্তিকে দৃশ্যমান করে। কাফকার জগতে সম্রাটের পোশাক খুলে দেয় কোনো সাহসী সমালোচক নয়। ক্ষমতার অধীন মানুষেরা ক্ষমতার ব্যবস্থার কৌশল বুঝতে না পারার মধ্য দিয়েই তার নগ্নতা প্রকাশ করে।
কাফকার সাহিত্যিক ক্ষমতার রহস্য শেষ পর্যন্ত একটি জায়গায় এসে দাঁড়ায় আর তা হল, তিনি এমন এক ক্ষমতার কল্পকাহিনি নির্মাণ করেন, যা নিজের কল্পনাকেই বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। ‘দ্য ট্রায়াল’ এবং ‘দ্য ক্যাসল’—দুই উপন্যাসেই ক্ষমতার কাঠামোর ভেতর একটি শূন্যতা আছে। কিন্তু সেই শূন্যতাই নিজেকে সম্পূর্ণ, পূর্ণ এবং অখণ্ড বলে উপস্থিত করে।
আমরা জানি, ক্ষমতার কাঠামোটি একটি মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তবু সেই মিথ্যাকে অভিনীত হতে দেখে আমরা আতঙ্কিত হই। কারণ মিথ্যাটি কেবল বলা হচ্ছে না—তার জন্য তৈরি হয়েছে প্রতিষ্ঠান, নিয়ম, দপ্তর, মানুষ, দরজা, সিলমোহর, অপেক্ষা। কাফকার জগতে ক্ষমতা তার শক্তি প্রয়োগ করে প্রায় সম্পূর্ণ ভার্চুয়াল অবস্থায়। ‘দ্য ক্যাসল’-এর কর্তৃপক্ষ কখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয় না। তারা টিকে থাকে সম্ভাবনা হিসেবে। ফলে ক্ষমতার শিকার—যোসেফ কে. কিংবা ভূমি জরিপকারী কে.—ক্ষমতার যে শূন্যতা অনুভব করে, তার সমানুপাতিক এক বিশাল ক্ষমতার কাঠামো নিজের কল্পনায় নির্মাণ করে নেয়। ক্ষমতার শাসনের সবচেয়ে শক্তিশালী নিয়মই হলো—কখন, কীভাবে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ হবে, তা না জানা।
১৯২৪ সালে কাফকা মারা যান। তিনি জানতেন না, দশ বছর পর তার নরকীয় ক্ষমতার কল্পনা ইতিহাসের বাস্তব ক্ষমতায় পরিণত হবে। রাতে তারা আসত। কোনো ব্যাখ্যা নেই। কোনো কারণ নেই। কোনো ক্ষমা নেই। গেস্টাপো এবং এনকেভিডি যখন তাদের শিকারদের গ্রেপ্তার করতে রাতের অন্ধকারে দরজায় হাজির হতো, তখন তারা যেন কাফকারই কল্পনার চরিত্র হয়ে উঠত। ১৯৩৭ সালে মিনস্কে কমরেড কমিশার আই. ভি. কোভালেভ দায়িত্ব নিতে গিয়ে যে অফিসে ঢুকেছিলেন, সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল এক কাফকাসুলভ দৃশ্য। অফিস পুরোপুরি খালি। কারণ তার পূর্বসূরি এবং অধীনস্থ সবাইকে স্ট্যালিনের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে হত্যা করা হয়েছে। ভাগ্যের নির্মম রসিকতা হলো, কোভালেভ যে ডেস্কে বসলেন, সেটিই ছিল পরবর্তী শিকারের ডেস্ক। অর্থাৎ তার নিজের।
স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় ‘ইজভেস্তিয়া’-র সংবাদদাতা মিখাইল কোলৎসভও এক ভয়ংকর কাফকাসুলভ কথা বলেছিলেন।স্ট্যালিন যদি তাকে বিশ্বাসঘাতক ঘোষণা করেন, তবে তিনি তা বিশ্বাস করবেন—যদিও অভিযোগটি মিথ্যা হয়। শেষ পর্যন্ত কোলৎসভ গ্রেপ্তার হলেন এবং মৃত্যুদণ্ড পেলেন। গোপন পুলিশকে যে সংখ্যক গ্রেপ্তার করতে বলা হয়েছিল, সেই সংখ্যার অংশ হিসেবেই। অথচ যারা তাকে গ্রেপ্তার করেছিল, তারা জানত—স্ট্যালিনের উন্মত্ততার পরবর্তী শিকার হয়তো তারাই।
তবু কাফকা কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক নন। তিনি একজন লেখক। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক ইতিহাসের বাইরে ব্যক্তিগত ইতিহাস ও কল্পনার জগতে সন্দেহ, অন্ধত্ব, দ্বিধা এবং নীরব বীরত্বের সম্পূর্ণ নাটক কখনো কখনো একটি ঘরেই অভিনীত হতে পারে।
একটি অফিসে। একটি বিছানায়। ক্ষমতার বিশাল যন্ত্রের পাশে মানুষের এই ক্ষুদ্র স্থানটিই কাফকার আসল মঞ্চ। ‘দ্য মেটামরফোসিস’-এ গ্রেগর সামসা পোকায় পরিণত হয়। সে শুধু বাবার কাছ থেকে পালাতে চায় না। সে পালাতে চায় তার ম্যানেজার, ব্যবসা, অফিস এবং আমলাতন্ত্র থেকেও। ফেলিক্স গুয়াতারি ও জিল দেল্যুজ তাঁদের ‘কাফকা: টুওয়ার্ড আ মাইনর লিটারেচার’ গ্রন্থে এই দিকটির ওপর জোর দিয়েছেন। ওপেনহাইন খুব সূক্ষ্মভাবে লক্ষ করেন, পোকায় পরিণত হওয়ার পরও সামসা পুরোপুরি পোকা হয়ে যায় না। সে চিন্তা করতে থাকে। তার চেতনা শরীরকে একদিকে পর্দা হিসেবে ব্যবহার করে, অন্যদিকে সেই শরীরের মধ্যেই নিজেকে বন্দী রাখে। এখানে যদি কোনো বিদ্রূপ থাকে, তার কারণও স্পষ্ট।বিদ্রূপের প্রকৃত স্বভাবই হলো আমাদের পরিচিত প্রেক্ষাপট থেকে সরিয়ে দেওয়া, আমাদের আর পৃথিবীর মধ্যে একটি ফাটল তৈরি করা। আর সেই শূন্যতাই তখন আমাদের সঙ্গে পৃথিবীর সংযোগস্থল হয়ে ওঠে। এই অর্থে, ওপেনহাইনের সুন্দর সিদ্ধান্তটি হলো—বিদ্রূপ নিজেই এক ধরনের রূপান্তর।
আইন উন্মাদ। কিন্তু তবু সেটাই আইন। আর কর্তব্যের শেষ না হওয়া তালিকাই সামসা, যোসেফ কে. এবং ভূমি জরিপকারীকে তাদের কর্তব্য পালন করতে বাধা দেয়। এই কারণেই তাদের শাস্তি পেতে হবে। কাফকা যদি বিশ শতকে ক্ষমতার হাতে তৈরি ভয়াবহতার একটি মুখ এঁকে দিয়ে থাকেন, তবে একুশ শতকের ক্ষমতারও তিনি হয়তো একজন ভবিষ্যদ্রষ্টা। হিটলারের আউশভিৎসে, স্ট্যালিনের গুলাগে ক্ষমতা দৃশ্যমান হয়েছিল—বরং অতিরিক্ত দৃশ্যমান। সেখানে ক্ষমতার মুখ ছিল কারাগার, কাঁটাতার, ইউনিফর্ম, বন্দুক, শিবির, মৃতদেহ। আজ ক্ষমতা শিখেছে অদৃশ্য হতে। আর আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সে নির্ভর করছে একটি সহজ সত্যের ওপর তা হল ক্ষমতার সবচেয়ে বড় সহযোগী হয়তো ক্ষমতাবান নিজে নয়। ক্ষমতার শিকার মানুষটি। কারণ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার সবচেয়ে নিখুঁত সাফল্য তখনই ঘটে, যখন তার শিকার নিজেই ক্ষমতাকে সেই সমস্ত ক্ষমতা দিয়ে দেয়, যা ক্ষমতার নিজের কখনো ছিল না।
কার্লোস ফুয়েন্তেসের ‘আই বিলিভ: অ্যান এ টু জি অব আ লাইফ’ আত্মজীবনীকে প্রচলিত অর্থে সাজানো কোনো বই নয়। এটি বরং একটি জীবনের বর্ণমালা—এ থেকে জেড—যেখানে স্মৃতি, সাহিত্য, রাজনীতি, প্রেম, ইতিহাস, ভ্রমণ ও মৃত্যুচিন্তা একে অন্যের পাশে এসে দাঁড়ায়। মেক্সিকোর অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক ফুয়েন্তেস এখানে নিজের জীবনকে সরল কালানুক্রমে বলেননি; বরং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ধারণাগুলোর মধ্য দিয়ে নিজেকে ফিরে দেখেছেন। বইটির আকর্ষণ তার স্মৃতির চেয়েও বেশি তার চিন্তার ভঙ্গিতে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে তিনি পৌঁছে যান মেক্সিকোর ইতিহাসে, লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক বাস্তবতায়, ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে এবং বিশ্বসাহিত্যের বিস্তৃত ভূগোলে। বইটি ফুয়েন্তেসের জীবনকথা নয়। এটি একজন লেখক কীভাবে পৃথিবীকে দেখেন, এবং নিজের জীবনকে সেই পৃথিবীর ভেতর থেকে কীভাবে বোঝেন—তার এক অন্তরঙ্গ, বুদ্ধিদীপ্ত ও সাহিত্যিক দলিল। উপরের লেখাটি কার্লোস ফুয়েন্তেসের ‘আই বিলিভ: অ্যান এ টু জি অব আ লাইফ’ বইয়ের ‘কাফকা’ শিরোনামের ভাষান্তর।
দৈনিক এদিন অনলাইন ‘লেটার্স টু ফেলিস বাই ফ্রান্ৎস কাফকা’ বই থেকে ধারাবাহিকভাবে তার চিঠিগুলো বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য প্রকাশ করছে। পাঠক আসনু আমরা কাফকার চিঠির আজকের চিঠিগুলোর মধ্য দিয়ে তার জগতে প্রবেশ করি।

৮ নভেম্বর ১৯১২
প্রিয় ফ্রয়লাইন ফেলিসে,
আপনার আগের চিঠির ঠিক আগের চিঠিটি আমাকে বিভ্রান্ত করেছিল। আপনি যেমন বলেছিলেন, তেমন শুধু আপনার ‘শেষ চিঠিগুলো’ নয়—সত্যিই আমাকে বিভ্রান্ত করেছিল। কিন্তু তখনও বুঝিনি বিষয়টি কতটা গুরুতর ছিল। আপনার সর্বশেষ চিঠি আমাকে সেটি বুঝিয়েছে।
আমি কি সত্যিই নিজের সম্পর্কে এতটা অনিশ্চিত? আমার গোপন অধৈর্য, আমার কোনোদিন শেষ না হওয়া অসন্তোষ—কলমের প্রতিটি আঁচড়ে কি তারা কেঁপে ওঠে? আর আমাকে কি শেষ পর্যন্ত আমার নিজের চিঠির কাছ থেকেই জানতে হবে আমি কী বলতে চেয়েছি? আমার চারপাশের সবকিছু কত নিরানন্দ। আর আমি সমস্ত শক্তি দিয়ে আপনাকেও সেই নিরানন্দের মধ্যে টেনে আনতে চাইছি। আমি জানি না, আমার জীবন সম্পর্কে আপনার মনে এমন কোনো সম্পূর্ণ ছবি আছে কি না, যার সাহায্যে আপনি আমার এই অদ্ভুত সংবেদনশীলতা, এই সর্বদা প্রস্তুত থাকা বিরক্তি বুঝতে পারেন। কিন্তু একবার সেটিকে মুক্ত করে দিলে সেটি আমাকে পেছনে ফেলে যায়—একটি পাথরের মতো ভারী, নিস্তেজ, অসহায়। আপনার চিঠিটি আমি অন্তত বিশবার পড়েছি। আসার পরপরই কয়েকবার। টাইপরাইটারের সামনে বসে কয়েকবার। একজন খদ্দের আমার টেবিলের সামনে বসে থাকা অবস্থায়ও আমি সেটি এমনভাবে পড়েছি যেন মাত্র তখনই হাতে পেয়েছি। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে পড়েছি। এখন আবার বাড়িতে বসে পড়ছি।
তবু জানি না কী করা উচিত। শুধু জানি, আমি কিছু করতে পারছি না। আপনার কাছে থাকলে হয়তো চুপ করে থাকতাম। কিন্তু আমরা আলাদা জায়গায় আছি বলে আমাকে লিখতেই হচ্ছে। না হলে দুঃখে আমি মরে যাব। কে জানে, আপনার হাতের স্পর্শ আমার আপনার চেয়ে বেশি প্রয়োজন কি না। যে হাত সান্ত্বনা দেয়, সে হাত নয়—যে হাত শক্তি দেয়, সেই হাত। গতকাল ক্লান্তি এত গভীর হয়েছিল যে মনে হচ্ছিল, আর বেঁচে থাকার প্রয়োজন নেই। অনেকক্ষণ দ্বিধা করার পর রাতে লেখালেখি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। তারপর দু ঘণ্টা রাস্তায় হাঁটলাম। যখন ঘরে ফিরলাম, পকেটের ভেতর আমার হাত দুটো প্রায় জমে গিয়েছিল। তারপর প্রায় ছয় ঘণ্টা গভীর ঘুম। একটি স্বপ্নের খুব অস্পষ্ট স্মৃতি আছে—আপনি ছিলেন সেখানে, আর ছিল কোনো একটি দুঃখজনক ঘটনা। এই প্রথম আপনাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখলাম এবং তা মনে রইল। আশ্চর্য, রাতের মধ্যে একবারই ঘুম ভেঙেছিল, তাও এই স্বপ্নের কারণে।
সকালে আমাকে স্বাভাবিক সময়ের আগেই জাগানো হলো। আমাদের গভর্নেস ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকে পড়লেন। আধঘুমের মধ্যে তাঁর চিৎকারটি আমার কাছে সত্যিকারের মাতৃসুলভ আর্তনাদের মতো শোনাল। তিনি জানালেন, মধ্যরাতের কিছু পরে আমার বোন একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছে। আমি আরও কিছুক্ষণ বিছানায় পড়ে রইলাম। জরুরি অবস্থাতেও আমাকে জোর করে জাগানো যায় না। যে জিনিস আমাকে জাগায়, তা হলো প্রতিটি দরজার ওপাশে জমে থাকা সাধারণ কোলাহল।
আমি বোঝার চেষ্টা করছিলাম, এই জন্মের ঘটনায় গভর্নেসের এত আনন্দের কারণ কী। আমি তো ভাই ও মামা হয়েও সামান্য আনন্দ অনুভব করছিলাম না। শুধু ঈর্ষা। তীব্র ঈর্ষা। আমার বোনের প্রতি নয়—বরং আমার ভগ্নিপতির প্রতি। কারণ আমার কোনোদিন সন্তান হবে না। এই কথাটি এখন প্রায় নিশ্চিত; এমনকি আরও বড় একটি দুর্ভাগ্যের চেয়েও নিশ্চিত, যার কথা অকারণে এখানে বলব না। এই হলো আমার ভালো ঘুমের পরের প্রফুল্লতা, আর অযথা সাবধানতার কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়া একটি সন্ধ্যার ফল।
প্রিয় ফ্রয়লাইন ফেলিসে,
আপনার,
ফ্রানৎস কে.
-----------------------------
৯ নভেম্বর ১৯১২
প্রিয় ফ্রয়লাইন ফেলিসে,
এখন রাত সাড়ে বারোটা। লেখার কাগজ নিতে পারছি না। কাগজগুলো পাশের ঘরে, আর সেখানে আমার বোন ঘুমাচ্ছে। আমাদের ঘরের অবস্থাও এখন কিছুটা বিশৃঙ্খল। আমার ভাগনে—অর্থাৎ তার বোনের জন্মের কারণে—আমাদের সঙ্গে আছে। তাই এই প্রুফের পেছনেই লিখছি। এতে অন্তত আমার ছোট বইটির ছাপার অক্ষরও আপনি দেখতে পাবেন। এখন শুনুন, প্রিয় ফ্রয়লাইন—রাতের নীরবতায় আমার কথাগুলো যেন একটু পরিষ্কার হয়ে আসে। আজ বিকেলের চিঠিটিকে আমরা চিঠি হিসেবে ভুলে যাই। তাকে বরং একটি সতর্কবার্তা হিসেবে মনে রাখি। অবশ্য ভালো ইচ্ছা নিয়ে। আজ বিকেলে আপনাকে চিঠিটি শেষ করার পর যে আতঙ্ক আমাকে গ্রাস করেছিল, তা আমি কখনো ভুলব না। যদিও চিঠিটি লেখার সময়ও সবকিছু ভালো ছিল না। আমি এমনই হয়ে যাই যখন নিজের কিছু লিখি না। অবশ্য এটিই একমাত্র কারণ নয়। যখন আমি শুধু নিজের জন্য বাঁচি, কিংবা তাদের জন্য যারা আমার প্রতি উদাসীন, পরিচিত অথচ দূরের, অথবা কেবল উপস্থিত—তখন নিজের অক্ষমতা সম্পর্কে আমি এতটা সচেতন থাকি না। তাদের উদাসীনতা, পরিচিতি কিংবা শুধু শক্তিশালী জীবন্ত উপস্থিতিই আমার অক্ষমতার ক্ষতিপূরণ করে।
কিন্তু যখন আমি কারও কাছে যেতে চাই, যখন সম্পূর্ণভাবে নিজেকে সমর্পণ করতে চাই, তখন আমার দুর্দশা নিশ্চিত। তখন আমি কিছুই নই। আর কিছুই না-থাকা মানুষটি কী করতে পারে? আজ সকালে আপনার চিঠিটি—যা বিকেলে এসে অন্য অর্থ ধারণ করেছিল—ঠিক সেই মুহূর্তেই এসেছিল যখন আমার ওই কথাগুলোর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বুঝতে পারছি, আমি এখনও সুস্থ হয়ে উঠিনি। আমার লেখাও যথেষ্ট পরিষ্কার নয়। এমনকি এই চিঠিটিও আপনার ভর্ৎসনার যোগ্য। তাই এবার ঘুমের ওপর ভরসা করি। আর দেবতাদের ওপর। এই ছাপার অক্ষরগুলো আপনার কেমন লাগছে? অবশ্য কাগজটি এমন হবে না। অক্ষরগুলো বোধ হয় একটু বেশি সচেতনভাবে সুন্দর। আমার ছোটখাটো মিথ্যাগুলোর জন্য এগুলো যেন নয়; বরং মূসার ফলকের জন্য বেশি উপযুক্ত।
কিন্তু এখন বইটি এভাবেই ছাপা হচ্ছে। বিদায়। আমার যতটা প্রাপ্য, তার চেয়েও বেশি মমতা আমার প্রয়োজন।
আপনার,
ফ্রানৎস কে.
---
৯ নভেম্বর ১৯১২
প্রিয় ফ্রয়লাইন ফেলিসে,
আপনি আর আমাকে লিখবেন না। আমিও আপনাকে লিখব না। আমি লিখলে আপনাকে অসুখী করব। আর আমার ব্যাপারে কিছু করার নেই। সারা রাত ঘড়ির ঘণ্টা গুনতে হয়নি এটি বুঝতে। আপনাকে প্রথম চিঠি লেখার আগেই আমি তা জানতাম।তারপরও যদি আপনাকে নিজের সঙ্গে বাঁধতে চাই, তবে আমাকে অভিশাপ দেওয়া উচিত—যদি আমি ইতিমধ্যেই অভিশপ্ত না হয়ে থাকি। আপনি যদি আপনার চিঠিগুলো ফেরত চান, অবশ্যই আমি পাঠিয়ে দেব। যদিও সেগুলো নিজের কাছে রাখতে আমার খুব ইচ্ছে করে। আপনি যদি সত্যিই সেগুলো চান, তবে একটি খালি পোস্টকার্ড পাঠাবেন। সেটিই আপনার সংকেত হবে। অন্যদিকে আমার চিঠিগুলো আপনি রেখে দেবেন—এই আমার অনুরোধ। এখন দ্রুত আমাকে ভুলে যান।আমি যে ভূত, তাকে ভুলে গিয়ে আগের মতো শান্তিতে, আনন্দে বেঁচে থাকুন।
---
১১ নভেম্বর ১৯১২
প্রিয় ফ্রয়লাইন ফেলিসে,
তাহলে শেষ পর্যন্ত আপনাকে হারাইনি। অথচ আমি নিশ্চিত ছিলাম, আপনাকে হারিয়েছি। আপনি আমার একটি চিঠিকে নিজের কাছে অপরিচিত বলে বর্ণনা করেছিলেন। সেই কথাটি আমাকে আতঙ্কিত করেছিল। আমি তার মধ্যে এমন এক সর্বনাশের অনিচ্ছাকৃত এবং তাই আরও নিশ্চিত প্রমাণ দেখতে পেয়েছিলাম, যে সর্বনাশ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে আমি ভেবেছিলাম হয়তো কিছুটা দূরে সরে এসেছি। কিন্তু শেষ আঘাতটি আবার আমাকে তার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। আমি নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। কী লিখব, বুঝতে পারছিলাম না। শনিবারের দুটি চিঠি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বানানো। শুধু একটি সত্য ছিল—আমার বিশ্বাস যে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। ঠিক তখনই, এই কথাটি লিখতে গিয়ে, আমার মা কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ঢুকলেন। তিনি দোকানে যাচ্ছিলেন। প্রতিদিন যান। গত ত্রিশ বছর ধরে সারাদিন দোকানেই থাকেন। তিনি আমাকে আদর করলেন। জানতে চাইলেন, আমার কী হয়েছে, আমি খাবার টেবিলে কথা বলি না কেন। আমি অনেক দিন ধরেই কথা বলি না। নিজেকে ধরে রাখার জন্য। আরও অনেক কিছু বললেন। বেচারা মা।
আমি তাকে খুব যুক্তিসঙ্গতভাবে সান্ত্বনা দিলাম। চুমু খেলাম। শেষে তাকে হাসাতেও পারলাম। চোখ তখনও পুরো শুকোয়নি, তবু তিনি আমাকে বেশ ভালো করে বকতে পারলেন—বিকেলের নাশতা না খাওয়ার জন্য। বহু বছর আগে যে অভ্যাসটি আমি তৈরি করেছি। আমি জানি তার এত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ কী। তিনি জানেন না যে আমি তা জানি—অথবা পরে জেনেছি। সে কথা অন্যদিন বলব। আবার আপনাকে বলার মতো এত কথা জমেছে যে কোথা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না। অথচ গত তিনটি দিনকে আমার মনে হচ্ছে এমন সব অশুভ সম্ভাবনার দূত, যেগুলো সবসময় আমাদের চারপাশে অপেক্ষা করে থাকে। আর কোনোদিন কর্মব্যস্ত, অস্থির দিনের মধ্যে আপনাকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ চিঠি লিখব না।আপনাকে এ বিষয়ে আমার সঙ্গে একমত হতেই হবে। রাগ করবেন না। আমাকে দোষও দেবেন না। কারণ এখন আমার এমন একটি অবস্থা হয়েছে—আপনি চান বা না চান—আমি আপনার পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে থাকতে চাই। নিজেকে এত সম্পূর্ণভাবে আপনার হাতে তুলে দিতে চাই যে আমার কোনো চিহ্ন, কোনো স্মৃতি, আর কারও জন্য অবশিষ্ট না থাকে।
কিন্তু সেই চিঠির মতো কোনো কথা আর কখনো শুনতে চাই না। সে কথাটি সত্যি ছিল কি না, তাও এখন আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই কারণেই এখন থেকে ছোট চিঠি লিখব। অবশ্য রবিবারে নিজেকে একটি দীর্ঘ চিঠির বিলাসিতা করার অনুমতি দেব। আর একটি কারণ আছে। আমি আমার উপন্যাসটির জন্য নিজের সমস্ত শক্তি রাখতে চাই। সেটি শেষ পর্যন্ত আপনারও। অথবা অন্তত হওয়া উচিত। আমার দীর্ঘতম চিঠিতেও আমি নিজের যে সামান্য ভালো দিকের ইঙ্গিত দিতে পারি, তার চেয়ে সেই বই হয়তো আপনাকে আমাকে অনেক পরিষ্কারভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।
উপন্যাসটির নাম আপাতত ‘যে মানুষটি অদৃশ্য হয়ে গেল’। ভয় হচ্ছে, এটি কোনোদিন শেষ হবে না। পুরো ঘটনাটি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে। এখন পর্যন্ত পাঁচটি অধ্যায় শেষ হয়েছে। ষষ্ঠটি প্রায় শেষ। অধ্যায়গুলোর নাম লিখে রাখছি—
প্রথম—‘স্টোকার’।
দ্বিতীয়—‘চাচা’।
তৃতীয়—‘নিউইয়র্কের কাছে একটি বাড়ি’।
চতুর্থ—‘রামেসেসের দিকে যাত্রা’।
পঞ্চম—‘হোটেল অক্সিডেন্টাল’।
ষষ্ঠ—‘রবিনসনের ঘটনা’।
আমি জানি, এই নামগুলো আপনাকে কিছুই বোঝাবে না। তবু এমনভাবে লিখে রাখলাম যেন তারা কোনো অর্থ বহন করে। হয়তো একদিন করবে। সেই দিন না আসা পর্যন্ত এগুলো আপনার কাছে নিরাপদে থাকুক। পনেরো বছর ধরে প্রায় নিরাশ হয়ে চেষ্টা করেছি। মাঝেমধ্যে সামান্য কিছু মুহূর্ত বাদ দিলে—এই প্রথম কোনো বড় কাজ নিয়ে গত ছয় সপ্তাহ ধরে আমার নিজের ওপর বিশ্বাস জন্মেছে। এটি শেষ করতেই হবে। আপনিও নিশ্চয়ই একমত হবেন। তাই আপনার কাছে লেখা সেই সংক্ষিপ্ত সময়গুলো—যে সময়গুলোতে আমি অস্পষ্ট, অসম্পূর্ণ, অসতর্ক, বিপজ্জনক চিঠি লিখি—এবার এই কাজটির কাছে সরিয়ে দিতে চাই। এখন পর্যন্ত আমার চারপাশের সবকিছু, যেখান থেকেই আসুক, এই কাজটির কাছে এসে শান্ত হয়েছে। যেন প্রত্যেকটি জিনিস নিজের সঠিক দিকে ফিরে গেছে। আপনি কি এতে সম্মত? আর এই সবকিছুর মধ্যেও যে ভয়ংকর নিঃসঙ্গতা আমাকে ঘিরে থাকে, তার হাতে আমাকে ছেড়ে দেবেন না তো?
প্রিয় ফ্রয়লাইন ফেলিসে, এই মুহূর্তে যদি আপনার চোখের দিকে তাকাতে পারতাম, তার জন্য আমি কী না দিতাম! রবিবার আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেব—সম্ভব সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তা দিয়ে। গতকাল কেন লিখিনি, সেই প্রশ্নটিরও। সেটি অবশ্য বেশ দীর্ঘ গল্প। আর চোখে ব্যথা হওয়ার কারণে যদি চক্ষুচিকিৎসকের কাছে না গিয়ে থাকি, তবে সেটি স্পষ্ট করে বলা উচিত ছিল। গত তিন দিন ধরে চলন্ত ট্রাম থেকে লাফ দেওয়ার আনন্দটুকুও নিজেকে থেকে সরিয়ে রেখেছি। ভয় হচ্ছিল, কোনো এক অদৃশ্য উপায়ে আপনি আমার এই সতর্কতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেবেন না। এখন যেহেতু আপনার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি পেয়েছি, আবার লাফ দিতে পারি। এই প্রসঙ্গে শনিবারের একটি ঘটনা মনে পড়ল। ম্যাক্সের সঙ্গে হাঁটছিলাম। বলছিলাম, নিজেকে ঠিক সুখী মানুষ বলে মনে হয় না। কোথায় যাচ্ছি, সেদিকে খুব একটা খেয়াল ছিল না। একটি ঘোড়ার গাড়ি প্রায় আমাকে চাপা দিয়েই ফেলেছিল। তখনও নিজের চিন্তায় ডুবে ছিলাম। হঠাৎ পা ঠুকলাম এবং অস্পষ্ট কিছু একটা বললাম। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার প্রবল রাগ হলো—গাড়িটি আমাকে চাপা দেয়নি বলে। স্বাভাবিকভাবেই গাড়োয়ান আমার কথার অর্থ অন্যভাবে বুঝেছিল। সে আমাকে গাল দিল। তার গাল দেওয়া সম্পূর্ণ ন্যায্য ছিল। না, আমি পুরোপুরি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকি না। এর প্রমাণ এই যে, আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে শব্দ কীভাবে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যায়—তার একটি বিবরণ আমি চিঠির সঙ্গে পাঠাচ্ছি। স্থানীয় একটি প্রাগের পত্রিকায় সেটি ছাপা হয়েছে। পরিবারের প্রতি এটি ছিল এক ধরনের মৃদু প্রকাশ্য তিরস্কার।
আর আমার সবচেয়ে ছোট বোন—বয়স কুড়ির সামান্য বেশি—প্রাগে আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। অন্য দুই বোনও সহানুভূতিশীল ও স্নেহশীল। শুধু আমার বাবা আর আমি—আমরা একে অপরকে খুব ভদ্রতার সঙ্গে ঘৃণা করি। আর একটি কথা বলেই শেষ করি। আপনি আমাকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করেছেন—যদিও সেটি শুধু একটি উদ্ধৃতির অংশ—তবু শব্দটি শুনতে কী আশ্চর্য ভালো লাগে। এখন দ্রুত বলুন তো, আপনার চিঠি অফিসে হাতে পাওয়ার পর এবং পড়ার সময় যেন পাগলের মতো আনন্দে কাঁপতে না থাকি, তার কোনো ওষুধ আছে কি? এমন কোনো উপায়, যাতে আমি চিঠিটি শান্তভাবে পড়তে পারি, তারপর কয়েক ঘণ্টার জন্য ভুলে গিয়ে নিজের কাজ করতে পারি—এবং শেষ পর্যন্ত যেন আমাকে অফিস থেকে বের করে না দেয়?
এটি নিশ্চয়ই সম্ভব। তাই না?
আপনার,
ফ্রানৎস


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









