সমুদ্রের একটি ঢেউ দুপুরবেলায় তাকে বালুর ওপর রেখে গেছে। সময়টি এমন, যখন সূর্যের নিচে প্রতিটি বালুকণা নিজের ক্ষুদ্র জ্যোতিতে জ্বলছে এবং দিগন্তের দিকে ফেনার অসংখ্য রেখা অদৃশ্য কোনো লেখকের হাতের মতো এগিয়ে যাচ্ছে। সেই বিপুল দৃশ্যের মধ্যে তারামাছটি প্রায় তুচ্ছ—একটি ছোট, নীরব, অচল বস্তু। অথচ সম্ভবত প্রকৃতির সবচেয়ে গভীর রহস্যগুলো এমন তুচ্ছ বস্তুতেই নিজেদের প্রকাশ করে।
অন্যমনস্ক চোখ তারামাছটিকে দেখবে, তারপর বালিয়াড়ি, তারপর দিগন্ত; কিন্তু যে চোখ কোনো অর্থের সন্ধান করে, সে হয়তো সেখানে থেমে যাবে। কারণ অসংখ্য রূপ, গতি ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে এই ছোট্ট প্রাণীটি একটি অসম্ভব কাজ সম্পন্ন করেছে— সে বহুকে এক করেছে। প্রকৃতির বিশৃঙ্খলা তার শরীরে এসে একটি জ্যামিতিক রূপ পেয়েছে।
এখানেই বিস্ময়ের শুরু।
তারামাছের প্রতিটি বাহু যেন একটি করে পথ। কিন্তু কোনোটিই শেষ পথ নয়। তার কেন্দ্র থেকে যতগুলো দিক বেরিয়ে গেছে, ততগুলো সম্ভাব্য পৃথিবী। তার শরীর একই সঙ্গে মানচিত্র এবং মানচিত্রের অনুপস্থিতি। এমন একটি কম্পাস, যার কাঁটা কোনো পরিচিত উত্তরের দিকে নির্দেশ করে না। বরং জানিয়ে দেয়—অজানা দিকও দিক, এবং অচেনা পথও পথ।
ত্রিশ বছর ধরে অক্টাভিও পাসের রচনাগুলো আমার কাছে এই তারামাছের মতো। তার মধ্যে আমি এমন এক প্রতীক দেখতে পাই, যা পৃথিবীতে মানুষের উপস্থিতির প্রশ্নটিকে নিজের মধ্যে ধারণ করে। এই প্রশ্নের কোনো চূড়ান্ত উত্তর নেই; সম্ভবত প্রশ্নটিই উত্তরটির সবচেয়ে বিশুদ্ধ রূপ।
পাস প্রথমত কবি। অর্থাৎ তিনি শব্দের কারিগর নন শুধু, সত্তার অনুসন্ধানী। তিনি বস্তুর দৃশ্যমান চেহারার পেছনে আরেকটি চেহারা খুঁজেছেন। এই গুণ তাকে ভ্যালেরি কিংবা টি. এস. এলিয়টের কাছাকাছি নিয়ে যায়। তাদের মতো তিনিও জানতেন, কবিতা ও চিন্তা পরস্পরের শত্রু নয়। একটি অনুভবকে গভীর করে, অন্যটি তার অর্থের দিকে তাকায়। আমরা তাদের আলাদা করি মূলত আমাদের সুবিধার জন্য; মহাবিশ্ব এত উদার নয় যে আমাদের শ্রেণিবিভাগ মেনে চলবে।

সম্ভবত এ কারণেই পাসের রচনায় বিজ্ঞান, নন্দনতত্ত্ব, রাজনীতি, পুরাণ, প্রেম ও ইতিহাস একে অন্যের কাছে ফিরে আসে। আধুনিক যুগ আমাদের জ্ঞানকে অসংখ্য ঘরে ভাগ করেছে। প্রতিটি ঘরের দরজায় একটি নাম: ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, শিল্প, রাজনীতি, মনোবিজ্ঞান। কিন্তু কোনো কোনো লেখক দরজাগুলোকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেন। পাস তাদের একজন।
ক্লদ লেভি-স্ট্রসের কাঠামো এবং মার্সেল দুশাঁর একটি শিল্পবস্তু তার কাছে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। একটি হাইকু, খাজুরাহোর ভাস্কর্য, কোনারকের পাথর, কাঠামোবাদী কোনো সূত্র, নিজের দেশের কথ্য ভাষা, একটি ‘রেডিমেড’, আমেরিকার কোনো পুরাণ, ফার্নান্দো পেসোয়া কিংবা লুইস সের্নুদার কবিতা—সবকিছুই তার অনুসন্ধানের একই মহাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত।
এখানে তার পদ্ধতিটি আমাকে প্রায়ই আন্তোনাঁ আরতো ও গাস্তোঁ বাশেলার কথা মনে করিয়ে দেয়। কোনো কোনো বাস্তবতা আমাদের কাছে পৃথক বলে মনে হয় শুধু এই কারণে যে আমরা তাদের জন্য পৃথক নাম তৈরি করেছি। গভীরে গেলে দেখা যায়, তাদের মধ্যে গোপন সেতু আছে। পাস সেই সেতুগুলো খুঁজেছেন।
তবে তিনি সহজ উপমার মানুষ নন। পরাবাস্তববাদ কখনো কখনো দুটি দূরবর্তী বস্তুর মধ্যে আকস্মিক সাদৃশ্য আবিষ্কার করেই সন্তুষ্ট হয়েছে। পাসের অনুসন্ধান তার চেয়ে কঠিন। তিনি সাদৃশ্যের চেয়ে ছন্দ খুঁজেছেন—অদৃশ্য সেই ছন্দ, যা পরস্পর অপরিচিত বলে মনে হওয়া বাস্তবতাগুলোকে একই গোপন সংগীতে যুক্ত করে।
এই অর্থে তার চিন্তাকে ‘প্রাক্-সক্রেটিসীয়’ বলা যায়। ইতিহাসের অগ্রগতির দীর্ঘ কাহিনি তাকে পুরোপুরি সন্তুষ্ট করেনি। তিনি আরও পুরোনো একটি প্রশ্নের দিকে ফিরে গেছেন: সত্তা কী? মানুষ কী? একটি নারী, একটি পাখি, একটি দেশ, একটি মহাদেশ কিংবা একটি কবিতা—কীভাবে তারা নিজেদের অর্থের বাইরে গিয়ে অন্য কিছুর দিকে ইঙ্গিত করে? এই প্রশ্নই তার কবিতার গভীরে।
মেক্সিকো তার কাছে শুধু একটি দেশ নয়; একটি নিয়তি। লাতিন আমেরিকা শুধু ভূগোল নয়; একটি অসমাপ্ত আত্মপরিচয়। তিনি জানতেন, আমাদের মহাদেশকে বারবার নিজেকে আবিষ্কার করতে হবে। কিন্তু সেই আবিষ্কার ইউরোপকে অস্বীকার করে সম্ভব নয়, যেমন অতীতকে মুছে ফেলেও ভবিষ্যৎ তৈরি করা যায় না। একটি সভ্যতা নিজের মৃতদের সঙ্গে কথোপকথন করেই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে।
এখানে মালার্মের কথা মনে পড়ে—গোত্রের শব্দগুলোকে আরও বিশুদ্ধ অর্থ দেওয়া। পাসের কাজের একটি অংশ যেন সেই অসম্ভব প্রচেষ্টা: পুরোনো শব্দকে নতুন করে উচ্চারণ করা, যাতে তার ভেতরে চাপা পড়ে থাকা অর্থ আবার জেগে ওঠে।

তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই অনুসন্ধানে আচ্ছন্ন। যেন কোনো অদৃশ্য ট্রেনের প্রতিটি জানালা তাঁর জন্য একটি নতুন গ্রন্থাগার। তিনি কামনার গোপন ইতিহাসে প্রবেশ করেন, গুপ্ত ও বিদেশি প্রতীকের দিকে তাকান, একটি ক্ষুদ্র জাপানি কবিতার মধ্যে অর্থ খোঁজেন, মন্দিরের ভাস্কর্যে মানুষের প্রাচীন আকাঙ্ক্ষা পড়েন, আধুনিক নৃতত্ত্বের পদ্ধতিকে প্রাচীন পুরাণের পাশে বসান।
এখানে তার অনুসন্ধানের একটি বিশেষ নৈতিক দিকও আছে। তিনি কেবল পাঠক নন। নিজের দেশের অন্ধকার রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর সামনে তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। ফলে তাঁর প্রশ্ন কেবল নন্দনতাত্ত্বিক নয়; তার মধ্যে ব্যক্তিগত দায়ও আছে। একজন মানুষ কী বিশ্বাস করেন, তা শেষ পর্যন্ত তাঁর চিন্তার বাইরে থাকে না।
পাসের অসংখ্য প্রবন্ধের সব সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হওয়া জরুরি নয়। কোনো কোনো সিদ্ধান্ত বিতর্কযোগ্য। কিন্তু তার চিন্তার ব্যাপ্তি অস্বীকার করা কঠিন। সমকালীন লাতিন আমেরিকার চিন্তায় তার স্থান এই কারণেই স্বতন্ত্র। তিনি ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েছেন, কিন্তু ভবিষ্যৎকে অতীতের অজ্ঞতার ওপর নির্মাণ করতে চাননি।
তিনি যে ‘নতুন মানুষ’-এর কথা ভাবেন, সে কোনো রাজনৈতিক স্লোগানের মানুষ নয়। সে এমন একজন, যার বাস্তবতার পরিধি বর্তমানের চেয়ে বড়। তার পৃথিবী আমাদের পরিচিত সীমানায় শেষ হয় না।
কিন্তু সেই মানুষ যদি সত্যিই কোনো দিন জন্ম নেয়, তার জন্মে কবিতার উপস্থিতি প্রয়োজন হবে।
কবিতা এখানে ছন্দোবদ্ধ বাক্য নয়। জীবনকে নতুনভাবে অনুভব করার ক্ষমতা। সেই কবিতা নয়, যা একসময়কার রোমান্টিকরা হাতির দাঁতের মিনারে বসে জীবন থেকে আলাদা করে রেখেছিল; বরং এমন কবিতা, যা ধূলি, রাজনীতি, প্রেম, শরীর, ক্ষুধা এবং ইতিহাসের সঙ্গে একই পৃথিবীতে বাস করে।
পাস এই কবিতার জন্য একটি ভাষা নির্মাণ করেছেন—যেখানে সৌন্দর্য ও কঠোরতা পাশাপাশি থাকে। মেক্সিকোর দীর্ঘ বাগ্মিতা ও অলংকারের ঐতিহ্যের মধ্যে তাঁর সংযম তাই বিশেষ অর্থ বহন করে।
আর তার কাজের কেন্দ্রে রয়েছে ‘সান স্টোন’।
আমার কাছে এটি লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রেমের কবিতাগুলোর একটি। প্রেম এখানে দুই মানুষের মধ্যকার আকর্ষণমাত্র নয়। এটি মানুষের নিজের সীমা অতিক্রম করার আকাঙ্ক্ষা। শরীরের মধ্য দিয়ে এমন এক সত্তার দিকে যাত্রা, যেখানে ‘আমি’ আর ইতিহাসের তৈরি একমাত্র পরিচয় থাকে না।
সেখানে সীমানাগুলো ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়।
পশ্চিমা মানুষ বহু দেবতাকে ত্যাগ করেছে, আবার বহু দেবতাকে নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে। দেহের দেবতা, গানের দেবতা, আনন্দের দেবতা—তারা সবাই হয়তো আমাদের কাছেই আছে। পৃথিবীর দরিদ্র প্রান্তরে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডে, কোনো শিশুর মাথায় হাত রেখে থাকা এক মায়ের আঙুলেও তাদের ছায়া দেখা যায়।
এই দেবতারা মানুষের কাছে কিছু চায় না; তারা কেবল অপেক্ষা করে। মানুষ কবে নিজের তৈরি অহংকারের জায়গাটি একটু সরিয়ে রাখবে, পৃথিবীকে কবে আবার নিজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে।
তারামাছটি তখনও সমুদ্রতীরে পড়ে থাকে।
তার কোনো ইতিহাস নেই, অথচ সে ইতিহাসের মতোই পুরোনো। তার কোনো ভাষা নেই, অথচ সে একটি বাক্যের মতো সম্পূর্ণ। সে একটি সমাপ্তি এবং একই সঙ্গে একটি শুরু। তার পাঁচটি বাহু যেন পাঁচটি দিক; কিন্তু তার কেন্দ্র একটিই।
এই প্রশ্নই তার কবিতার গভীরে প্রোথিত আছে।
আমরা যত বেশি দিক আবিষ্কার করি, তত দূরে সরে যাই কেন্দ্র থেকে। তারপর কোনো এক অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে একটি ছোট্ট তারামাছ, একটি কবিতা, একটি শব্দ কিংবা একটি মানুষের মুখ আমাদের আবার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনে।
অক্টাভিও পাস সেই প্রত্যাবর্তনের শিল্প জানতেন।
কম্পাসের কাঁটা ঘোরে। বাতাসের দিক বদলায়। মানচিত্র পুরোনো হয়ে যায়। কিন্তু কেন্দ্র—যদি সত্যিই কোনো কেন্দ্র থাকে—আমাদের অপেক্ষায় থাকে।
তারামাছটির মতো।
নিঃশব্দে।
সৈকতের ওপর।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









