সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী অ্যান কারসনের গদ্যের বই ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট: অ্যান এসে’ থেকে ‘বিটারসুইট’ লেখাটি দৈনিক এদিন অনলাইন পাঠকদের জন্য ভাষান্তর করল। আসুন পাঠক আমরা প্রেম তিক্তমধুর কেন অ্যান কারসনের কাছে জেনে নেই। লেখার মূল শিরোনাম হল ‘তিক্তমধু’ , ভাষান্তরের সময় আমরা একটু শিরোনামটি দেয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা নিলাম।
ইরোসকে প্রথম ‘তিক্তমধুর’ বলেছিলেন সাফো। যিনি কখনো প্রেমে পড়েছেন, তার পক্ষে এই কথার সঙ্গে দ্বিমত করা কঠিন। কিন্তু শব্দটির অর্থ কী? সাফোর কাছে ইরোস একই সঙ্গে আনন্দ ও যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা। এর মধ্যে রয়েছে এক দ্বৈততা, হয়তো এক ধাঁধাও। ইরোসকে অনুভব করলে মানুষের মন যেন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। কেন? বিরোধটির দুই দিক প্রথম দেখায় স্পষ্ট বলেই মনে হতে পারে। প্রেমের আকাঙ্ক্ষায় যে মধুরতা আছে, তা আমরা সাফোর মতোই স্বীকার করে নিই। তার আনন্দ আমাদের চোখের সামনেই ধরা দেয়। কিন্তু তিক্ততা ততটা স্পষ্ট নয়। যা মধুর, তা তিক্তও হতে পারে কেন? এই দুই স্বাদের মধ্যে একাধিক ধরনের সম্পর্ক থাকতে পারে। কবিরা বিষয়টিকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। সম্ভাবনাগুলো অনুসন্ধান করার জন্য সাফোর নিজের ভাষ্য দিয়েই শুরু করা যাক। সাফোর কবিতার প্রাসঙ্গিক অংশটি এমন—
ইরোস আবারও আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শিথিল করে আমাকে আলোড়িত করে—
তিক্তমধুর, অপ্রতিরোধ্য এক প্রাণী,
যে নিঃশব্দে এগিয়ে আসে।
— সাফো, খণ্ড ১৩০
কবিতাটির অনুবাদ সহজ নয়। ‘মধুরতিক্ত’ শব্দটি কানে ঠিকঠাক লাগে না। অথচ ইংরেজিতে প্রচলিত ‘বিটারসুইট’ বা ‘তিক্তমধুর’ শব্দটি সাফোর ব্যবহৃত গ্রিক যৌগিক শব্দ গ্লুকুপিক্রন-এর উপাদান দুটিকে উল্টো ক্রমে সাজিয়েছে। এতে কি কিছু যায়-আসে? যদি সাফোর শব্দবিন্যাসের পেছনে কোনো বর্ণনামূলক উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে তিনি যেন বলছেন, ইরোস প্রথমে মধুরতা আনে, তারপর তিক্ততা। অর্থাৎ অভিজ্ঞতাটিকে তিনি সময়ের ক্রমে সাজাচ্ছেন। অনেক প্রেমিকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই ক্রম মিলে যাবে। বিশেষত কবিতায়, যেখানে অধিকাংশ প্রেমের পরিণতি বিষাদময়। কিন্তু সাফো সম্ভবত তা বোঝাতে চাননি। তার কবিতার শুরুতেই সময়কে নাটকীয়ভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে—দেউতে, অর্থাৎ ‘আবারও’। আর প্রেমের ক্রিয়াটি বর্তমান কালে— দোনেই, অর্থাৎ ‘ঘুরিয়ে দেয়’ বা ‘আলোড়িত করে’। সাফো কোনো প্রেমের সম্পর্কের ইতিহাস লিখছেন না; তিনি ধরে রাখছেন আকাঙ্ক্ষার একটি মুহূর্তকে। ইরোসের চাপে একটি মুহূর্ত টলমল করে ওঠে। মনের ভেতরেই তৈরি হয় বিভাজন। এখানে আনন্দ ও যন্ত্রণার ধারাবাহিকতা নয়, তাদের যুগপৎ উপস্থিতিই মুখ্য। মধুর দিকটির নাম আগে এসেছে, সম্ভবত এ কারণে যে সেটি আমাদের কাছে কম বিস্ময়কর। জোর পড়েছে অন্য দিকটির ওপর—সেই সমস্যাজনক তিক্ততা, যা কবিতার দ্বিতীয় পঙ্ক্তিতে কোমল ধ্বনির পর কোমল ধ্বনি হয়ে এগিয়ে আসে।
ইরোস কোথাও বাইরে থেকে তার শিকারকে আক্রমণ করে, কিংবা নিঃশব্দে তার দিকে এগিয়ে আসে। অরপেটন—এমন এক প্রাণী, যে গোপনে এগিয়ে আসে। তাকে প্রতিহত করার কোনো উপায় নেই: আমাখানন—অপ্রতিরোধ্য। তাহলে আকাঙ্ক্ষা আকাঙ্ক্ষাকারীর নিজের ভেতরের বাসিন্দা নয়, তার মিত্রও নয়। তার ইচ্ছার সঙ্গে আকাঙ্ক্ষার কোনো সমঝোতা নেই। বাইরে থেকে এসে আকাঙ্ক্ষা তার ওপর এমনভাবে চেপে বসে, যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চলে না। ইরোস যেন এক শত্রু। তাহলে তার তিক্ততা কি শত্রুতারই স্বাদ? যদি তা-ই হয়, তবে সেই স্বাদ ঘৃণার। ‘বন্ধুকে ভালোবাসো, শত্রুকে ঘৃণা করো’—প্রাচীন গ্রিক সমাজে নৈতিক আচরণের এটি ছিল একটি প্রচলিত বিধান। ভালোবাসা ও ঘৃণা—এই দুই বিপরীত অনুভূতি মিলেই মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের কাঠামো তৈরি করে। কিন্তু একই প্রেমের অভিজ্ঞতার মধ্যে এই দুই অনুভূতির অবস্থান কি সম্ভব? সম্ভবত সম্ভব, যদি প্রেমের উপলক্ষ যে মানুষটি, তার মধ্যেই বন্ধু ও শত্রু এক হয়ে যায়। এই মিলন একটি ধাঁধার জন্ম দেয়। আধুনিক সাহিত্যের কল্পনায় ধাঁধাটি প্রায় চেনা হয়ে গেছে। আন্না কারেনিনা মস্কো স্টেশনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়, আকাঙ্ক্ষার দ্বিধা ও তার পরিণতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যেন ফিসফিস করে বলে ওঠে, ‘যেখানে ভালোবাসা শেষ হয়, সেখানেই ঘৃণার শুরু।’

কিন্তু প্রেমের এই বিরোধের জন্ম আন্না কারেনিনারও আগে, এমনকি ইরোসেরও আগে। ট্রয়ের প্রাচীরের কাছে হেলেন ও আফ্রোদিতির এক কথোপকথনে আমরা প্রথম এই বিরোধের নাটকীয় প্রকাশ দেখতে পাই। দৃশ্যটি যেন একটি আদর্শ উদাহরণ। হোমার আমাদের দেখান, আকাঙ্ক্ষার প্রতিমূর্তি হেলেন ইরোসের চাপিয়ে দেওয়া কর্তৃত্বে অতিষ্ঠ। প্যারিসের শয্যাসঙ্গিনী হওয়ার জন্য আফ্রোদিতি তাকে আদেশ দিলে তিনি তা অমান্য করেন। প্রেমের দেবী রেগে ওঠেন। অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন প্রেমেরই অন্তর্নিহিত বিরোধ—
দুর্ভাগা নারী, আমাকে আর উসকে দিয়ো না।
রাগলে তোমাকে ছেড়ে চলে যাব।
এখন যেমন ভয়ংকর ভালোবাসি,
তেমনই ভয়ংকর ঘৃণা করতে শুরু করব তোমাকে!
— ইলিয়াড, তৃতীয় সর্গ, ৪১৪–১৫
হেলেন সঙ্গে সঙ্গে বশ্যতা স্বীকার করেন। ভালোবাসা ও ঘৃণা একসঙ্গে যখন শত্রুর রূপ নেয়, তখন তাকে প্রতিরোধ করা কঠিন। সাফোর গ্লুকুপিক্রন শব্দে মধুরতা ও তিক্ততার যে যুগপৎ উপস্থিতি আমাদের চমকে দেয়, হোমারের কবিতায় তার প্রকাশ অন্যভাবে ঘটে। মহাকাব্যের রীতিতে মনের ভেতরের অনুভূতিগুলো ক্রিয়া ও ঘটনার ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। ফলে বিপরীতমুখী কাজের পরম্পরা থেকে আমরা একটি বিভক্ত মনের ছবি পাই। তবে হোমার ও সাফো একটি বিষয়ে একমত: আকাঙ্ক্ষার দেবতা একই সঙ্গে বন্ধু ও শত্রু। প্রেমের অভিজ্ঞতার মধ্যে তিনি এমন এক আবেগের জন্ম দেন, যার দুই দিক পরস্পরবিরোধী। অন্যান্য কবি ও সাহিত্যধারাতেও ইরোসকে ভালোবাসা ও ঘৃণার এই বিরোধের মধ্যে দেখা যায়। অ্যারিস্টোফেনিসের বর্ণনায়, প্রলোভনসঞ্চারী তরুণ আলকিবিয়াদিস গ্রিক জনগণের মধ্যে প্রেমিকের মতো এক অদ্ভুত অনুভূতি জাগাতে পারতেন। তাকে ভালোবাসত মানুষ, আবার ঘৃণাও করত; তবু তাকেই কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল ছিল—
তারা তাকে কামনা করে, ঘৃণাও করে,
তবু তাকে নিজেদের করে পেতে চায়।
— অ্যারিস্টোফেনিস, দ্য ফ্রগস, ১৪২৫
এসকাইলাসের আগামেমনন নাটকে হেলেন চলে যাওয়ার পর মেনেলাউসকে দেখা যায় তার শূন্য প্রাসাদে ঘুরে বেড়াতে। ঘরের প্রতিটি কোণে যেন হেলেনের ছায়া লেগে আছে। শোবার ঘরের কাছে এসে তিনি থেমে যান। তাঁর মুখে শোনা যায়, শয্যায় পড়ে থাকা প্রেমের চিহ্নগুলোর জন্য এক আকুল আর্তি। এখানে তার অনুভূতি যে আকাঙ্ক্ষা, তাতে সন্দেহ নেই। গ্রিক শব্দ পোথোস এই আকুল অভাবকেই প্রকাশ করে। কিন্তু সেই শূন্যতা ধীরে ধীরে ঘৃণায় ভরে ওঠে—
সমুদ্রের ওপারে চলে যাওয়া প্রিয়জনের আকাঙ্ক্ষায়
মনে হয়, তারই এক ছায়ামূর্তি
প্রাসাদের ঘরগুলো শাসন করছে।
সুন্দর মূর্তিগুলোর সৌন্দর্যও
এখন সেই পুরুষের কাছে ঘৃণার বিষয়।
চোখের অনুপস্থিতিতে
আফ্রোদিতির সমস্ত মাধুর্য যেন উধাও।
— এসকাইলাস, আগামেমনন, ৪১৪–১৯

প্রেমের অনুপস্থিতি এখানে কেবল শূন্যতা নয়। সেই শূন্যতা সৌন্দর্যকেও অসহ্য করে তোলে। যে সৌন্দর্য একসময় আকর্ষণ করেছিল, প্রিয়জনের অনুপস্থিতিতে সেটিই ঘৃণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হেলেনীয় যুগের ক্ষুদ্র কবিতাতেও ভালোবাসা ও ঘৃণার এই সম্পর্ক ফিরে আসে। নিকারখোস তার প্রিয়জনকে বলেন—
তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো, তবে ঘৃণাও করো।
আর যদি ঘৃণা করো, তবে ভালোবাসোও।
কিন্তু প্রিয়তম, যদি আমাকে ঘৃণাই না করো,
তবে আমাকে ভালোবেসো না।
— অ্যান্থোলজি পালাটিনা, ১১.২৫২
এই বিরোধের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও সুন্দর প্রকাশগুলোর একটি পাওয়া যায় রোমান কবি ক্যাটুলাসের কবিতায়:
ঘৃণা করি, ভালোও বাসি। কেন এমন করি,
হয়তো তুমি জানতে চাইবে।
আমি জানি না। শুধু অনুভব করি,
এমনটাই ঘটছে—আর যন্ত্রণায় ছটফট করি।
— ক্যাটুলাস, ৮৫
গ্রিক গীতিকবিতার কবিরা কখনো কখনো প্রেমের অবস্থাকে এভাবেই সরাসরি ধারণার ভাষায় প্রকাশ করেন। কিন্তু সাফো এবং তার উত্তরসূরিরা সাধারণত ধারণার চেয়ে শরীর ও ইন্দ্রিয়ের ভাষাকেই বেশি গুরুত্ব দেন। আকাঙ্ক্ষার মুহূর্তে আত্মা নিজের ভেতরেই যখন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন সেই অভিজ্ঞতাকে শরীর ও ইন্দ্রিয়ের সংকট হিসেবে কল্পনা করা হয়।
সাফোর ভাষায়, সেটি তিক্ত ও মধুর হওয়ার মুহূর্ত। পরবর্তী কবিরা এই দ্বৈত স্বাদকে নানা রূপ দিয়েছেন। কোথাও তা ‘তিক্ত মধু’, কোথাও ‘মধুর ক্ষত’, কোথাও ‘মধুর অশ্রুর ইরোস’। প্রেম যেন একই সঙ্গে মধুরতা ও যন্ত্রণা তৈরি করে। আনাক্রেয়নের একটি কবিতায় ইরোস প্রেমিককে এমনভাবে আঘাত করে যে তিনি একই সঙ্গে প্রচণ্ড উত্তাপ ও শীতলতার অভিজ্ঞতা লাভ করেন—
বিশাল হাতুড়ি হাতে কামারের মতো
ইরোস আবারও আমাকে আঘাত করল,
তারপর শীতের এক খাদে
ডুবিয়ে দিল আমাকে।
— আনাক্রেয়ন, পিএমজি, ৪১৩
সোফোক্লিস এই অভিজ্ঞতার তুলনা করেছেন উষ্ণ হাতে গলে যাওয়া একখণ্ড বরফের সঙ্গে। পরবর্তী কবিরা উত্তাপ ও শীতলতার অনুভূতির সঙ্গে স্বাদের রূপক মিশিয়ে তৈরি করেছেন ‘মধুর আগুন’, ‘মধুতে দগ্ধ প্রেমিক’ কিংবা ‘মধুতে শান দেওয়া প্রেমের তির’-এর মতো চিত্রকল্প। ইবাইকোস প্রেমকে কল্পনা করেছেন ভেজা ও শুকনোর এক বিরোধ হিসেবে। আকাঙ্ক্ষার কালো ঝড় তার ওপর আছড়ে পড়ে, কিন্তু সেই ঝড় বৃষ্টি আনে না; আনে ‘জলন্ত উন্মাদনা’। এই রূপকগুলোর পেছনে প্রাচীন শারীরবিদ্যা ও মনস্তত্ত্বের কিছু ধারণা কাজ করে থাকতে পারে। সে সময়ের চিন্তায় আনন্দদায়ক, কাঙ্ক্ষিত কিংবা কল্যাণকর অভিজ্ঞতার সঙ্গে উত্তাপ, তরলতা ও গলে যাওয়ার অনুভূতির সম্পর্ক কল্পনা করা হতো। অন্যদিকে অপ্রিয় বা ঘৃণার অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত করা হতো শীতলতা, জমে যাওয়া ও কঠিন হয়ে ওঠাকে। কিন্তু আবেগকে এভাবে সরল কোনো মানচিত্রে সাজানো যায় না। আকাঙ্ক্ষা সরল নয়। গ্রিক ভাষায় প্রেমের ক্রিয়াকে বলা হয় মিগনুমি—মিশে যাওয়া। আবার আকাঙ্ক্ষা শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শিথিল করে দেয়; সাফোর ব্যবহৃত লুসিমেলেস শব্দটি সেই অভিজ্ঞতাই বোঝায়। প্রেমে শরীরের সীমানা ও চিন্তার শ্রেণিবিভাগ—দুটিই যেন এলোমেলো হয়ে যায়। যে দেবতা শরীরকে শিথিল করে দেন, তিনিই আবার প্রেমিককে এমনভাবে পরাস্ত করেন, যেন যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো শত্রু তাকে আক্রমণ করেছে। গ্রিক কবি আর্কিলোকোসের ভাষায়—
বন্ধু, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শিথিলকারী আকাঙ্ক্ষা
আমাকে পরাস্ত করছে।
— আর্কিলোকোস, আইইজি, ১.৯৬

প্রেম ও ঘৃণার এই দ্বৈত রূপ শরীর ও ইন্দ্রিয়ের নানা সংকটের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। প্রতিটি সংকট মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে এবং কিছু করতে বাধ্য করে। অথচ ইরোস যখন ইন্দ্রিয়কে আলোড়িত করে, তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব হয়ে ওঠে, কাজ করার ইচ্ছাও পরস্পরবিরোধী হয়ে পড়ে। দৈনন্দিন জীবন তখন কঠিন হয়ে ওঠে। আচরণ ও বিচারবুদ্ধির ওপর এর প্রভাব নিয়ে কবিরা বারবার লিখেছেন। সাফো বলেন—
আমি জানি না, কী করা উচিত।
আমার ভেতরে দুটি মন—
তারপর তিনি থেমে যান।
আনাক্রেয়ন যেন একই দ্বিধাকে আরও সরাসরি উচ্চারণ করেন—
আমি প্রেমে পড়েছি, আবার পড়িনি!
আমি উন্মাদ, আবার উন্মাদ নই!
— আনাক্রেয়ন, পিএমজি, ৪২৮
আরেক কবি এক তরুণের প্রতি আকর্ষণের কথা বলতে গিয়ে জানান—
যুবকদের মধ্যে নতুন অঙ্কুরের মতো
দিয়োফান্তোসকে যখন দেখি,
তখন না পারি পালাতে,
না পারি থেকে যেতে।
— অ্যান্থোলজি পালাটিনা, ১২.১২৬
সোফোক্লিসের সিদ্ধান্ত আরও সংক্ষিপ্ত— আকাঙ্ক্ষা প্রেমিককে একই সঙ্গে কাজ করতে ও কাজ না করতে টানে। শুধু আচরণ নয়, নৈতিক বিচারবোধও এই বিরোধের চাপে ভেঙে যায়। আকাঙ্ক্ষা এমন এক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়, যা একই সঙ্গে ভালো ও মন্দ। ইউরিপিদিসের প্রেমের দেবতার হাতে এমন এক ধনুক আছে, যার আঘাতের ফল দ্বিমুখী: তা যেমন সুন্দর জীবন এনে দিতে পারে, তেমনি সম্পূর্ণ বিপর্যয়ও ডেকে আনতে পারে। ইউরিপিদিস একসময় প্রেমের দেবতাকেই যেন দুই ভাগে ভাগ করে দেন। তার হারিয়ে যাওয়া স্টেনেবোয়া নাটকের একটি খণ্ডে দেখা যায়, ইরোসের দুটি রূপ। এক রূপ প্রেমিককে নৈতিক ও সুন্দর জীবনের দিকে পরিচালিত করে। অন্য রূপটি প্রেমিকের সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু; সে তাকে সরাসরি মৃত্যুর গৃহের দিকে নিয়ে যায়। এভাবেই ভালোবাসা ও ঘৃণা ইরোসকে দ্বিখণ্ডিত করে।
এবার ফিরে আসা যাক আমাদের শুরুর প্রশ্নে— সাফোর ব্যবহৃত গ্লুকুপিক্রন শব্দটির অর্থ কী? কবিতাগুলো পরীক্ষা করতে করতে শব্দটির একটি অবয়ব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রেমিকের মনের সংবেদনশীল পৃষ্ঠে প্রথম যে আঘাতটি লাগে, তা হলো ‘তিক্তমধুর ইরোস’। কবিতার সংবেদনশীল পৃষ্ঠে সেই আঘাতের যে ছাপ পড়ে, তা হলো বিরোধ—একটি নেগেটিভ ছবি, যেখান থেকে পরে অন্য ছবি তৈরি করা সম্ভব। ইন্দ্রিয়ের সংকট, আচরণের দ্বিধা কিংবা মূল্যবোধের বিরোধ—যেভাবেই তাকে অনুভব করা হোক না কেন, ইরোস একই পরস্পরবিরোধী সত্যের ছাপ রেখে যায়— প্রেমের আকাঙ্ক্ষার ভেতরেই ভালোবাসা ও ঘৃণা এসে মিলিত হয়।
কেন?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









