কবিতা, প্রবন্ধ, গ্রিক ট্র্যাজেডির নতুন পাঠ—সাহিত্যের নানা শাখায় নিজের স্বতন্ত্র ভাষা তৈরি করেছেন কানাডীয় লেখক অ্যান কারসন। তার লেখায় প্রেম, ঈর্ষা, বিচ্ছেদ, আকাঙ্ক্ষা ও শূন্যতার মতো ব্যক্তিগত অনুভূতি যেমন উঠে আসে, তেমনি প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যও পায় নতুন অর্থ। তার বইয়ের জগতে প্রবেশ করতে চাইলে কোনগুলো দিয়ে শুরু করবেন, রইল তার একটি নির্দেশিকা।
কেন পড়বেন অ্যান কারসন
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে অ্যান কারসন লিখে চলেছেন কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ ও নানা ধরনের পরীক্ষামূলক সাহিত্য। কখনো শিল্পীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছেন, কখনো সাহিত্যের সঙ্গে মিলিয়েছেন চিত্রকলা, গ্রাফিক নকশা ও ব্যক্তিগত স্মৃতিকে।
তার লেখার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ভাষার স্বাতন্ত্র্য। সংযত অথচ তীক্ষ্ণ সেই ভাষায় বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান যেমন আছে, তেমনি আছে গভীর আবেগ। কিন্তু আবেগ প্রকাশে তিনি অতিরিক্ত নাটকীয়তার আশ্রয় নেন না। বরং কখনো ছেঁটে দেন লেখার অংশ, কখনো নীরবতার মধ্য দিয়ে তুলে ধরেন যন্ত্রণার গভীরতা।
এই সংযমই তার লেখাকে দেয় বিশেষ ঘনত্ব। অল্প কথায় অনেক কিছু বলার ক্ষমতা তার লেখাকে একই সঙ্গে তীব্র ও আকর্ষণীয় করে তোলে।
শুরু করতে পারেন যে বই দিয়ে
দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড (২০০১)
বইটির পুরো নাম ‘দ্য বিউটি অভ দ্য হাজব্যান্ড: আ ফিকশনাল এসে ইন টুয়েন্টি নাইন ট্যাঙ্গোজ’। দীর্ঘ নাম দেখে পিছিয়ে যাওয়ার কারণ নেই। বিচ্ছেদকে কেন্দ্র করে লেখা এই বইয়ে অ্যান কারসন তুলে ধরেছেন যৌন ঈর্ষা, আকাঙ্ক্ষা ও সম্পর্কের টানাপোড়েন। ২৯টি অধ্যায়ে সাজানো বইটির প্রতিটি অংশ যেন একটি করে ট্যাঙ্গো নাচ—কখনো আকর্ষণ, কখনো রাগ, কখনো কাছে আসা, আবার কখনো দূরে সরে যাওয়া। কবিতার ছন্দময় ভাষা ও দ্রুতগতির বাক্য সেই আবেগের ওঠানামাকে আরও জীবন্ত করে তোলে।
প্রেমের সম্পর্কের জটিলতা যারা বুঝতে চান, তাদের জন্য এটি হতে পারে কারসনের লেখার জগতে প্রবেশের সবচেয়ে ভালো দরজা। যে বই পড়তে বসলে থামতে ইচ্ছা করবে না
অটোবায়োগ্রাফি অব রেড
‘দ্য বিউটি অভ দ্য হাজব্যান্ড’ প্রকাশের তিন বছর আগে, ১৯৯৮ সালে, প্রকাশিত হয় ‘অটোবায়োগ্রাফি অভ রেড’। প্রাচীন গ্রিক পুরাণের খণ্ডিত একটি কাহিনিকে নতুনভাবে সাজিয়ে কারসন এখানে তৈরি করেছেন এক তরুণ শিল্পীর আত্মপরিচয় খোঁজার গল্প। গেরিয়ন নামের এই চরিত্রটি প্রচলিত ধারণার বাইরে। সে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা মনে করে এবং নিজের অস্তিত্ব নিয়েই অস্বস্তিতে ভোগে। তার জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে পারিবারিক যৌন নির্যাতন, একাকিত্ব ও নিজের পরিচয় নিয়ে দ্বন্দ্ব। কারসন প্রাচীন পুরাণকে সমকালীন জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিলিয়েছেন যে গল্পটি শুধু পুরাণের পুনর্কথন হয়ে থাকে না। বরং ভিন্ন যৌনপরিচয় প্রকাশ, প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেঁচে থাকা এবং নিজের শরীর ও পরিচয় সম্পর্কে অস্বস্তির মতো অভিজ্ঞতাও এতে জায়গা পেয়েছে।
২০১৩ সালে এর পরবর্তী বই ‘রেড ডক>’ প্রকাশিত হয়।
যে বই ভাবনার জগৎ বদলে দিতে পারে
ইরোস দ্য বিটারসুইট (১৯৮৬)
অ্যান কারসনের প্রথম বই ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’। নিজের পিএইচডি গবেষণার ভিত্তিতে লেখা এই বই প্রকাশ করে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস। তবে এটি কেবল গবেষণাধর্মী বই নয়; প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও অনুপস্থিতি নিয়ে এক গভীর অনুসন্ধান। কারসন দেখিয়েছেন, আকাঙ্ক্ষা শুধু কোনো কিছুকে পাওয়ার ইচ্ছা নয়। এর মধ্যে রয়েছে না-পাওয়ার বেদনাও। যা আমাদের কাছে নেই, তার প্রতিই অনেক সময় টান সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। এই অভাব ও আকর্ষণের দ্বন্দ্বই তাঁর লেখার অন্যতম প্রধান বিষয়। কবিতা ও শিল্পের সৃষ্টিপ্রক্রিয়াকেও এই দৃষ্টিতে বোঝা যায়। শিল্পী যা সৃষ্টি করতে চান, তার প্রতি আকাঙ্ক্ষা এবং যা এখনো অধরা—দুটিই সৃষ্টির প্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।
জটিল প্রশ্নের সহজ উত্তর না খুঁজে যাঁরা ভাবনার নানা পথ আবিষ্কার করতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য বইটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রচলিত বইয়ের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে যে কাজ
নক্স (২০০৯) ও ফ্লোট (২০১৬)
অ্যান কারসনের পরীক্ষামূলক কাজের মধ্যে ‘নক্স’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি প্রচলিত বইয়ের মতো নয়; বাক্সের মধ্যে রাখা অ্যাকর্ডিয়নের মতো ভাঁজ করা একটি দীর্ঘ বই। নিজের প্রয়াত ভাইকে স্মরণ করে এটি তৈরি করেন কারসন। ভাই একসময় কানাডা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন এবং তার সঙ্গে কারসনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্মৃতি, ছবি, ব্যক্তিগত ভাবনা ও বিচ্ছিন্ন লেখার টুকরো মিলিয়ে তৈরি এই বই শোককে প্রকাশের এক ভিন্ন পদ্ধতি দেখায়। এখানে স্মৃতি কোনো সরল ধারাবাহিক গল্প নয়; বরং ছড়িয়ে থাকা নানা মুহূর্ত, যেগুলো একসঙ্গে জুড়ে তৈরি হয় হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষের ছবি।
২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘ফ্লোট’ বইটিও প্রচলিত ধারণার বাইরে। এতে রয়েছে ১২টি আলাদা পুস্তিকা। কবিতা, নাটকের পাণ্ডুলিপি, পাবলো পিকাসোকে নিয়ে জারট্রুড স্টেইনের সঙ্গে কাল্পনিক সংলাপ এবং উড়ানের অভিজ্ঞতা নিয়ে গদ্যকবিতা—বিষয়ের বৈচিত্র্য বইটিকে করেছে ব্যতিক্রমী। কিছু পুস্তিকা মাত্র একটি দ্বিপৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ। কিন্তু আকারে ছোট হলেও প্রতিটি লেখায় রয়েছে চিন্তার স্বাতন্ত্র্য।
যে বইয়ে বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছা করে
ইফ নট, উইন্টার
‘ইফ নট, উইন্টার: ফ্র্যাগমেন্টস অভ স্যাফো’ বইয়ে অ্যান কারসন প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতার খণ্ডাংশ অনুবাদ করেছেন। স্যাফোর বহু কবিতাই সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে; টিকে আছে কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু পঙ্ক্তি ও বাক্যাংশ। এই অসম্পূর্ণতাকেই কারসন আড়াল করার চেষ্টা করেননি। বরং একজন কবি ও ধ্রুপদি সাহিত্যের গবেষক হিসেবে তিনি যতটুকু বুঝতে পেরেছেন, ততটুকুই সততার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। কোথায় শব্দ আছে, কোথায় বাক্য ভেঙে গেছে, কোথায় অর্থ অনিশ্চিত—সেই সীমাবদ্ধতাও তার অনুবাদের অংশ। এখানেই কারসনের বিশেষত্ব। প্রাচীন সাহিত্যের প্রতি তার গভীর জ্ঞান কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছে, কিন্তু সেই জ্ঞান কবিতার স্বতঃস্ফূর্ততাকে ঢেকে দেয়নি। তার অনুবাদ একই সঙ্গে কঠোর ও কোমল, সংযত অথচ আবেগপূর্ণ।
অ্যান কারসনের লেখার বিশেষত্ব কোথায়
কারসনের রচনার শক্তি শুধু তার বিষয় নির্বাচনে নয়, বরং জটিলতাকে জটিল হিসেবেই গ্রহণ করার ক্ষমতায়। তিনি পাঠককে কোনো একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য করেন না। একই লেখা বারবার পড়লে নতুন অর্থ সামনে আসতে পারে, পুরোনো ব্যাখ্যাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। যে সময়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনা প্রায়ই দুই বিপরীত অবস্থানের মধ্যে আটকে যায়, সে সময়ে তার লেখা মনে করিয়ে দেয়—মানুষের অনুভূতি, সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতা সব সময় সরল ব্যাখ্যায় ধরা পড়ে না।
অ্যান কারসনকে পড়ার জন্য তাই শুধু কবিতার প্রতি আগ্রহ থাকলেই চলে না; প্রয়োজন অনিশ্চয়তা ও অসম্পূর্ণতার মধ্যেও অর্থ খুঁজে নেওয়ার ইচ্ছা। কোথা থেকে শুরু করবেন? প্রেম ও বিচ্ছেদের টানাপোড়েন বুঝতে ‘দ্য বিউটি অভ দ্য হাজব্যান্ড’, গল্পের টানে পড়তে ‘অটোবায়োগ্রাফি অভ রেড’, আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ভাবতে ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ আর কবিতার অনুবাদ ও ভাষার সূক্ষ্মতা উপভোগ করতে ‘ইফ নট, উইন্টার’ বেছে নিতে পারেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









