নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মী, সাংবাদিক ও লেখক গ্লোরিয়া স্টেইনেম ৯২ বছর বয়সে মারা গেছেন। ২ সেপ্টেম্বর, বুধবার নিউইয়র্কের নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। ১৯৩৪ সালের ২৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যে জন্ম নেওয়া স্টেইনেম সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭২ সালে তিনি ‘মিস’ (Ms.) সাময়িকী প্রতিষ্ঠা করেন, যা নারীদের অধিকার ও সমতার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বব্যাপী নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। নারীর প্রজনন অধিকার, সমান মজুরি ও সমঅধিকারের পক্ষে তিনি দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছেন। একই মৃত্যুদণ্ড বিলোপ এবং নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তার প্রতিষ্ঠানের ভাষায়, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সমতার জন্য কাজ করে গেছেন স্টেইনেম।
যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের সল্ট লেক সিটির সরকারি টেলিভিশন কিউ-ই-ডি-এর প্রযোজনায় নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘নো সেইফ প্লেস: ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন’-এ গ্লোরিয়া স্টেইনেমের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার রয়েছে।
নারী অধিকার আন্দোলনের এই অগ্রদূতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দৈনিক এদিন অনলাইন পাঠকদের জন্য সেই কথোপকথনটি প্রকাশ করছে। এতে উঠে এসেছে নারীর অধিকার, সমতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে স্টেইনেমের ভাবনা ও দীর্ঘ সংগ্রামের কথা। তার চিন্তা ও কাজকে নতুন করে স্মরণ করার সুযোগ করে দেবে এই কথোপকথন।
প্রশ্ন: আমেরিকায় নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা কতটা ব্যাপক?
গ্লোরিয়া স্টেইনেম:
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা কতটা ছড়িয়ে আছে এবং এর প্রভাব কত গভীর—এই দুই প্রশ্নের উত্তরই আমরা এখনো পুরোপুরি জানি না। আসলে আমরা মাত্র এর চূড়া দেখতে শুরু করেছি।
যেমন, মনে হতে পারে শিশুদের যৌন নির্যাতন বা ঘরের ভেতর নারীর ওপর নির্যাতন আগের চেয়ে বেড়েছে। কিন্তু ৬০ বা ৭০ বছর বয়সী নারীদের জিজ্ঞেস করলে দেখা যায়, তাদের সময়েও এর হার প্রায় একই ছিল। পার্থক্য হলো, তখন আমরা বিষয়টি জানতাম না বা তা নিয়ে কথা বলতাম না।
নারীর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো এই সহিংসতা। পরিসংখ্যান বলছে, একজন নারীর জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা অনেক সময় রাস্তা নয়—নিজের ঘর। যে পুরুষের সঙ্গে তিনি থাকেন, তার হাতেই আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
আর এই অভিজ্ঞতার মানসিক আঘাত কতটা গভীর, তা আমরা এখন বুঝতে শুরু করেছি। জুডিথ হারম্যানের ‘ট্রমা এন্ড রিকভারি’ বইটিতে যুদ্ধফেরত সৈনিকদের মানসিক আঘাতের সঙ্গে ঘরোয়া সহিংসতার শিকার নারীদের অভিজ্ঞতার তুলনা করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, ঘরোয়া সহিংসতার শিকার মানুষ অনেক সময় আরও দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে থাকেন।
প্রশ্ন: বইটির লেখক কে?
গ্লোরিয়া স্টেইনেম:
জুডিথ হারম্যান। বইটির নাম ‘ট্রমা এন্ড রিকভারি’। ঘরোয়া সহিংসতার ক্ষেত্রে নির্যাতনকারী এমন একজন মানুষ, যার ওপর ভুক্তভোগী অনেক সময় নির্ভরশীল, যাকে ভালোবাসার কথা এবং যার সামনে সে নিজেকে অসহায় অবস্থায় দেখতে পায়। এটি যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার মতো নয়।
অনেক সময় তার পাশে কাউকেই পাওয়া যায় না। ফলে মানসিক আঘাত আরও গভীর হয় এবং দীর্ঘদিন থেকে যায়। বইটি এ বিষয়ে অসাধারণ কাজ।
প্রশ্ন: নারীর বিরুদ্ধে পুরুষের সহিংসতার মূল কারণ কী? এটি কি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, জীববিজ্ঞান, সমাজব্যবস্থা, নাকি ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা থেকে আসে?
গ্লোরিয়া স্টেইনেম:
নারীর বিরুদ্ধে পুরুষের সহিংসতার মূল কারণ জীববৈজ্ঞানিক নয়। যদি তা হতো, তাহলে পৃথিবীর সব সংস্কৃতিতেই একই মাত্রায় এই সহিংসতা দেখা যেত। কিন্তু তা দেখা যায় না।
কিছু উপজাতীয় এবং কম পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর ওপর সহিংসতা খুব কম। কোথাও আবার ছেলে ও মেয়েদের মধ্যেও সহিংসতার মাত্রা প্রায় সমান। সেখানে ধর্ষণ বা নারীর বিরুদ্ধে সংগঠিত সহিংসতার এমন প্রবণতা নেই।
তাই এর মূল কারণ সামাজিক।
খুব গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, পুরুষদের ছোটবেলা থেকেই আধিপত্য করতে শেখানো হয়। যদি একটি সমাজ পুরুষের আধিপত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে সেই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে পুরুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখাতেই হবে। ফলে একজন পুরুষ মনে করতে শুরু করে, অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করাই পুরুষত্বের অংশ।
কিছু পুরুষ সহিংসতা ও নিয়ন্ত্রণের প্রতি এমনভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে, যেন এটি এক ধরনের মাদক। সহিংস পুরুষদের সঙ্গে কথা বললে অনেক সময় মনে হয়, তারা নিজেদের আচরণকে আসক্তির মতোই বর্ণনা করে।
কোনো কারণে যদি তার মনে হয় সে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে—যেমন স্ত্রী সময়মতো খাবার তৈরি করেনি, নিজের মত প্রকাশ করেছে, কিংবা তার কথা মেনে নেয়নি—তখন সে নিজেকে কম পুরুষ মনে করতে পারে। আর সেই অনুভূতি থেকেই সহিংসতার বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
প্রশ্ন: লিঙ্গভূমিকা কীভাবে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত?
গ্লোরিয়া স্টেইনেম:
লিঙ্গভূমিকাকে যদি আমরা সামাজিক ও রাজনৈতিক নির্মাণ হিসেবে দেখি, তাহলে বোঝা যায়, মানুষের নানা গুণকে আমরা কৃত্রিমভাবে ভাগ করে দিয়েছি। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ গুণকে ‘পুরুষালি’ আর এক-তৃতীয়াংশকে ‘নারীসুলভ’ বলে চিহ্নিত করেছি।
নারীরা তাই নিজেদের অনেক মানবিক গুণ থেকে বঞ্চিত হয়। এই কারণেই নারীরা এই বিভাজন বদলানোর জন্য সামনে এসেছে।
কিন্তু পুরুষেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোমলতা, সহানুভূতি, মমতা, নিজের দুর্বলতা প্রকাশ কিংবা অনিশ্চয়তা—এসবকে যদি ‘নারীসুলভ’ বলে শেখানো হয়, তাহলে ছেলেরা বড় হতে হতে এসব অনুভূতি দমন করতে শেখে। নিজের মধ্যেই এসব গুণ থাকার জন্য তারা লজ্জা পেতে শুরু করে।
এটি আসলে নিজের একটি অংশকে হারিয়ে ফেলা। আর সেখান থেকেই আত্মমর্যাদার গভীর সংকট তৈরি হয়।
অন্য মানুষের মধ্যে নিজের হারিয়ে যাওয়া গুণগুলো দেখলেও কেউ কেউ হুমকি অনুভব করতে পারে। একজন পুরুষ নারীর কাছে ঘনিষ্ঠ হতে ভয় পেতে পারে, কারণ তাকে শেখানো হয়েছে—নারীর সঙ্গে আবেগের ঘনিষ্ঠতা পুরুষালি নয়।
প্রশ্ন: সমাজ কি পুরুষের সহিংসতাকে শুধু মেনে নেয়, নাকি উৎসাহও দেয়?
গ্লোরিয়া স্টেইনেম:
সমাজ অবশ্যই নারীর প্রতি পুরুষের সহিংসতাকে অনেকভাবে প্রশ্রয় দেয়। অতীতে এটি আরও স্পষ্ট ছিল। একসময় আইনও এমন ছিল, যার ফলে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে স্ত্রীকে মারধর করাকে পুরুষের অধিকার হিসেবে দেখা হতো।
আমেরিকার প্রথম দিকের নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের সময় নারীদের অনেক ক্ষেত্রে মানুষের মতো নয়, সম্পত্তির মতো বিবেচনা করা হতো। একটি টেবিল বা চেয়ারের মতোই নারীকে পুরুষের মালিকানাধীন বস্তু মনে করা হতো। তাই তার ওপর সহিংসতাও সহজে গ্রহণ করা হতো।
সময়ের সঙ্গে এই মনোভাব কিছুটা বদলেছে। কিন্তু এর শিকড় এখনো গভীরে।
সমস্যা শুরু হয় যখন নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্ককেও আমরা আধিপত্য ও বশ্যতার সম্পর্ক হিসেবে দেখতে শুরু করি। সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রণের ধারণা তৈরি হয়। আর সেই ধারণা ধীরে ধীরে মারধর, নির্যাতন, নির্যাতনের চরম রূপ এবং হত্যার দিকে যেতে পারে।
আজকের সংবাদপত্র খুললেই আমরা দেখতে পাই, কোনো নারীকে একজন পুরুষ হত্যা করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই এর পেছনে লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক কাজ করে।
প্রশ্ন: সমাজ কি নারীদেরও ‘ভুক্তভোগী’ হতে শেখায়?
গ্লোরিয়া স্টেইনেম:
হ্যাঁ। সমাজ নানা দিক থেকে নারীদের ভুক্তভোগীর ভূমিকা মেনে নিতে শেখায়।
একজন নারী যদি সমাজের অনুমোদন চায়, তাহলে তাকে অনেক সময় নিজের কষ্ট সহ্য করতে হয়। নিজের শরীর, নিজের সন্তান ধারণের সিদ্ধান্ত, এমনকি নিজের জীবন নিয়ন্ত্রণ করার অধিকারও তার জন্য সহজ নয়।
নারীর নিষ্ক্রিয়তাকে ‘নারীসুলভ’ বলে পুরস্কৃত করা হয়। কিন্তু সে যদি নিজের অধিকারের জন্য দাঁড়ায়, নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে চায়, তখন তাকে নানা নামে ডাকা হয়।
সে চাকরি হারাতে পারে। সন্তানের হেফাজত হারাতে পারে। এমনকি স্বামী সমান সম্পর্ক মেনে নিতে না চাইলেও বিয়ের ব্যর্থতার জন্য তাকেই দায়ী করা হতে পারে।
নারীকে যদি মারধর করা হয়, বলা হয় সে নাকি পুরুষটিকে উসকে দিয়েছিল। তাকে ধর্ষণ করা হলে বলা হয়, সে নাকি নিজেই সেই পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।
এই ধারণাগুলো আমাদের সংস্কৃতির গভীরে রয়েছে। অবশ্যই পরিবর্তন হচ্ছে। তাই হতাশ হওয়ার কারণ নেই। আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। কিন্তু পুরোনো ধারণাগুলো এখনো গভীরভাবে টিকে আছে।

প্রশ্ন: সহিংসতা কমাতে সমাজ কী করতে পারে? সহিংসতা কি অনিবার্য?
গ্লোরিয়া স্টেইনেম:
না, সহিংসতা অনিবার্য নয়। যদি কোনো সহিংসতাকে ন্যায্য বলা যায়, তাহলে সেটি আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে। কিন্তু সমস্যা সমাধানের জন্য সহিংসতা কখনো গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়—তা ব্যক্তিগত হোক বা রাজনৈতিক।
অনেকে বলবে, যুদ্ধ তো সব সময় হয়েছে, পুরুষেরা সব সময় নারীদের মারধর করেছে। কিন্তু সব সংস্কৃতিতে তা সত্য নয়। অর্থাৎ এটি অনিবার্য নয়।
পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হলো—পরিবর্তনকে কল্পনা করা। আমরা কোনো পরিবর্তনের দিকে এগোনোর আগে তাকে মনে মনে দেখতে পারতে হবে।
একদিকে আমাদের সেই মানুষদের উদ্ধার করতে হবে যারা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। তাই ধর্ষণ ও ঘরোয়া সহিংসতার শিকারদের জন্য আরও বেশি অর্থ ও সহায়তা প্রয়োজন।
কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের নদীর উৎসের দিকেও যেতে হবে—কেন মানুষ নদীতে পড়ে যাচ্ছে, সেটি দেখতে হবে। আমাদের ছেলেদের শেখানো হয়, আধিপত্য করা পুরুষালি। মেয়েদের শেখানো হয়, অন্যের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া বা নিষ্ক্রিয় থাকা নারীসুলভ।
অনেক বাবা-মা সাহস করে মেয়েদের ছেলেদের মতো স্বাধীনভাবে বড় করছেন। এটি খুব ভালো পরিবর্তন। কিন্তু আরও বেশি মানুষকে ছেলেদেরও মেয়েদের মতো কোমল, সহানুভূতিশীল ও আবেগ প্রকাশে স্বাধীন করে বড় করতে হবে। সেখানেই বড় পরিবর্তনের শুরু।
প্রশ্ন: তাহলে কি সমাধানের একটি অংশ লিঙ্গসমতা?
গ্লোরিয়া স্টেইনেম:
হ্যাঁ, তবে শুধু সমতা বললে হবে না। কারণ তখন মনে হতে পারে, নারীদের পুরুষদের সমান বানানোই লক্ষ্য। আসল লক্ষ্য সেটি নয়।
আমরা যদি সব সময় ‘পুরুষালি’ ও ‘নারীসুলভ’ বলে মানুষের গুণগুলোকে ভাগ করতে থাকি, তাহলে নারীরা তাদের তথাকথিত পুরুষালি গুণগুলো দমন করবে, আর পুরুষেরা তাদের তথাকথিত নারীসুলভ গুণগুলো দমন করবে।
সমস্যার শুরু সেখানেই।
আমাদের নিজেদের মধ্যে মানুষের সব গুণকে ফিরিয়ে আনতে হবে। বুঝতে হবে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই শক্তি ও কোমলতা, সাহস ও ভয়, যুক্তি ও আবেগ—সবই থাকতে পারে।
নিজেকে এভাবে টুকরো করে ফেলাই মানুষের ভেতরে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে। পরে সেই শূন্যতা পূরণ করতে কেউ সহিংসতা, মাদক, অতিরিক্ত কাজ কিংবা নানা ধরনের আসক্তির দিকে যেতে পারে।
প্রশ্ন: আত্মমর্যাদা কি সহিংসতা কমাতে পারে? নারী ও পুরুষের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
গ্লোরিয়া স্টেইনেম:
লিঙ্গভূমিকার পুরোনো ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তবে নারী ও পুরুষের পথ হয়তো একই রকম হবে না।
‘অন্যের সঙ্গে তুমি যেমন আচরণ পেতে চাও, তেমনই আচরণ করো’—এই পুরোনো নীতিটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নারীদের জন্য আরও একটি কথা জরুরি: আমরা যেমন অন্যদের যত্ন নিই, নিজেদেরও তেমন যত্ন নিতে হবে।
নিজেদের প্রতি সেই একই সম্মান দেখাতে হবে।
একই সঙ্গে আমাদের বুঝতে হবে, সবাই বদলাতে পারবে না। তাই আইন কার্যকর করতে হবে।
এই দেশে অপরাধ নিয়ে অনেক উদ্বেগ রয়েছে। কিন্তু নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে সেই উদ্বেগ সব সময় একই রকম দেখা যায় না। এটি বদলাতে হবে।
প্রশ্ন: দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে পুনঃশিক্ষা দরকার। কিন্তু এখনই কী করা যায়?
গ্লোরিয়া স্টেইনেম:
কিছু মানুষ বদলাতে পারে না। শৈশবের অভিজ্ঞতা, পারিবারিক পরিবেশ এবং বহু বছরের অভ্যাস তাদের আচরণকে এত গভীরভাবে প্রভাবিত করে যে পরিবর্তন কঠিন হয়ে যায়।
তাই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের পাশাপাশি এখনই সহিংসতার শিকার মানুষদের রক্ষা করতে হবে।
আইন প্রয়োগ করতে হবে। বর্তমানে আইনগুলো আগের চেয়ে অনেক ভালো। কিন্তু পুলিশ ও আদালতে সেই আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয় না।
শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার কোনো সন্তানের নির্যাতনকারী বাবা যদি সন্তানের হেফাজত চেয়ে আদালতে যায়, অনেক ক্ষেত্রে সেই বাবার কাছেই সন্তানকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এ ধরনের ঘটনায় আদালতের ভূমিকা ভয়াবহ হতে পারে।
আইন কার্যকর করার পাশাপাশি ধর্ষণ সংকটকেন্দ্রসহ ভুক্তভোগীদের সহায়তার সব ব্যবস্থায় অর্থ দিতে হবে।
আমাদের ভাষাও বদলাতে হবে। আমরা সব সময় বলি, ‘কত নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।’ কিন্তু আমাদের বলা উচিত, ‘কত পুরুষ ধর্ষণ করেছে।’
আমরা এমনভাবে নিষ্ক্রিয় বাক্য ব্যবহার করি, যেন ঘটনাটি নিজে থেকেই ঘটে গেছে। কিন্তু তা তো হয়নি। কেউ একজন এই অপরাধ করেছে। সেই মানুষটিকে চিহ্নিত করতে হবে এবং তার কাজের জন্য তাকে দায়ী করতে হবে।
অপরাধীরা তখনই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করে, যখন তাদের কাজের জন্য গুরুতর পরিণতি হয়।
আর ঘরোয়া সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা নারী ও শিশুদের জন্য আমাদের নিরাপদ আশ্রয় ও প্রয়োজনে নতুন জায়গায় বসবাসের সুযোগ তৈরি করতে হবে। কারণ এমন অনেক পুরুষ আছেন যারা একজন নারীকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তাকে অনুসরণ করেন, ভয় দেখান এবং তার পিছু ছাড়েন না।
প্রশ্ন: নারীর বিরুদ্ধে অপরাধকে কেন এতটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না?
গ্লোরিয়া স্টেইনেম:
এর অনেক কারণ আছে। একবার লং আইল্যান্ডে আমরা এমন পুরুষদের নিয়ে একটি গবেষণা করেছিলাম যারা স্ত্রী বা সঙ্গীকে মারধর করত। সেখানে দেখা যায়, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে পেশাটি ছিল, সেটি হলো পুলিশ কর্মকর্তা।
অর্থাৎ যারা আইন প্রয়োগ করার কথা, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ অপরাধী।
এর পেছনে শৈশবের অভিজ্ঞতাও থাকতে পারে। কেউ হয়তো নিজের শৈশবের যৌন নির্যাতন স্বীকার করতে চায় না। কেউ হয়তো নিজের সন্তানকে নির্যাতন করছে। আবার কেউ নিজের ভেতরের সত্যের মুখোমুখি হতে পারছে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংস্কৃতির নানা উপাদান। পর্নোগ্রাফি অনেক সময় নারীর ওপর আধিপত্যকে স্বাভাবিক করে দেখায়। টেলিভিশন, গানের কথা, অ্যালবামের প্রচ্ছদ—অনেক ক্ষেত্রেই নারীর প্রতি সহিংসতাকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়।
আমাদের যৌনতা ও সহিংসতাকে আলাদা করতে হবে।
বলতে হবে—ধর্ষণ কোনো যৌনতা নয়; এটি সহিংসতা।
যৌনতা হওয়া উচিত ভালোবাসা, ঘনিষ্ঠতা ও পারস্পরিক সম্মতির বিষয়। নারীর দাসত্ব বা নির্যাতনের চিত্রকে ভালোবাসা বা যৌনতার নামে উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
আমাদের গভীরভাবে যৌনতা, ঘনিষ্ঠতা ও সহিংসতার এই জট খুলে ফেলতে হবে।

প্রশ্ন: নারী-পুরুষের মধ্যে কি সত্যিই জন্মগত বা মস্তিষ্কভিত্তিক বড় পার্থক্য আছে?
গ্লোরিয়া স্টেইনেম:
যখনই সমাজে কোনো অগ্রগতি হয়, তখনই এক ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এখন আমরা মস্তিষ্কের পার্থক্য এবং নারী-পুরুষের আচরণগত পার্থক্য নিয়ে নতুন করে অনেক কথা শুনছি।
কেউ কেউ প্রাণীদের আচরণ দেখে মানুষের আচরণ ব্যাখ্যা করতে চান। কিন্তু মানুষকে শুধু প্রাণীর আচরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষ পরিবর্তনশীল। আমাদের টিকে থাকার অন্যতম কারণই হলো আমাদের অভিযোজন ক্ষমতা।
এমনকি কোনো পার্থক্য সত্য হলেও, তার অর্থ এই নয় যে সেটি চিরকাল একই থাকবে। আর ইতিহাসও দেখায়, সব সংস্কৃতিতে নারী-পুরুষ একইভাবে আচরণ করেনি।
প্রশ্ন: কিন্তু নারী ও পুরুষের মধ্যে তো কিছু জন্মগত পার্থক্য আছেই?
গ্লোরিয়া স্টেইনেম:
অবশ্যই কিছু পার্থক্য আছে। কিন্তু প্রজননের মতো নির্দিষ্ট কিছু বিষয় ছাড়া একজন নারী ও আরেকজন নারীর মধ্যে পার্থক্য যেমন অনেক বড় হতে পারে, তেমনি দুই পুরুষের মধ্যেও পার্থক্য অনেক বড় হতে পারে।
একই কথা জাতিগত পরিচয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাই কোনো গোষ্ঠীর মানুষকে একসঙ্গে বিচার করা ঠিক নয়। ব্যক্তিকে ব্যক্তি হিসেবে দেখতে হবে। এমনকি নারী ও পুরুষের কিছু বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বড় ধরনের মিল রয়েছে। তাই শুধু নারী বা পুরুষ হওয়ার ভিত্তিতে কারও ক্ষমতা, আচরণ বা মানসিকতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া অর্থহীন। আমাদের ব্যক্তিকে বিচার করতে হবে, কোনো গোষ্ঠীকে নয়।
প্রশ্ন: সংস্কৃতি কি জীববিজ্ঞানকেও বদলে দিতে পারে?
গ্লোরিয়া স্টেইনেম:
এখানে একটি মজার উদাহরণ আছে। দীর্ঘদিন ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার কিছু শিশু বেঁচে থাকার জন্য নিজেদের মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজের ভেতর একাধিক ব্যক্তিত্ব তৈরি করে।
কখনো সেই ব্যক্তিত্বগুলোর একটি বিপরীত লিঙ্গেরও হতে পারে। যেমন, কোনো ছোট ছেলে যদি একজন পুরুষের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে সে নিজের ভেতরে এমন একটি নারী-ব্যক্তিত্ব তৈরি করতে পারে, যার ওপর সেই নির্যাতন ঘটছে। আবার কোনো মেয়ের ভেতরে এমন একটি পুরুষ-ব্যক্তিত্ব তৈরি হতে পারে, যে তার জমে থাকা রাগকে প্রকাশ করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ব্যক্তিত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যক্রমের ধরনও বদলাতে পারে।
এর অর্থ হলো, সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতা ও জীববিজ্ঞান একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাংস্কৃতিক পরিবর্তন মানুষের আচরণও বদলাতে পারে।
প্রশ্ন: তাহলে সহিংসতা শুধু শাস্তি না দিয়ে কীভাবে কমানো যায়?
গ্লোরিয়া স্টেইনেম:
আমাদের ছেলেদের এমনভাবে বড় করা বন্ধ করতে হবে, যাতে তারা মনে করে পুরুষত্ব প্রমাণ করতে হলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, শক্ত হতে হবে এবং আবেগ প্রকাশ করা যাবে না।
একটি ছোট মেয়েকে জিজ্ঞেস করলে, বড় হয়ে সে কী হতে চায়, সে নানা ধরনের উত্তর দিতে পারে। কিন্তু একটি ছেলেকে যদি বলা হয়, ‘তুমি যদি মেয়ে হতে, কেমন লাগত?’ অনেক ছেলে এতে অস্বস্তি বোধ করে। কারণ ছোটবেলা থেকেই তার মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে—মেয়ে হওয়া মানে যেন নিচু হওয়া।
সে মনে করতে শেখে, ছেলে হতে হলে তাকে মেয়ের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হতে হবে। এই ধারণাটিই সমস্যার গভীরে রয়েছে।
প্রশ্ন: আপনি এখানে উটাহ রেপ রিকভারি সেন্টারের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এসেছেন। এমন কেন্দ্র কেন প্রয়োজন?
গ্লোরিয়া স্টেইনেম:
এই কেন্দ্র এই সম্প্রদায়ের জন্য জীবন রক্ষাকারী এবং সহানুভূতিশীল কাজ করেছে। যারা এখানে বছরের পর বছর নারীদের উদ্ধার, সহায়তা ও মানসিক সমর্থনের কাজ করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো কঠিন।
আমি চাই, সবাই বসে এখনই তাদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিক। তবে এই ২০ বছর পূর্তি আমরা আরেকভাবে উদ্যাপন করতে পারি—পুরুষদেরও পুরুষদের নিয়ে কাজ করতে হবে। দেশে এমন অনেক সংগঠন আছে যারা পুরুষদের নিয়ে কাজ করছে, যাতে পুরুষের সহিংসতা শুধু নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে নয়, অন্য পুরুষের বিরুদ্ধেও কমে।
এটাই হবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন—যদি আমরা এই সমস্যাকে আর শুধু নারীর সমস্যা হিসেবে না দেখি। অপরাধ কখনো ভুক্তভোগীর সমস্যা নয়। ভুক্তভোগী অপরাধ সৃষ্টি করেননি। এই ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য।
আগামী বিশ বছরে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে সেই পুরুষদের দিকে, যারা ধর্ষণ করছে, নির্যাতন করছে এবং সহিংসতা চালাচ্ছে। কারণ নারীকে শুধু নিরাপদ থাকতে শেখালে হবে না। যে সমাজে নারীর ওপর সহিংসতা তৈরি হয়, সেই সমাজকেও বদলাতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









