ব্যবসা পরিচালনায় জটিলতা কমিয়ে বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে কোম্পানি আইন-১৯৯৪ সংশোধনের উদ্যোগে ব্যবসায়ীদের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মতিঝিলে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) কার্যালয়ে কোম্পানি আইন ১৯৯৪-এর খসড়া সংশোধনী নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
প্রস্তাবিত সংশোধনী পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিতে ব্যবসায়ীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সময় দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘‘৩০ দিন কিংবা ৬০ দিন—যত সময় প্রয়োজন, ব্যবসায়ীরা নিতে পারবেন।’’ তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আরও বলেন, ‘‘মতামত দিতে ৩০ দিন লাগলে ৩০ দিন নেন, ৬০ দিন লাগলে ৬০ দিন নেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমাদের আরও এজেন্ডা আছে।’’ তার বক্তব্যে কোম্পানি আইন সংশোধনকে সরকারের বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির একটি অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
১৯৯৪ সালে প্রণীত কোম্পানি আইন এরই মধ্যে দুইবার সংশোধন করা হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘‘সময়ের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরন ও প্রয়োজনীয়তায় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনটিকে আরও আধুনিক, কার্যকর ও ব্যবসাবান্ধব করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ব্যবসা সহজীকরণে যেসব দেশ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তাদের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশে তা প্রাসঙ্গিকভাবে প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে।’’
প্রস্তাবিত সংশোধনী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘ব্যবসায়ীদের সামনে যে খসড়াটি উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাড়াহুড়া করে মতামত না দিয়ে প্রতিটি ধারা ভালোভাবে পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিতে হবে।’’ ব্যবসায়ীরা ৩০ দিন সময় চেয়েছেন—তারা সে সময় নিতে পারেন বলেও জানান তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘কোম্পানি আইন প্রণয়ন ও সংশোধনের পর এর বাস্তব প্রয়োগের বড় অংশই বেসরকারি খাতের ওপর বর্তাবে। ফলে আইনটি এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি না হয়। স্বচ্ছতা, সহজীকরণ ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করাই সংশোধনের অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।’’
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘সংশোধনী নিয়ে শুধু সাধারণ মতামত দিলেই হবে না বরং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে সুনির্দিষ্ট ও প্রয়োগযোগ্য প্রস্তাব দিতে হবে।’’ একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে সংশোধনীর প্রস্তাব করার আহ্বান জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ‘‘আপনারাও অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করে নেন যে আইন সংশোধন প্রস্তাব করবেন, সেটা অন্য দেশে কীভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে সেটা তুলনা করে নিয়ে প্রস্তাবনা দেন। আপনাদের পরামর্শের ভিত্তিতেই আমরা চেষ্টা করব এমন একটা কিছু বের করে আনতে, যা একটি ভালো ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হবে।’’
দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘‘অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে বেসরকারি খাত। বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা সম্প্রসারণে এ খাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই বেসরকারি খাতের বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। কোম্পানি আইন সংশোধনের ক্ষেত্রেও ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।’’
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে একটি ‘পরিবর্তন কাল’ হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, অর্থনীতি এখন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ সময়ে ধৈর্য ধরে সুপরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে। ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে সরকার ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’’
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রস্তুতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘আগামী তিন বছরে সরকারকে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। কোম্পানি আইন সংশোধন সেই বৃহৎ কর্মপরিকল্পনার অনেকগুলো উপাদানের মধ্যে একটি মাত্র। তাই একটি আইন সংশোধনের পাশাপাশি অর্থনীতির অন্যান্য প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রস্তুতির দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।’’
এছারাও সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘পর্যাপ্ত রিজার্ভ, ফিসক্যাল সারপ্লাস বা বাজেটারি সারপ্লাস না থাকা এবং সীমিত সম্পদের মধ্যে সরকারকে কাজ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতও নানা ধরনের অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘এটা এমন একটা পরিবর্তনকাল আমাদের সবার জন্য, যখন মাথা ঠান্ডা রেখে একটা ভালো পরিকল্পনা নিয়ে এই সময়টা পার হতে হবে এবং একটি বাস্তব ও টেকশই ভবিষ্যৎ এর জন্য কার্যকর ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে।’’
মুক্ত আলোচনায় যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) অতিরিক্ত নিবন্ধক মো. নূর-ই-আলম বলেন, ‘‘শুধু আইন সংশোধন করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। আরজেএসসির অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা বা ইন্টেলেকচুয়াল ক্যাপাসিটিও উন্নত করতে হবে।’’
তিনি জানান, এছাড়াও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনলাইনে আরজেএসসিতে জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর। একই সঙ্গে আরজেএসসির কার্যক্রম পরিচালনায় কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন তিনি।
মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআই প্রশাসক ফজলুল হক। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এমসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবির।
এ সময় উক্ত সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ, বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ), এপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, বারবিডার সভাপতি আবদুল হক এবং ট্রান্সকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমানসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









