গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্পে বিদেশি কর্মকর্তা ছাড়াই দেশের দক্ষ ও মেধাবী জনশক্তি দিয়ে শতভাগ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর বিজয় সরণির নভোথিয়েটারের একটি হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘ইনোভেশন ইন অ্যাপারেল অ্যান্ড টেক্সটাইল: ড্রাইভিং কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড গ্রোথ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
মাহদী আমিন বলেন, “প্রায় অর্ধশতাব্দীর পুরোনো বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিভিন্ন কারখানা ও বায়িং হাউজে এখনো ক্ষেত্রবিশেষে বিদেশি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ দেশের মানুষের মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে পুরো শিল্প পরিচালনা করা সম্ভব।”
তিনি বলেন, “শুধু দেশের অভ্যন্তরে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়াই সরকারের লক্ষ্য নয়। বাংলাদেশের মেধাবী ও দক্ষ পেশাজীবীদের এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের উচ্চ পদে নিয়োগ দিতে আগ্রহী হয়। এ জন্য টেকসই শিক্ষাব্যবস্থা ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।”
তরুণদের কর্মসংস্থান ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিকে সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, “জনগণের বিপুল সমর্থনে দায়িত্ব পাওয়া সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে টেকসই শিল্প প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।”
শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষে যেন দেশের ভেতরে সম্মানজনক জীবিকা অর্জনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও নিজেদের চাহিদাসম্পন্ন করে তুলতে পারে, সে ধরনের কর্মসংস্থান তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এ কারণে সরকার কারিগরি শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলেও জানান মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, “সরকার এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধের পাশাপাশি পেশাগত দক্ষতা ও যোগাযোগের সক্ষমতাও তৈরি হবে। শিল্প ও শিক্ষাঙ্গনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে পাঠ্যক্রম সংস্কারের কাজ চলছে।”
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্প বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে আবেগ ও অনুভূতির গুরুত্বপূর্ণ জায়গা বলেও মন্তব্য করেন মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, “বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশে তৈরি পোশাক শিল্পের মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তার দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি এবং নগদ প্রণোদনার মতো নীতি চালু হয়, যা পরবর্তীতে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”
পোশাক খাতে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, “দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। গ্রামের একজন তরুণীর তৈরি পোশাক বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে প্রতিনিধিত্ব করছে।”
তার মতে, এ কারণে তৈরি পোশাক শিল্প শুধু দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি নয়; এটি জাতীয় ঐতিহ্য, আবেগ এবং লাখো শ্রমিকের ত্যাগ ও শ্রমের প্রতীক।
মাহদী আমিন বলেন, “জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে তৈরি পোশাক শিল্পের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত সাত মাসে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা, উদ্যোক্তাদের কাছে সহজে প্রণোদনা পৌঁছে দেওয়া এবং নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে শিল্পকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
বিজিএমইএ ও বিটিএমএসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা নিয়মিত সংলাপ ও মতবিনিময় করছেন বলেও জানান তিনি।
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে এগিয়ে নিতে গবেষণা, উন্নয়ন ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। তবে উৎপাদন সক্ষমতা ও দক্ষতার জায়গায় আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে।”
এ জন্য দক্ষ শ্রমশক্তি, আধুনিক যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও উন্নত ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নকশায় নতুনত্ব আনতে প্রতিটি কারখানায় গবেষণা সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রযুক্তিনির্ভর যুগে বাংলাদেশকে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে, তবে এর উদ্দেশ্য হতে হবে কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এমনটাই বলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র।
তিনি বলেন, “প্রযুক্তির অজুহাতে কোনোভাবেই শ্রমিকদের কর্মসংস্থান কেড়ে নেওয়া সমীচীন নয়। মেহনতি মানুষের ত্যাগ ও শ্রমের ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক পোশাক শিল্পে অবস্থান তৈরি করেছে। তাই প্রযুক্তি ও মানবসম্পদের মধ্যে সঠিক সমন্বয় করাই সরকারের লক্ষ্য।”
পোশাক শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিশেষায়িত কোর্স চালুর আহ্বান জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, “বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও এক বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম চালু করা প্রয়োজন। এতে উচ্চশিক্ষিত তরুণরা এ শিল্পে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবেন।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক শিক্ষার সঙ্গে কারখানার বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। শিক্ষার্থীদের জন্য কারখানা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপের সুযোগ এবং শিল্পের সফল ব্যক্তিদের ক্যাম্পাসে গিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি তরুণদের জন্য নিয়মিত ক্যারিয়ার মেলা ও দিকনির্দেশনামূলক কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
তরুণ উদ্ভাবকদের রাষ্ট্রীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়ে মাহদী আমিন বলেন, “নতুন স্টার্টআপ প্রকল্পে প্রাথমিক মূলধন ও তহবিল দেওয়ার বিষয়টি সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।”
দীর্ঘদিনের সংকট ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার অভাবে অনেক কাজ থেমে ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, “স্বল্প সময়ে সব সমস্যা পুরোপুরি দূর করা কঠিন। তবে সীমাবদ্ধতাকে শক্তিতে পরিণত করতে সরকারের আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার কোনো ঘাটতি নেই।”
‘ওয়ান নেশন, ওয়ান ইনোভেশন’ স্লোগানের লক্ষ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিপুল তরুণ শক্তি ও উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাবে। সরকার সহায়ক ও যুগোপযোগী নীতি প্রণয়ন করবে এবং বেসরকারি খাত তা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব ও জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।”
একটি শিল্প এককভাবে সফল হতে পারে না মন্তব্য করে মাহদী আমিন বলেন, “টেকসই সাফল্যের জন্য প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ একটি ইকোসিস্টেম, যেখানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ একসঙ্গে কাজ করবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড, পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানা মালিক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি, ব্যাংকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের একই আলোচনায় আনা হয়েছে, যা একটি পূর্ণাঙ্গ ‘৩৬০ ডিগ্রি’ উদ্যোগ।”
অনুষ্ঠানে তরুণদের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “এই তরুণরাই শুধু তৈরি পোশাক শিল্প নয়, পুরো বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার মূল শক্তি।”
আলোচনায় বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস, এক্সপোর্ট বন্ড ও আইটি বিভাগের সদস্য ফারজানা আফরোজ, বিইউএফটির উপাচার্য ইঞ্জিনিয়ার ড. আইয়ুব নবী খান, এইচ অ্যান্ড এমের রিজিওনাল কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউর রহমান, এইচএসবিসি বাংলাদেশের কর্পোরেট অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিং ও গ্লোবাল নেটওয়ার্ক ব্যাংকিংয়ের কান্ট্রি হেড শাদাব হোসেন এবং এইচএসবিসি বাংলাদেশের হেড অব গ্লোবাল অ্যাপারেল সাপ্লাই চেইন আশফাকুর রহমান অংশ নেন।
এর আগে শনিবার সকালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ‘ইনোভেট টু মার্কেট’ প্রতিপাদ্য নিয়ে তিন দিনব্যাপী আয়োজিত মেলার দ্বিতীয় দিনে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা শেষে মাহদী আমিন মেলায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। মেলায় সরকারি-বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ৭৩টি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, স্বতন্ত্র গবেষক, শিক্ষার্থী, নতুন স্টার্টআপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা অংশ নিয়েছেন। প্রযুক্তি, ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশসহ বিভিন্ন খাতের এক হাজারের বেশি নতুন ও সম্ভাবনাময় উদ্ভাবন মেলায় প্রদর্শিত হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









