বিমানবাহিনীর চাকরিচ্যুত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি পরিবার। তবে মামলা করা বা না করার বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে সরকারের নিজস্ব আইনে ছেলের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম।
এদিকে তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে উদ্ধার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া তার ‘জুনিয়র বন্ধু’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করছেন তদন্তকারীরা।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দুপুরে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম বলেন, ‘আমরা পারিবারিকভাবে এখনো কোনো ধরনের মামলা করার সিদ্ধান্ত নিইনি। মামলা করব কি না, সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়নি। আজ আমাদের নানা ব্যস্ততা আছে। হয়তো আজ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারব না। তবে আমরা চাই, থানায় গিয়ে দুই কলম কী লিখলাম বা না লিখলাম, সেটির ওপর সরকার গুরুত্ব না দিয়ে নিজস্ব আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিক।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলে এ দেশের একজন সুনাগরিক ছিলেন। সশস্ত্র বাহিনীর একজন সদস্যও ছিলেন। তার এ ধরনের মৃত্যুর যেন সুষ্ঠু তদন্ত হয় এবং প্রকৃত কারণ বের হয়ে আসে। আমরা মামলা করছি কি না, সেটির ওপর নজর না দিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব বাহিনী যেন বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে।’
এদিকে, উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিব জানিয়েছেন, তাহসিফের বাবাকে ফোন করে থানায় এসে মামলা করার জন্য বলা হয়েছিল। তবে তিনি এখনো থানায় আসেননি। তিনি এলে থানায় মামলা করা হবে বলে জানান ওসি।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তার সঙ্গে নিখোঁজ হওয়ার আগে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটানো দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে পিবিআই। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় দীপকে পিবিআই সদস্যরা নিয়ে গেছেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানেন না বলেও জানান তিনি।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাড়ির তৃতীয় তলা থেকে দীপকে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দীপ ওই এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজার ছেলে।
এদিকে, শুক্রবার সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করে পিবিআই। মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে মোটরসাইকেলটি পাওয়া যায়। পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছি।’
তবে উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটি তাহসিফের কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ।
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগের সময়ের সিসিটিভি ফুটেজে তাকে এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা যায়। পরিবারের সদস্যরা ওই ব্যক্তিকে দীপ হিসেবে শনাক্ত করেন। ফুটেজে দেখা যায়, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে তাহসিফের সঙ্গে ওই ব্যক্তির দেখা হয়। এ সময় তারা পরস্পরের সঙ্গে হাত মেলান। পরে দুটি পৃথক মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে চলে যান।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপের ফোন পেয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। পরে দীপ তাদের জানিয়েছিলেন, তাহসিফের মোটরসাইকেলে সমস্যা দেখা দেওয়ায় সেটি মেরামত করতে তারা একটি ওয়ার্কশপে যান। মোটরসাইকেল মেরামতের পর তারা বাসায় ফিরে একসঙ্গে খাবার খান। পরে দীপ চলে যান বলে পরিবারের সদস্যদের জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার রাতে দীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর তাকে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়। জিজ্ঞাসাবাদে দীপের দেওয়া বক্তব্যসহ পাওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করছে তদন্ত সংস্থা। পিবিআই প্রধান মোস্তফা কামাল বলেন, ‘দীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর আমরা বেশ কিছু তথ্য পেয়েছি।’ তবে তদন্তের স্বার্থে এসব তথ্য এখনই প্রকাশ করতে চাননি তিনি।
গত ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ি ঘাট এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেন। হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে মরদেহটি তাহসিফের বলে শনাক্ত করা হয়।
পরদিন বৃহস্পতিবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তার বাবা ছেলের মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে হত্যার আশঙ্কা জানিয়েছিলেন। তবে এ ঘটনায় দীপের কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তদন্তের মাধ্যমে তা উদ্ঘাটনের অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









