আজ রবিবার ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারীর কাজের স্বীকৃতি প্রদান, সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, সাফল্য উদযাপন ও নারীদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদানের উদ্দেশে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে দিনটি পালন করা হয়। বাংলাদেশেও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন ও সংস্থা দিবসটি পালনে যথাযথ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। দিবসটি উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণী দিয়েছেন।
বাণীতে তিনি বলেন, আমি বিশ্বের সকল নারীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন নারীর অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। এ প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে বলে আমি মনে করি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে নারী-পুরুষ সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে। সম্মান ও মর্যাদা এবং নিরাপত্তা নিয়ে পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজে কাজ করবে। আমাদের বিদ্যমান সমাজে সমতা হোক অঙ্গীকার, মর্যাদা হোক বাস্তবতা, আর ক্ষমতায়ন হোক উন্নয়নের ভিত্তি। আমি ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’উপলক্ষ্যে গৃহীত সকল কর্মসূচির সফলতা কামনা করছি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ নারী শ্রমিকদের কাঁধে দাঁড়িয়ে আছে। তৈরি পোশাক, কৃষি, চা–বাগান, গৃহকর্ম, নির্মাণ, হোটেল-রেস্তোরাঁ, এমনকি আইটি বা সেবা খাতেও নারী অগ্রগতি ও টিকে থাকার প্রতীক। অথচ এই নারীরাই কর্মক্ষেত্রে নানাবিধ বৈষম্যের শিকার। মজুরি, নিরাপত্তা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, নেতৃত্ব বা সামাজিক মর্যাদা—সবখানেই তাঁদের ঘিরে রেখেছে অদৃশ্য দেয়াল। এই বৈষম্য শুধু লিঙ্গভিত্তিক নয়, এটি শ্রেণি, কাঠামো আর মানসিকতার প্রতিফলন; রাষ্ট্রীয় নীতি, শ্রমবাজার ও সমাজের প্রতিটি স্তরে যা বিদ্যমান।
বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন দৈনিক এদিনকে বলেন, যে কথাগুলো আমরা দেড় বছর আগে জুলাই অভ্যুত্থানে রাস্তা-ঘাটে মিছিলে মিছিলে শুনেছিলাম- বৈষম্য নিরসন করার কথা। গত দেড় বছরে কত কিছু ঘটে গেল কিন্তু বৈষম্য নিরসনের কথা আমরা আর শুনলাম না। ফলে রাস্তা-ঘাট জনপরিসরে, কর্মক্ষেত্রে এবং পরিবারে বৈষম্য যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেছে। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। নারী দিবসে আমরা অবশ্যই নির্যাতনের কথা বলব, কিভাবে নির্যাতন প্রতিরোধ করা যায় সেটা আলোচনা করব। কিন্তু একই সাথে আমাদের নারীদের দৈনন্দিন যে সংকট শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের সংকট নিরসনের কথাও বলতে হবে।
নারী উন্নয়ন শক্তির নির্বাহী পরিচালক এবং ডিডব্লিউইএবির সভাপতি ড. আফরোজা পারভীন এদিনকে বলেন, নারীর নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে নারী উন্নয়ন, দক্ষতা প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষায় বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা জরুরি। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, আইনি সহায়তা এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সম্প্রসারণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
নারী নেত্রী ও সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার এদিনকে বলেন, নারীর সংগ্রামটা রাজনৈতিক এবং আগামীর বাংলাদেশ আমরা কেমন দেখতে চাই, সেটাও একটা রাজনৈতিক প্রশ্ন। নারী মুক্তি থেকে শুরু করে বৈষম্য বিলোপ এবং একটি গণতান্ত্রি সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণে, এই আদর্শিক অঙ্গীকার সম্পন্ন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা ছাড়া ভিন্ন কোন পথ নেই। তিনি সকলকে সেই লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণী ভূমিকায় নারীদের আরও সুযোগ দিতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক আলোচনায় ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়। নারীদের ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে বিএনপির এই নেত্রী বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন দীর্ঘদিন ধরেই তার দলের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। ক্ষমতায়ন অর্থবহ করতে হলে তৃণমূল পর্যায় থেকে তা শুরু করতে হবে। প্রতিমন্ত্রী নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ ও অনলাইন হয়রানি মোকাবিলায় সরকারি সংস্থা, এনজিও ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন।
তিনি বলেন, আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। তাদের পিছিয়ে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকারের নীতিমালা নারী ক্ষমতায়ন ও নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে বলে প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন। নারীদের যাতায়াত নিরাপদ করতে আলাদা বাস সার্ভিস চালুর মতো উদ্যোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। নারীর সুরক্ষা, ক্ষমতায়ন ও সমান অংশগ্রহণ অগ্রাধিকার হিসেবে থাকবে বলে তিনি জানান।
১৮৫৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নারী শ্রমিকদের হাত ধরেই সূচনা ঘটে নারী দিবসের। নারীর ক্ষমতায়ন ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় কয়েকজন সাহসী নারী এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। প্রায় ১৫ হাজার নারী সেদিন নিউইয়র্ক সিটির রাস্তায় নেমেছিলেন। নারীর অধিকার রক্ষার আন্দোলন করেছিলেন তারা।
বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর পালন করা হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্ক সিটিতে প্রথম নারী দিবস পালন করা হয়। এটি জাতীয় নারী দিবস হিসেবে পরিচিত ছিল। অ্যাক্টিভিস্ট থেরেসা মালকিয়েলের পরামর্শে আমেরিকার সোশ্যালিস্ট পার্টি এই তারিখে দিনটি উদযাপন করে। ১৯১০ সালের আগস্টে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে জার্মান রাজনীতিবিদ ও সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন প্রতি বছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয়-১৯১১ সাল থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে।
বিশ্বব্যাপী নারীর অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও বৈষম্যের চিত্র এখনো স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে নারীরা গড়ে পুরুষদের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম মজুরি পান। কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্বের অবস্থানেও নারীর অংশগ্রহণ সীমিত। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৩ বলছে, বর্তমান গতিতে অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক লিঙ্গসমতা অর্জনে সময় লাগতে পারে ১৩০ বছরেরও বেশি। রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও একই চিত্র।
ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব সংসদগুলোতে নারী সদস্যের হার এখনো ৩০ শতাংশের নিচে। যদিও কিছু দেশে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান হিসেবে নারীর নেতৃত্ব বৈশ্বিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি করেছে। বাংলাদেশেও সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ৭জন নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আর সরকারের মন্ত্রিসভায় মাত্র ৩ জন নারী স্থান পেয়েছেন। দীর্ঘ দিনের রেওয়াজ ভেঙ্গে এই প্রথম দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী দলীয় নেতার পদে নারী নেই। এর আগে প্রায় ৩৫ বছর ধরে বাংলাদেশের সরকার ও বিরোধী দলের আসনে ছিলেন দুজন নারী নেত্রী। প্রশাসনে সচিব পর্যায়ে আগে নারীর সংখ্যা বেশ আশানুরূপ থাকলে বর্তমান সময়ে এসে কমেছে সেই সংখ্যা। বর্তমানে সরকারের ৬৮জন সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র ১২জন নারী সচিব রয়েছে। যা আগের তুলনায় কম।
শিক্ষা খাতে অগ্রগতি তুলনামূলক ইতিবাচক। ইউনেস্কোর তথ্য বলছে, প্রাথমিক শিক্ষায় বিশ্বব্যাপী ছেলে-মেয়ের ভর্তির হার প্রায় সমতায় পৌঁছেছে। তবে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী পদে নারীর উপস্থিতি এখনো কম। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির মতে, লিঙ্গ বৈষম্য কমানো গেলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি যোগ করতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর অংশগ্রহণ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৬০ শতাংশ কর্মী নারী, যা দেশের রপ্তানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় লিঙ্গসমতা অর্জনে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও নারীর নেতৃত্ব দেশকে বৈশ্বিক আলোচনায় এনেছে। তবে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার পুরুষদের তুলনায় এখনো অনেক কম। একই সঙ্গে পারিবারিক সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং সাইবার হয়রানির মতো বিষয়গুলো উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে এসব চ্যালেঞ্জের ধারাবাহিকতা উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীর ক্ষমতায়ন কেবল অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমান মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৫ নম্বর লক্ষ্য লিঙ্গসমতা অর্জন এবং সকল নারী ও কন্যাশিশুর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়, যার লক্ষ্য সময়সীমা ২০৩০ সাল।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে সমঅধিকার, ক্ষমতায়ন ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি শুনতে পাওয়া যায় প্রতি বছর। তবে দিবসের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে বাংলাদেশের নারীর বাস্তবতা বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার কর্মজীবী নারীদের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায় অগ্রগতির পাশাপাশি কাঠামোগত বৈষম্য ও নিরাপত্তা ঘাটতি এখনো দৃশ্যমান রয়েছে। মজুরি বৈষম্যেও দেখা গেছে সমকাজে কম পারিশ্রমিক। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও জাতীয় জরিপ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীরা গড়ে পুরুষের তুলনায় ২০–২৫ শতাংশ কম মজুরি পান। কিছু খাতে এ ব্যবধান আরও বেশি।
রাজধানী ঢাকায় কর্মজীবী নারীদের বড় অংশ গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন ও গবেষণায় দেখা গেছে, গণপরিবহনে চলাচলকারী নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে মৌখিক, শারীরিক বা মানসিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। যদিও গণপরিবহনে সংরক্ষিত আসন, হেল্পলাইন (যেমন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯) এবং আইনগত সুরক্ষা রয়েছে, বাস্তবায়নে ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে- বাধ্যতামূলক সিসিটিভি, জিপিএস মনিটরিং, তাৎক্ষণিক অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা এবং দ্রুত তদন্ত ও বিচার এই ব্যাপারগুলি নিশ্চিত না হলে কার্যকর প্রতিরোধ সম্ভব নয়।
তাহমিনা বেগম ছিলেন বেসরকারি উন্নয়নমূলক সংস্থা ব্যুরো বাংলাদেশের সিনিয়র ম্যানেজার। বিদেশে স্বামীর পদায়নের কারণে চাকরি ছাড়তে হয় তাকে। তিন বছর পর আবার কর্মজীবনে ফিরতে চান তিনি। কিন্তু চাকরির বাজারে ঘুরে দেখেন তার জন্য চাকরি নেই। তাহমিনার ভাষ্যমতে, বাজারে চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও ভালো নয়। চাকরিতে বিরতির পর কোথাও জীবনবৃত্তান্ত দিলে সাক্ষাৎকারে প্রথম প্রশ্ন থাকে, ‘আপনি এতদিন ব্রেকে ছিলেন, সব তো ভুলে গেছেন।’আমাদের চাকরিদাতাদের মানসিকতা অনেক বড় ব্যাপার। তাদের একটু এগিয়ে আসা দরকার। আমরা তো কাজ করেছি, স্কিল আছে। সুযোগটা দেওয়া প্রয়োজন। আমি তো পারিবারিক সমস্যা কাটিয়ে উঠেছি এবং নিজেকে প্রস্তুত করেছি। বলছিলেন তাহমিনা। তিনি আরও বলেন, পরিবার থেকেও বিভক্ত প্রতিক্রিয়া এসেছে। পরিবারে দুই ধরনের লোক আছে। অনেকে চান না আমি আবার ফিরি। আবার কেউ কেউ বুলিংও করছেন।
মনিষা দেব বর্মণ ২০১৮ সাল থেকে ব্র্যাকের মাইক্রো ফাইন্যান্স প্রগতি বিভাগে কাজ করতেন। সন্তান হওয়ায় সেই চাকরি ছেড়ে তিন বছর ছয় মাসের বিরতি নেন। এখন কর্মক্ষেত্রে ফিরতে চাইলেও নানান অজুহাতে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাকে। মনিষার ভাষ্যমতে, বাচ্চার কারণে চাকরি ছেড়েছি। এজন্য তারা বলে— ‘আপনি এখন আর ইফিশিয়েন্ট নন। বাচ্চাকে নিয়ে যে কোনো সমস্যা হতে পারে, তখন কী হবে?’ মনিষা বলেন, “মাইক্রোফাইন্যান্স ছাড়া অন্য কোথাও যেতে চাইলেও নিচ্ছে না। তারা বলে— ‘আপনি একটা বাচ্চার কারণে জব ছেড়ে দিয়েছেন, আরেকটা বাচ্চা হলেও তো আবার ছেড়ে দেবেন।’ তখন আবার আমাদের নতুন লোক নিতে হবে। তাই আপনাকে না নেওয়াই বেটার’।
শারমিন আক্তার বৃষ্টি কাজ করতেন সিপিডিতে। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণে তাকে চাকরি ছাড়তে হয়। তিনি এদিনকে বলেন, আমার উচ্চ ডায়াবেটিস ছিল, আর বাসা থেকে অফিসও ছিল অনেক দূরে। সিনিয়র সহকর্মীরা সমস্যা বুঝে সহজেই চাকরি ছাড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। চাকরির ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও এখন আবার ফিরে আসার পথে বড় বাধা দেখছেন শারমিন। বলেন, বাচ্চার জন্য ডে কেয়ার পাওয়া কঠিন। চাকরিদাতারাও জিজ্ঞেস করেন— ‘এক বছরের বাচ্চা রেখে আপনি পারবেন?’ আসলে আমাদের দুই পক্ষকেই এ পরিবেশটা দিতে হবে। একইভাবে সাদিয়া সিদ্দিকা কাজ করতেন ব্র্যাকে। মা হওয়ার পরে ২০২৩ সালে চাকরি ছাড়েন। এখন ফিরতে চান। কিন্তু তার ভাষ্য, যে অবস্থান থেকে চাকরি ছেড়ে আসছি, আবার সেখানে ফেরা খুব কঠিন।
এটা তাহমিনা, মনিষা, শারমিন ও সাদিয়ার শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয় বরং শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ কমার নিয়মিত চিত্র। কয়েক বছর ধরে পুরুষের তুলনায় নারীদের শ্রমশক্তি বেশি কমছে।
শ্রমশক্তি জরিপের চিত্র
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের শ্রমশক্তির সংখ্যা ৭ কোটি ১৭ লাখ ১০ হাজার। আগের বছর ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরে শ্রমশক্তি কমেছে প্রায় ১৭ লাখ ৪০ হাজার। এই সময়ে পুরুষ শ্রমশক্তি কমেছে প্রায় এক লাখ এবং নারী শ্রমশক্তি প্রায় ১৬ লাখ ৪০ হাজার। ২০২৩ সালে শ্রমশক্তিতে পুরুষের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৮১ লাখ ২০ হাজার, আর নারী ছিল ২ কোটি ৫৩ লাখ ৩০ হাজার। ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পুরুষ শ্রমশক্তি বেড়েছে প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার। বিপরীতে একই সময়ে নারীদের অংশগ্রহণ কমেছে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার। ২০২২ সালে নারীর শ্রমশক্তি ছিল ২ কোটি ৫৭ লাখ ৮০ হাজার, যা দুই বছরে নেমে এসেছে ২ কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজারে। শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হারেও নারী অনেক পিছিয়ে। ২০২৪ সালে পুরুষের অংশগ্রহণের হার ৭৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ হলেও নারীদের হার মাত্র ৩৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। ২০২২ সালে এই হার ছিল ৪২ দশমিক ৭৭ শতাংশ— অর্থাৎ মাত্র দুই বছরে নারীদের অংশগ্রহণ কমেছে প্রায় ৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
শ্রমশক্তির বাইরে নারীর সংখ্যা বেড়েছে
শ্রমশক্তির বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বছর বছর বাড়ছে। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা বাড়ছে আরও বেশি। বিবিএসের জরিপে দেখা যায়, ২০২২ সালে শ্রমশক্তির বাইরে ছিল ৪ কোটি ৬৩ লাখ ২০ হাজার জন। ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয় ৪ কোটি ৭১ লাখ ৭০ হাজার জন এবং ২০২৪ সালে হয় ৫ কোটি ৪০ হাজার জন। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের ব্যবধানে শ্রমশক্তির বাইরে নারীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৩ লাখ ৭০ হাজার, যেখানে পুরুষ বেড়েছে ৫ লাখ। ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের ব্যবধানে নারীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার। কাজে নিয়োজিতদের মধ্যে ২০২৪ সালে পুরুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৬২ লাখ ২০ হাজার এবং নারীর সংখ্যা ২ কোটি ২৮ লাখ ৭০ হাজার। অর্থাৎ, পুরুষের তুলনায় নারীর কর্মসংস্থান প্রায় অর্ধেক।
কর্মক্ষেত্রে হয়রানি প্রতিরোধ: আইনি কাঠামো ও বাস্তবতা
বাংলাদেশে হাইকোর্টের নির্দেশনা (২০০৯) অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি থাকা বাধ্যতামূলক। তবে শ্রম ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অনেক প্রতিষ্ঠানে এই কমিটি কাগজে-কলমে থাকলেও কার্যকর নয়। কর্মক্ষেত্রে হয়রানির অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে কম নথিভুক্ত হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামাজিক চাপ, চাকরি হারানোর ভয় ও প্রমাণের জটিলতার কারণে অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না।
কর্মজীবী মা: ডে-কেয়ার ও মাতৃত্ব সুবিধা
সরকারি বিধিমালায় নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার সুবিধা রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ অফিসে এ সুবিধা অনুপস্থিত। বিবিএস ও শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, শিশু যত্নের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বহু নারী চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন বা কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেন—যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের আয় ও ক্যারিয়ারে প্রভাব ফেলে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: অগ্রগতির সূচক
বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের ভর্তি ও উপস্থিতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ হার প্রায় সমান বা কিছু ক্ষেত্রে বেশি। স্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য—মাতৃমৃত্যুর হার গত দুই দশকে বড় আকারে কমেছে (জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে উল্লেখিত)। তবে গ্রাম-শহর বৈষম্য এখনো রয়ে গেছে।
সহিংসতা ও ডিজিটাল ঝুঁকি
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনক। পারিবারিক সহিংসতা থেকে শুরু করে সাইবার হয়রানি—ঝুঁকির ধরন বহুমাত্রিক। প্রযুক্তি ব্যবহারের বিস্তার ঘটলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা ও আইনি সচেতনতা এখনো সীমিত।
নারীরা কেন কর্মজীবন ছাড়ছেন
বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে প্রতি চারজন নারীর মধ্যে একজন কর্মস্থলে আর ফিরে যেতে পারেন না। এর মূল কারণগুলো হলো—
পারিবারিক চাপ: শিশুসন্তানের নিরাপত্তা, লালন-পালন ও যত্নের দায়িত্ব নারীদের কর্মক্ষেত্রে মনোযোগ দিতে বাধা দেয়।
যানবাহন সুবিধার অভাব: নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবহন না থাকায় কর্মস্থলে যাতায়াতে সমস্যা হয়।
বিরূপ কর্মপরিবেশ: অনেক কর্মস্থলে নারীবান্ধব পরিবেশের অভাব থাকে, যা তাদের চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য করে।
কিছু নারী পারিবারিক ও সামাজিক চাপের কারণে চাকরি ছেড়ে দেন। কেউ কেউ চাকরি ও সংসারের ভারসাম্য রক্ষার চাপে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কেউ কেউ হতাশা থেকে আত্মহত্যার কথাও ভেবেছেন বলে জানিয়েছেন।
সমাধানের উপায়
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত সহযোগিতার মাধ্যমে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব। শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের বিস্তৃত ব্যবস্থা, নিরাপদ পরিবহন, নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ; এসব নিশ্চিত করলে নারীকর্মী চাকরিতে স্থায়ীভাবে ফিরে আসতে এবং পেশাজীবনে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবেন।
ব্র্যাকের পিপল কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশনের ঊর্ধ্বতন পরিচালক মৌটুশি কবির এদিনকে বলেন, কর্মজীবন থেকে বিরতি নেওয়া নারীদের জন্য ডে কেয়ার ব্যবস্থা খুবই জরুরি। ব্রিজ রিটার্নশিপ কার্যক্রমের মাধ্যমে এসব নারীর কর্মজীবনে ফেরার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। এটি শুধু নারীদের নয়, তাদের সন্তানদেরও দীর্ঘমেয়াদি উপকার করবে। আমাদের লক্ষ্য হলো পরিবার ও পেশাজীবনের ভারসাম্য বজায় রেখে নারীদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
স্কয়ার ফুড ও বেভারেজ লিমিটেডের মানবসম্পদ প্রধান মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম খান এদিনকে বলেন, নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা ও নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করলে নারীরা কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে আসবে। প্রয়োজন হলে ওয়ার্ক ফ্রম হোম ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। নারীরা সঠিক পরিবেশ পেলে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ শাইখ ইমতিয়াজ এদিনকে বলেন, সন্তান পালনসহ সংসারের সব কাজ সমানভাবে ভাগ করা উচিত। আমাদের প্রচলিত ধারণায় সব দায়িত্ব নারীর ওপর চাপানো হয়, যার ফলে নারীরা কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র সব জায়গায় প্রতিষ্ঠা করা। এটি না হলে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব নয়।
৮ মার্চ কেন নারী দিবস পালিত হয়?
১৯১৪ সালে জার্মানিতে প্রথমবার ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়। জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন শুরু করে। ১৯৭৭ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মত হয় যে প্রতি বছর ৮ মার্চ দিনটি ব্যাপকভাবে পালন করা হবে। ১৯৯৬ সাল থেকে জাতিসংঘ প্রতি বছর নারী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ঘোষণা করে আসছে। নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সাফল্যগাথা ও লিঙ্গ সমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রাধান্য দিয়ে করা হয় এসব প্রতিপাদ্য। ১৯৭৫ সালে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র পালন করে নারী দিবস। ১৯৭৭ সালে জাতিসংঘ সদস্য দেশকে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বশান্তির লক্ষ্যে দিবসটি উদযাপনের আহ্বান জানানোর পর থেকে ৮ মার্চ বিশ্বব্যাপী পালিত হয় দিবসটি। বিশ্বের অনেক দেশে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার লাভের পূর্ব থেকেই এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









