বাংলা সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রের কথা উঠলে যে কয়েকটি নাম সবার আগে আসে, তাদের মধ্যে অন্যতম হুমায়ূন আহমেদ। তিনি শুধু একজন লেখক ছিলেন না, ছিলেন একটি প্রজন্মের আবেগ। তার লেখা পড়ে মানুষ যেমন হেসেছে, তেমনি কেঁদেছেন। জীবনের ছোট ছোট ঘটনা, সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ আর সম্পর্কের গল্প তিনি এমনভাবে লিখেছেন— যেন আমাদের জীবনের গল্পই।
আজ তার মৃত্যুর অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, মানুষের ভালোবাসা যেন ততই বেড়েছে। বইমেলায় এখনও তার বইয়ের স্টলের সামনে ভিড় দেখা যায়। নতুন প্রজন্মের পাঠকরাও আগ্রহ নিয়ে পড়ছে তার লেখা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জন্ম কিংবা মৃত্যুবার্ষিকী এলেই হাজারো মানুষ স্মৃতিচারণ করেন। অনেকেই বলেন, হুমায়ূন আহমেদ নেই, কিন্তু তার সৃষ্টি আজও জীবন্ত।
১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। ছোটবেলা থেকেই বইয়ের প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ। পড়াশোনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে এবং সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু লেখালেখির প্রতি ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে যায় ভিন্ন সাহিত্যের জগতে। শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখি শুরু করতে থাকলেও একসময় পুরোপুরি সাহিত্যেই নিজেকে নিবেদিত করেন। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’। প্রথম উপন্যাসেই পাঠকের নজর কাড়েন। এরপর একের পর এক উপন্যাস, গল্প, নাটক, শিশুতোষ বই, বিজ্ঞানবিষয়ক লেখা, ভ্রমণকাহিনী—সব মিলিয়ে দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তার লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সহজ ভাষা। সাহিত্য মানেই কিছুটা কঠিন ভাষা কাঠামো—এ ধারণাকে তিনি তার নিজস্ব সাবলিল মানুষের মুখের ভাষায় অসাধারণ সব গল্প-উপন্যাস-নাটকের মধ্য দিয়ে বদলে দিয়ে ছিলেন। এ কারণেই সব ধরনের পাঠক তার বই পড়তে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন।
হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রগুলোর জনপ্রিয়তা আজও কমেনি। রহস্যময় ‘হিমু’, মিষ্টি শান্ত ‘রূপা’, যুক্তিবাদী ‘মিসির আলী’, শান্ত স্বভাবের ‘শুভ্র’ কিংবা কোথাও কেউ নেই নাটকের ‘বাকের ভাই’ এ সব চরিত্র বাংলা সাহিত্যের চিরন্তণ অংশ হয়ে গেছে।
টেলিভিশন নাটকেও তিনি ছিলেন অনন্য। ‘এই সব দিনরাত্রী’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘আজ রবিবার’ এবং ‘কোথাও কেউ নেই’ এ সব নাটক এখনও দর্শকের কাছে সমান জনপ্রিয়। পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে তার নাটক দেখার সেই সময়টি এখনও অনেকের স্মৃতিতে রয়ে গেছে। বিশেষ করে ‘বাকের ভাই’য়ের ফাঁসির দৃশ্য প্রচারের সময় মানুষের যে আবেগ তৈরি হয়েছিল, তা এখনও বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা।
চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও তিনি ছিলেন সফল। ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’ এবং ‘ঘেটুপুত্র কমলা’সহ তার নির্মিত চলচ্চিত্র দর্শক ও সমালোচক সকলেরই প্রশংসা কুড়িয়েছে। তার কয়েকটি চলচ্চিত্র জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও অর্জন করেছে। হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল মানুষকে আবার বইমুখী করে তোলা। একসময় নতুন বই প্রকাশ মানেই ছিল বইমেলায় পাঠকদের দীর্ঘ লাইন। অনেকেই শুধু তার নতুন বই কেনার জন্য বইমেলায় যেতেন। প্রকাশকরাও বলতেন, তার বই প্রকাশ মানেই বইমেলায় অন্যরকম উৎসবের পরিবেশ।
ব্যক্তিজীবনেও হুমায়ূন ছিলেন ব্যতিক্রমী। প্রকৃতি, বৃষ্টি, জ্যোৎস্না, নদী আর গ্রামবাংলার প্রতি তার ছিল গভীর টান। গাজীপুরের নুহাশপল্লী ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। সেখানে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন তিনি। তার লেখায় বারবার ফিরে এসেছে জ্যোৎস্না, বৃষ্টি, নদী আর বাংলার প্রকৃতির সৌন্দর্য। আর সব কিছু ছাপিয়ে ভাটি বাংলার গানের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসা আমরা ভিন্ন সময় তার চলচ্চিত্র ও নাটকে লক্ষ্য করে থাকবেন। বিশেষ করে রবীন্দ্রাথ ঠাকুরের গানের প্রতি তার প্রেম সকলের জানা। তিনি তার অনেক গল্পের নামকরণও করছেন রবীন্দ্রনাথের গান থেকে।
২০১২ সালের ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে শুধু একজন লেখককে হারায়নি বাংলাদেশ, হারিয়েছিল কোটি মানুষের নিজের গল্প বলার প্রিয় একজন গল্পকারকে। হুমাযূন আহমেদ এমন একজন লেখক যিনি একবার পড়েই শেষ হয়ে যান না—কিংবা কোন একটা নির্দিষ্ট সময় বা কালের লেখক হয়ে হারিয়ে যাননি। তিনি একটা দীর্ঘ সময়কাল ধরে পূর্ব বাংলার সাহিত্যে তার লেখার ভঙ্গি, তার আবেগের বিচ্ছূরণ নিয়েপাঠকের ব্যাক্তিগত আবেগ-অনুভূতি-স্বপ্ন ও অস্থিরতা নিয়ে বর্তমান প্রাসঙ্গিক হয়ে আছেন।
বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের অবদান শুধু বই লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি সাধারণ মানুষকে বই পড়তে শিখিয়েছেন, সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন সহজ ভাষায়ও অসাধারণ সাহিত্য সৃষ্টি করা যায়। তাই বলা হয়, হুমায়ূন আহমেদ শুধু একজন লেখকের নাম নয়, তিনি একটি অনুভূতি ও তীব্র আবেগের নাম। তিনি নেই, কিন্তু তার লেখা আছে। তার চরিত্রগুলো আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, তিনি আছেন কোটি কোটি পাঠকের হৃদয়ে। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, ততদিন হুমায়ূন আহমেদের নামও একইভাবে উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধায়-ভালোবাসা।
তার মৃত্যুর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিরদিনে আমরা তাকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









