বৈদেশিক ঋণ নির্ভরতা বনাম আর্থিক খাতের সংস্কার এখন আমাদের অর্থনীতিতে গভীর সংকটের সৃষ্টি করেছে। বিপরীতমুখী দুটি ব্যাপার নিয়ে রীতিমতো নাভিশ্বাস অবস্থা সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের। অর্থনীতিতে এই সংকট আজকের নতুন কোনো বিষয় নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এটা পরিলক্ষিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে নতুন করে তিন বছর মেয়াদি ঋণের আবেদন করেছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে আইএমএফকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর চিঠিতে ঋণের পরিমাণ উল্লেখ নেই। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য পরিমাণ হতে পারে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে আইএমএফের নির্বাহী পর্ষদ। কোনো দেশ অর্থনৈতিকভাবে চাপে পড়লে আইএমএফের কাছে ঋণের জন্য যায়। সংস্থাটির ঋণের সুদহার কম। তবে শর্ত কঠিন। আইএমএফের শর্ত মেনে সরকারকে নানা সংস্কার করতে হয়। সংস্কারে ব্যর্থ হলে ঋণের কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দেয় আইএমএফ। দেশে আইএমএফের শর্তের কারণেই জ্বালানি তেলে সরকারি ভর্তুকি প্রায় তুলে নিয়ে মাসে মাসে মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি চালু হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের পতনের পর ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণের চুক্তি করেছিল। ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই ঋণের আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়।
অনুমোদিত ওই ঋণ কর্মসূচির আওতায় পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ মোট ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। ষষ্ঠ কিস্তির অর্থছাড় নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে আলোচনা চললেও শর্ত পূরণ না হওয়ার কারণে তা পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে গত বছরের অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক বৈঠকে অংশ নিয়ে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ কিস্তি ছাড়ে আইএমএফকে রাজি করাতে পারেননি। নতুন বিএনপি সরকার এমন একটা সময়ে আইএমএফের কাছে নতুন ঋণের জন্য গেল, যখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত মোটামুটি ভালো। কিন্তু তা বেড়েছে মূলত আমদানি কমে যাওয়ায়। আমদানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
অন্যদিকে বড় বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের বাড়তি টাকাও দরকার। আইএমএফকে দেওয়া চিঠিতে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আগের কর্মসূচি গ্রহণের সময়কার অর্থনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতা এখন আর নেই। দেশীয় রাজনৈতিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং নতুন চ্যালেঞ্জের কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে সরকার সংস্কার কর্মসূচি থেকে সরে আসতে চায় না; বরং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করতে চায়। নতুন ঋণকর্মসূচির জন্য আইএমএফকে চিঠি পাঠানোর প্রেক্ষিতে সংস্থাটির একটি দল ঢাকা সফরে আসবে। দেশের রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়। রাজস্ব-জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) হার ৮ শতাংশের ঘরে। চলতি অর্থবছর শেষে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ৮৮ হাজার কোটি টাকা। আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের নিম্ন রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতকে বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের সময় দেশের ঘাড়ে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। গত মে ২০২৬-এ প্রকাশিত ডেট (ঋণ) বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, অর্ন্তবর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মোট ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় দেড় বছরের কম সময়ে সরকারি ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এদিকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে গেলে বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ আর পাওয়া যাবে না। এ বছরের মার্চ শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ৭৮ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৬১ দশমিক ৯৭ শতাংশ স্বল্পসুদে বা রেয়াতি ঋণ। আগামী বছরগুলোয় সরকারের আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ বাড়বে।
জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের যে বাজেট উপস্থাপন করেছেন, তাতে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যার মধ্যে সুদ বাবদ বরাদ্দ ৪৬ হাজার কোটি টাকার সমান বৈদেশিক মুদ্রা। সরকারের মোট ঋণের ৫৭ শতাংশই দেশি ঋণ। অর্থাৎ সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ব্যাপক ঋণ নিচ্ছে, যখন বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৫ শতাংশের নিচে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, বিনিয়োগে অনীহা এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে ঋণ প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী রয়েছে। ফলে কর্মসংস্থান কম তৈরি হচ্ছে। বেকারত্ব প্রকট হয়ে উঠছে ক্রমেই। গত অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে (১১ মাস) রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ কম। একমাত্র ইতিবাচক সূচক প্রবাসী আয়।
গত অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত দেশে ৩৪ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময় থেকে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ মোকাবিলায় অর্থায়ন পেতে চায়, অন্যদিকে আগের কর্মসূচিতে আটকে থাকা সংস্কারগুলো নতুন সময়সূচি ও বাস্তবতার আলোকে পুনর্গঠনের সুযোগ খুঁজছে। আগের কর্মসূচি কেন থেমে গেল, তার একটি ব্যবচ্ছেদ থাকা প্রয়োজন।
জ্বালানি মূল্যের স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়, রাজস্ব খাতের সংস্কার, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এবং ব্যাংক খাত সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতি না হওয়াই হয়তো মূল বাধা ছিল। ইতোমধ্যেই অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আইএমএফের এক ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে তিন বছর মেয়াদি নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এরপর ৩ জুন আইএমএফের বাংলাদেশ বিষয়ক মিশন প্রধান বলেছেন, ২০২৩ সালে কর্মসূচি অনুমোদনের পর বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, নিম্ন রাজস্ব আহরণ এবং নতুন সংস্কার উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা এখন আরও স্পষ্ট। ফলে বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও নতুন সরকারের অগ্রাধিকারকে প্রতিফলিত করে একটি নতুন কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জুলাই মাসের মাঝামাঝি আইএমএফের একটি প্রাক্–মিশন ঢাকা সফর করেছে। প্রায় এক সপ্তাহ অবস্থান করে দলটি সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ওই সফরে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নীতিগত অগ্রাধিকার, সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মূল্যায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির আকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে আইএমএফকে জানিয়েছে, সংস্কার কর্মসূচি ধাপে ধাপে এবং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে জনগণের ওপর হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ তৈরি না হয়। নতুন কর্মসূচির আলোচনায় রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ভ্যাট সংস্কার, করছাড় কমানো এবং কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। একই সঙ্গে পুরোপুরি বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু করা, ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং খেলাপি ঋণ কমানোর অগ্রগতিও খতিয়ে দেখবে আইএমএফ। জুলাই মাসে ঢাকায় আসা প্রাক্–মিশন এসব বিষয়ে সরকারের প্রস্তুতি ও অগ্রগতি মূল্যায়ন করেছে।
তবে নতুন ঋণ কর্মসূচি অনুমোদিত হলে এর সঙ্গে যুক্ত কিছু সংস্কারের চাপ সাধারণ মানুষের ওপরও পড়তে পারে। কর ও ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি, করছাড় কমানো, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি হ্রাস এবং আরও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালুর ফলে পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে। সরকার আইএমএফকে জানিয়েছে, সংস্কার কর্মসূচি ধাপে ধাপে এবং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে জনগণের ওপর হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ তৈরি না হয়। নতুন কর্মসূচিতেও পুরোনো বিষয়গুলো ঘুরেফিরে আসবে।
বাংলাদেশকে রাজস্ব, ব্যাংক খাত, বিনিময় হার ও জ্বালানি মূল্য নির্ধারণের মতো কঠিন সংস্কার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। আইএমএফ হয়তো সময় দিতে পারে, কিন্তু সংস্কার এড়ানোর সুযোগ খুব বেশি নেই। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন এক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে যে পরিমাণ নতুন ঋণ আসছে, তার প্রায় পুরোটাই চলে যাচ্ছে অতীতে নেওয়া ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে। ফলে বৈদেশিক অর্থায়ন থেকে উন্নয়ন কার্যক্রমে নতুন করে যে অর্থ যোগ হওয়ার কথা, তার পরিমাণ দ্রুত কমে আসছে। একই সময়ে কমেছে নতুন ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি এবং কমেছে অর্থছাড়ও। ফলে বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ অর্থায়ন নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান হিসেবে বাংলাদেশ পেয়েছে ৪৫৭ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার। একই সময়ে পূর্বে নেওয়া বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৪১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ বিদেশি সহায়তা হিসেবে যে অর্থ এসেছে, তার ৮৯ দশমিক ২৮ শতাংশই চলে গেছে ঋণ পরিশোধে। হিসাব করলে দেখা যায়, পুরো অর্থছাড়ের মধ্যে উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৪৪ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
এটি এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে নতুন ঋণ নিয়ে পুরনো ঋণ শোধ করার প্রবণতা দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। যদিও সরকার সরাসরি নতুন ঋণের অর্থ দিয়ে পুরনো ঋণ পরিশোধ করছে না, তবে সামগ্রিক বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের হিসাবে নতুন যে অর্থ আসছে তার অধিকাংশই ঋণ পরিশোধে চলে যাওয়ায় কার্যত একই ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। গত অর্থবছরের ১১ মাসে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল বাবদ মোট ৪১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরের ১১ মাসে বিদেশি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে এটি সর্বোচ্চ। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে পরিশোধ করা হয়েছিল ৩৭৮ কোটি ৪৬ লাখ ১০ হাজার ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ৩৪ কোটি ৭৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার বা প্রায় ৯ শতাংশ। পরিশোধের এই অর্থের মধ্যে সুদ বাবদ গিয়েছে ১৪৪ কোটি ৭৯ লাখ ৭০ হাজার ডলার।
আগের অর্থবছরের একই সময়ে সুদ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১৪০ কোটি ১২ লাখ ৪০ হাজার ডলার। অন্যদিকে ঋণের আসল পরিশোধ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬৮ কোটি ৪৩ লাখ ৩০ হাজার ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৩৮ কোটি ৩৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার। শুধু সুদ নয়, আসল ঋণ পরিশোধের চাপও দ্রুত বাড়ছে। এর পেছনে প্রধান কারণ গত এক দশকে নেওয়া বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের বৈদেশিক ঋণ। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী প্রকল্পসহ বিভিন্ন বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছিল। এসব ঋণের অনেকগুলোর গ্রেস পিরিয়ড বা অবকাশকাল শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন নিয়মিত কিস্তি ও সুদ পরিশোধ শুরু হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন। ফলে একই পরিমাণ ডলার পরিশোধ করতে সরকারের অনেক বেশি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। বৈদেশিক ঋণের চাপ শুধু ডলারের হিসাবে নয়, টাকার হিসাবেও দ্রুত বাড়ছে।
ঋণ পরিশোধের চাপ যখন বাড়ছে, তখন নতুন ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগের। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মোট ৪২২ কোটি ৫৩ লাখ ৯০ হাজার ডলার ঋণ ও অনুদান প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৫৬০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রতিশ্রুতি কমেছে ১২৬ কোটি ৩২ লাখ ৭০ হাজার ডলার। বিশেষভাবে কমেছে অনুদান। চলতি অর্থবছরে অনুদান প্রতিশ্রুতি এসেছে মাত্র ১৫ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের পথে এগিয়ে যাওয়ায় এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নেওয়ায় অনুদানভিত্তিক সহায়তা ক্রমেই কমে আসছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি অর্থ বাজারভিত্তিক বা তুলনামূলক উচ্চ সুদের ঋণ থেকে সংগ্রহ করতে হতে পারে। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব অর্থছাড়েও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে অর্থছাড় হয়েছে ৪৫৭ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
আগের অর্থবছরের একই সময়ে অর্থছাড় হয়েছিল ৫৬০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার। অর্থাৎ অর্থছাড় কমেছে ১০৩ কোটি ১০ লাখ ১০ হাজার ডলার। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, ক্রয় প্রক্রিয়ার জটিলতা, প্রশাসনিক বিলম্ব এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি শ্লথের কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত ঋণের অর্থ সময়মতো ছাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে একদিকে নতুন ঋণ কম আসছে, অন্যদিকে পুরনো ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে, যা বৈদেশিক অর্থায়নের ভারসাম্যকে দুর্বল করে দিচ্ছে। গত অর্থবছরের ১১ মাসে সবচেয়ে বেশি অর্থ ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি প্রায় ৯৬ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া, যারা প্রায় ৯৩ কোটি ডলার ছাড় করেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দিয়েছে প্রায় ৭৮ কোটি ডলার, চীন ৫৩ কোটি ডলার, জাপান ৪৩ কোটি ডলার এবং ভারত ২৫ কোটি ডলার ঋণ ছাড় করেছে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্থায়নে এখনো বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর পাশাপাশি কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন অংশীদারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আগামী কয়েক বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। কারণ, বড় প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধের মূল সময় এখন শুরু হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বছরে পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। রাজস্ব আদায়, রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্সপ্রবাহ পর্যাপ্ত হারে না বাড়লে ঋণ পরিশোধের চাপ অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এখন থেকে ঋণ গ্রহণে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। শুধু ঋণ নিলেই হবে না, সেই ঋণের অর্থ এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে হবে, যেখান থেকে অর্থনৈতিক রিটার্ন পাওয়া যায় এবং যা ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করে। বাংলাদেশ এখনো ঋণ সংকটে পড়েনি।
বৈদেশিক ঋণের অনুপাত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সহনীয় পর্যায়েই রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে- নতুন ঋণের প্রবাহ কমছে, অনুদান কমছে, অথচ ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে। ফলে উন্নয়ন অর্থায়নের যে সুবিধা বৈদেশিক ঋণ থেকে পাওয়ার কথা, তার বড় অংশই এখন পুরনো দায় পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, উন্নয়ন ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। এখন সময় এসেছে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ নয়, বরং ঋণের গুণগত ব্যবহার, প্রকল্পের অর্থনৈতিক ফলন এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সক্ষমতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার। কারণ, ঋণ তখনই টেকসই হয়, যখন সেই ঋণ ভবিষ্যতে নিজেই নিজের পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি করে। বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য সেটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









