প্রকৃতি কখনো অপরূপ সৌন্দর্যের বিস্ময়, আবার কখনো তারই বুকে লুকিয়ে থাকে কঠিনতম পরীক্ষা। সাম্প্রতিক সময়ে টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাব এবং আকস্মিক বন্যায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চল নতুন করে মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। পাহাড়, জনপদ, গ্রাম ও শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও ভেঙে পড়েছে মানুষের বসতঘর, কোথাও ধ্বংস হয়েছে কৃষকের সারা বছরের একমাত্র ফসল, কোথাও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সড়ক যোগাযোগ। হাজারো পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে দিন কাটাচ্ছে, অসংখ্য মানুষ নিরাপদ পানি, খাদ্য, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শিশুদের কান্না, বৃদ্ধদের অসহায়ত্ব এবং স্বজনহারা মানুষের আর্তনাদ আজ সমগ্র জাতির বিবেককে নাড়া দিচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল আন্তর্জাতিক সম্মেলন কিংবা গবেষণাগারের আলোচ্য বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের প্রতিদিনের বাস্তবতা। বিশ্বের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, নদীভাঙন, আকস্মিক বন্যা, উপকূলীয় জলোচ্ছ্বাস ও পাহাড়ি ঢলের পুনরাবৃত্তি আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে দুর্যোগসহনশীল করে গড়ে তুলতে হলে কেবল সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ববোধ।
তবে এই দুর্যোগের মধ্যেও আশার আলো নিভে যায়নি। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, ছাত্রসংগঠন এবং অসংখ্য তরুণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেউ ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন, কেউ নৌকায় করে দুর্গম এলাকায় খাদ্য ও নিরাপদ পানি বিতরণ করছেন, কেউ চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন, আবার কেউ উদ্ধারকাজে দিন-রাত পরিশ্রম করছেন। এই নীরব মানবিক সৈনিকদের অবদান নিঃসন্দেহে জাতির জন্য গৌরবের। তাঁদের এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে মানবতা এখনো বেঁচে আছে, সহমর্মিতা এখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি।
এই মহৎ উদ্যোগগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, প্রবাসী বাংলাদেশি, দাতব্য ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং সামর্থ্যবান নাগরিকদের প্রতি আন্তরিক আহ্বান, যাঁরা ইতোমধ্যে মাঠে কাজ করছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ান। প্রত্যেক সংগঠনের নিজস্ব সক্ষমতা থাকে, কিন্তু বিপর্যয়ের ব্যাপ্তি যখন বিশাল হয়, তখন সম্মিলিত সহযোগিতাই সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হয়। অর্থ, খাদ্য, ওষুধ, নিরাপদ পানি, পোশাক, কম্বল কিংবা পুনর্বাসনের জন্য নির্মাণসামগ্রী, যে যেভাবে পারেন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন।
একটি পরিবারের মুখে হাসি ফিরিয়ে দেওয়া হয়তো আপনার কাছে ছোট একটি উদ্যোগ, কিন্তু পরিবারটির কাছে সেটিই হতে পারে নতুন জীবনের সূচনা।বিশেষভাবে দেশের বিভিন্ন ফাউন্ডেশন, ট্রাস্ট, মানবিক সংগঠন ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান, আপনারা ইতোমধ্যে যে মানবিক দায়িত্ব পালন করছেন, তা আরও সম্প্রসারিত করুন। প্রয়োজনে বিশেষ ত্রাণতহবিল গঠন করুন, জনকল্যাণমূলক প্রোগ্রাম আয়োজন করুন, অনলাইন ও অফলাইনে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করুন এবং পুনর্বাসনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করুন। দুর্যোগে সহায়তা কেবল একদিনের খাদ্য বিতরণে শেষ হয় না, একটি পরিবারকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাই প্রকৃত মানবিক সেবা।
ইসলাম মানুষের দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে সর্বোচ্চ নেক আমলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করেছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, 'তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো।' (সূরা আল-মায়িদাহ: ২) এই আয়াত কেবল একটি ধর্মীয় নির্দেশনা নয়, এটি একটি আদর্শ মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার মৌলিক নীতি।
রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, 'যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন।' (সহিহ মুসলিম)
অন্য এক হাদিসে তিনি বলেছেন, 'আল্লাহ ততক্ষণ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।' (সহিহ মুসলিম)
এসব হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয়, মানুষের সেবা কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি ইবাদত, এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।
আজ চট্টগ্রামের মানুষ কেবল ত্রাণ নয়, আমাদের ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং পাশে থাকার অঙ্গীকার প্রত্যাশা করছেন। আমরা যেন ভুলে না যাই, দুর্যোগ কোনো ব্যক্তি, অঞ্চল বা শ্রেণি দেখে আসে না। আজ যারা বিপদে, আগামীকাল হয়তো সেই অবস্থানে আমরাও পড়তে পারি। তাই এই দুর্যোগকে কেবল সংবাদপত্রের শিরোনাম হিসেবে নয়, নিজের পরিবারের একটি সংকট হিসেবে অনুভব করা আমাদের নৈতিক কর্তব্য।
একটি সভ্য জাতির পরিচয় তার উন্নত অট্টালিকায় নয়, বরং বিপদের সময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতায়। যে সমাজে বিত্তবান দরিদ্রের পাশে দাঁড়ায়, যুবক বৃদ্ধের হাত ধরে, চিকিৎসক রোগীর সেবা করে, স্বেচ্ছাসেবক নিজের আরাম ত্যাগ করে দুর্গত মানুষের দ্বারে পৌঁছে যান, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে মানবিক সমাজ। আসুন, আমরা সবাই দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হই।
যারা ইতোমধ্যে দুর্গত মানুষের পাশে থেকে নিরলসভাবে কাজ করছেন, তাঁদের প্রতি আমাদের অকুণ্ঠ সমর্থন, সহযোগিতা ও দোয়া অব্যাহত থাকুক। যারা এখনো যুক্ত হতে পারেননি, তারাও নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসুন। কারণ, মানুষের চোখের অশ্রু মুছে দেওয়ার চেয়ে মহৎ ইবাদত খুব কমই আছে। অসহায় মানুষের মুখে একটি হাসি ফিরিয়ে দেওয়া পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবিক অর্জন।
চট্টগ্রামের এই দুর্যোগ একদিন কেটে যাবে, বন্যার পানি একসময় নেমে যাবে, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়িও আবার গড়ে উঠবে। কিন্তু এই কঠিন সময়ে কে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল, আর কে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, ইতিহাস সেই মানবিকতার সাক্ষ্য চিরকাল সংরক্ষণ করে রাখবে। তাই আসুন, আমরা সবাই একসঙ্গে বলি, মানুষের বিপদে মানুষই সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আর সেই আশ্রয় হয়ে ওঠাই হোক আমাদের ঈমান, মানবতা ও নাগরিক দায়িত্বের সর্বোচ্চ প্রকাশ।
লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









