ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর গতিশীলতা। ইতিহাস কখনো স্থির নয়; এটি অবিরাম পরিবর্তন, অভিযোজন ও পুনর্গঠনের এক চলমান প্রক্রিয়া। একটি জাতির ইতিহাস কখনোই বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার সমষ্টি নয়; এটি দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, অর্জন এবং আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক অভিযাত্রা। কোনো জাতি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে না।
সময়ের প্রবাহে নতুন বাস্তবতা, নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন সংকট এবং নতুন প্রত্যাশার মুখোমুখি হতে হয়। সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাই নির্ধারণ করে একটি জাতির অগ্রযাত্রার দিকনির্দেশনা। যে জাতি অতীতের অভিজ্ঞতা ও অর্জনকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই কথা বলে। পক্ষান্তরে, যে জাতি অতীতের গৌরবকে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ না করে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্রে পরিণত করে, নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও দ্বন্দ্বকে স্থায়ী করে তোলে, তারা একসময় অগ্রগতির পথ হারিয়ে ফেলে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো অতীতকে অস্বীকার করা যেমন আত্মঘাতী, তেমনি অতীতের মধ্যেই বন্দি হয়ে থাকাও সমান ক্ষতিকর।
পলাশী-উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৪৭-পূর্ব ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম, তারপর ১৯৪৭-উত্তর ভাষার জন্য সংগ্রাম, রাজনৈতিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার সংগ্রাম, আত্মনিয়ন্ত্রণের তথা স্বাধিকারের সংগ্রাম এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম- এর সবকিছু মিলিয়েই আমাদের জাতীয় ইতিহাস নির্মিত হয়েছে।
এ ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় পূর্ববর্তী অধ্যায়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তার আত্মপরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করেছে; ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সুসংহত করেছে; ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান গণশক্তির সক্ষমতাকে প্রকাশ করেছে; আর ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ সেই দীর্ঘ সংগ্রামকে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পরিণতি দিয়েছে। নিঃসন্দেহে স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় এবং নির্ধারক মাইলফলক, যার মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে এবং বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, একটা জাতির ইতিহাসের পথচলা কোনো একক ঘটনার মধ্যেই থেমে থাকে না। ১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজ-উদ্দৌলার পরাজয় যেমন এই অঞ্চলে একটি দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা করেছিল এবং তার অভিঘাত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাতির জীবনকে প্রভাবিত করেছে, তেমনি ১৯৭১ সালের বিজয়ও কোনো চূড়ান্ত সমাপ্তি ছিল না। স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে একটি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়, কিন্তু সেই রাষ্ট্রকে কতটা ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন করা যাবে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার সংগ্রাম তখনই শুরু হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, স্বাধীনতা একটি ঘটনা; কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ায় কখনো অগ্রগতি আসে, কখনো পশ্চাৎপদতা দেখা দেয়; কখনো জনগণের আকাঙ্ক্ষা রাষ্ট্রকে সামনে এগিয়ে নেয়, আবার কখনো ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন সেই অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বৈরাচারী ভূমিকায় জালেম শাসকশ্রেণির জাঁতাকলে পিষ্ট মজলুম জনগণ মুক্তির পথ খোঁজে গণঅভ্যুত্থান কিংবা বিপ্লবের পথে।
এই কারণেই স্বাধীনতা কোনো গন্তব্য নয়; এটি রাষ্ট্র হিসেবে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব, জনগণের অধিকার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ যাত্রার সূচনা মাত্র। একটি জাতির ইতিহাসের ক্রমধারায় নতুন নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটে, এবং তাদের সামনে নতুন প্রশ্ন ও নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়। ফলে স্বাধীনতার মৌলিক চেতনা তথা মানবিক মর্যাদা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক সাম্য প্রভৃতি বিষয় প্রতিটি যুগে নতুন বাস্তবতায় নতুনভাবে ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়নের দাবি তোলে। বাংলাদেশের ইতিহাসও সেই ধারাবাহিকতার বাইরে নয়। তাই আমাদের জাতীয় ইতিহাসকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি চলমান অভিযাত্রা হিসেবে দেখতে হবে যেখানে প্রতিটি সংগ্রাম পূর্ববর্তী সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করে এবং পরবর্তী সংগ্রামের ভিত্তি নির্মাণ করে। এই ধারাবাহিক ঐতিহাসিক প্রবাহের মধ্যেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে; একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র ও সমাজকে আরও ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত করার দীর্ঘ অভিযাত্রার একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিকপট পরিবর্তনে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্রআন্দোলনও সেই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারারই অংশ, যেখানে নতুন প্রজন্ম কেবল একটি তাৎক্ষণিক দাবির জন্য নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের চরিত্র নিয়ে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সেই কারণেই জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ নিয়ে জনগণের নতুন আকাঙ্ক্ষা এবং বিশেষত তরুণ প্রজন্মের ঐতিহাসিক আত্মপ্রকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। আমাদের জাতীয় জীবনের প্রায় প্রতিটি যুগান্তকারী অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তরুণদের সাহস, স্বপ্ন এবং আত্মত্যাগ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখেও তরুণ ছাত্রসমাজ মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তারুণ্যের নেতৃত্বেই স্বৈরশাসনের ভিত কেঁপে উঠেছিল। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অসংখ্য তরুণ অস্ত্র হাতে নিয়ে স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিল। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও ছাত্রসমাজ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। একই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনও প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের ইতিহাসে পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি এখনও তরুণ প্রজন্ম। যুগ বদলেছে, প্রেক্ষাপট বদলেছে, কিন্তু ন্যায়, মর্যাদা এবং অধিকারের প্রশ্নে তারুণ্যের ঐতিহাসিক ভূমিকা অপরিবর্তিত রয়েছে।
সঙ্গত কারণে তরুণেরা সাধারণত বিদ্যমান ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার সাহস রাখে। তারা প্রতিষ্ঠিত সত্য তথা বন্দোবস্তকে অন্ধভাবে মেনে নিতে চায় না; বরং বাস্তবতার সঙ্গে আদর্শের ফারাককে চিহ্নিত করতে চায়। তাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ কল্পনার শক্তি থাকে, নতুন সম্ভাবনা নির্মাণের সাহস থাকে এবং প্রয়োজন হলে ব্যক্তিগত ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতাও থাকে। জার্মান বংশোদ্ভূত মার্কিন রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হানা আরেন্টের (১৯০৬–১৯৭৫) মতে, প্রতিটি নতুন প্রজন্ম পৃথিবীতে নতুন সূচনার সম্ভাবনা নিয়ে আসে। ইতিহাসের নানা পর্যায়ে আমরা দেখেছি, সমাজ যখন স্থবির হয়ে পড়ে বা রাষ্ট্র যখন জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে, তখন সেই নতুন সূচনার আহ্বান সবচেয়ে প্রবলভাবে এসেছে তরুণদের কাছ থেকেই।
বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনও সেই অর্থে কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ ছিল না; এটি ছিল নতুন প্রজন্মের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের উদ্দেশে একটি মৌলিক প্রশ্ন: রাষ্ট্র কার জন্য, ক্ষমতা কার স্বার্থে এবং স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কী? সে যাই হোক, ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনা-পরম্পরা নয়; এটি বর্তমানের রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ক্ষমতার রাজনীতিতে অতীতের স্মৃতি প্রায়ই মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়। ইতিহাস তখন শুধু গবেষণা, বিশ্লেষণ বা শিক্ষা গ্রহণের বিষয় থাকে না; বরং রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন, জনসমর্থন সংগঠিত করা এবং নৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি বিশেষ ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, জুলাই আন্দোলন কোনো একক রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ বা সংগঠনের একচ্ছত্র উদ্যোগ ছিল না। এর প্রাণশক্তি ছিল সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, যেখানে নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পটভূমির মানুষ একটি অভিন্ন আকাঙ্ক্ষাকে সামনে নিয়ে একত্রিত হয়েছিল। ফলে জুলাইয়ের ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ‘প্রতীকী পুঁজি’ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করার সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই সীমিত হয়ে গেছে।
সর্বস্তরের মানুষের এই গণঅভ্যুত্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, ইতিহাসের প্রকৃত মালিক কোনো দল নয়, দেশের জনগণ; আর গণআন্দোলনের প্রকৃত শক্তি কোনো সংগঠনের একক কর্তৃত্বে নয়, বরং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে নিহিত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরপরই একটি রাজনৈতিক প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে, যেখানে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যেন স্বাধীনতার চেতনা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী।
একদিকে কেউ কেউ জুলাইয়ের তাৎপর্য প্রতিষ্ঠার নামে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে খাটো করতে চেয়েছেন; অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিকে সামনে এনে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের বৈধতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। উভয় প্রবণতাই ইতিহাসের প্রকৃত স্বরূপকে অস্বীকার করে, যুক্তির বিচারে অসংগত এবং জাতীয় স্বার্থের ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতার পরিপন্থী।
প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ এবং ২০২৪ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ইতিহাস নয়; বরং একই জাতীয় অর্জনের অব্যাহত অভিযাত্রার ভিন্ন দুই অধ্যায়। ১৯৭১ আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মাণ করেছে, আর ২০২৪ সেই স্বাধীন রাষ্ট্রকে আরও বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং স্বৈরাচারমুক্ত করার গণআকাঙ্ক্ষাকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি অর্জনকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্য অর্জনকে অস্বীকার করার চেষ্টা ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে না; বরং জাতির সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করে।
আমাদের স্বীকার করতে হবে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রসংস্কারের যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুটি মৌলিক দাবি- একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রযন্ত্র এবং একটি স্বৈরাচারমুক্ত শাসনব্যবস্থা। এই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবেই ‘জুলাই সনদ’-এর ধারণা সামনে আসে, যার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির ভিত্তি নির্মাণ করা। কিন্তু যখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু রাষ্ট্রসংস্কার থেকে সরে গিয়ে ইতিহাসের মালিকানা নিয়ে প্রতিযোগিতায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই সংস্কার-এজেন্ডা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে যে তরুণেরা জুলাইয়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল রাষ্ট্র পুনর্গঠনের স্বপ্ন নিয়ে, তাদের অনেক প্রত্যাশাই অপূর্ণ থেকে যায়; পুরনো বন্দোবস্ত ভেঙে নতুন বন্দোবস্ত নির্মাণের যে প্রত্যয় আন্দোলনের ভেতরে জন্ম নিয়েছিল, তার বাস্তবায়ন নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হয়।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের গর্ব; চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানও আমাদের গর্ব। একটি আমাদের স্বাধীন অস্তিত্বের ভিত্তি নির্মাণ করেছে, অন্যটি সেই স্বাধীন রাষ্ট্রের চরিত্র, কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মসমালোচনা এবং আত্মসংশোধনের শক্তিকে প্রকাশ করেছে। একটি আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার দরজা খুলেছে, অন্যটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, স্বাধীনতার সুফলকে অর্থবহ করতে হলে রাষ্ট্রকে হতে হবে বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণকেন্দ্রিক। এই দুটি ঘটনাই বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য ও অনিবার্য অংশ এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নির্মাণে উভয়ই আমাদের জন্য প্রেরণা, শিক্ষা ও দিকনির্দেশনার উৎস।
অতএব, আমাদের সামনে পথ হতে হবে বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতি; প্রতিহিংসার সংস্কৃতির পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি; ‘প্রতীকী পুঁজি’ ব্যবহার করে ইতিহাসের একচেটিয়া মালিকানা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুমাত্রিক স্মৃতিচর্চার সংস্কৃতি; এবং অতীতের অন্তহীন বিতর্কে আবদ্ধ থাকার পরিবর্তে ভবিষ্যৎ নির্মাণের দৃঢ় অঙ্গীকার। ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষা হলো একটি জাতি তখনই এগিয়ে যায়, যখন সে তার অতীতকে সম্মান করে, বর্তমানের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন স্বপ্ন নির্মাণ করে।
চব্বিশের জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই কেবল একটি আন্দোলনের স্মৃতি নয়; এটি জনগণের রাজনৈতিক জাগরণ, অধিকার সচেতনতা এবং রাষ্ট্রকে আরও ন্যায়ভিত্তিক করার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এই চেতনাকে ধারণ করে স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্যে কঠোর পরিশ্রম, জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন, সুশাসন, উৎপাদনশীলতা এবং জাতীয় সংহতির নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের আগামীর পথচলার মূলমন্ত্র। কারণ, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয় কোনো একটি মুহূর্তের সাফল্যে নয়; বরং সেই মুহূর্তের চেতনাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাস্তব জীবনে রূপ দেওয়ার মধ্যেই নিহিত।
লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









