সকালে ঘুম ভাঙার পর আপনার প্রথম কাজ কী?
অনেকের উত্তর হবে- মোবাইল ফোন হাতে নেওয়া।
ঘুম থেকে উঠেই ফেসবুক, ইউটিউব, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটক কিংবা অনলাইন সংবাদ দেখা। অফিসে যাওয়ার পথে মোবাইল, কাজের ফাঁকে মোবাইল, খাবার টেবিলে মোবাইল, ঘুমানোর আগে মোবাইল। এমনকি মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলেও অনেকের হাত চলে যায় ফোনের দিকে। একসময় মোবাইল ফোন ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের একটি যন্ত্র। এখন এটি হয়ে উঠেছে আমাদের অফিস, বিনোদন, সংবাদপত্র, ব্যাংক, বাজার, ক্যামেরা, টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র।
প্রশ্ন হলো- আমরা কি মোবাইল ব্যবহার করছি, নাকি মোবাইলই আমাদের ব্যবহার করছে? বাংলাদেশে মোবাইল ব্যবহারের ব্যাপকতা এখন আর নতুন কোনো বিষয় নয়।
অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (AMTOB)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস শেষে দেশে সক্রিয় মোবাইল সাবস্ক্রাইবার ছিল প্রায় ১৮ কোটি ৮৬ লাখ এবং মোবাইল ইন্টারনেট সাবস্ক্রাইবার প্রায় ১১ কোটি ৯১ লাখ। একজন মানুষের একাধিক সিম থাকতে পারে বলে সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা সরাসরি মানুষের সংখ্যা নয়। তারপরও এই পরিসংখ্যান আমাদের ডিজিটাল নির্ভরতার বিশাল চিত্রটি সামনে আনে। প্রযুক্তির এই বিস্তার নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু এর পাশাপাশি তৈরি হয়েছে একটি নীরব সংকট- অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার এবং মোবাইল-নির্ভরতা।
প্রয়োজন আর আসক্তির মধ্যে পার্থক্য কী?
মোবাইল ফোন নিজে কোনো সমস্যা নয়।
একজন শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাস করছে, একজন ব্যবসায়ী গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, একজন কৃষক আবহাওয়ার তথ্য নিচ্ছেন, একজন প্রবাসী পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলছেন- এসব প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন প্রয়োজনের বাইরে মোবাইল আমাদের সময়, মনোযোগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
‘মাত্র পাঁচ মিনিট দেখব’- এই পাঁচ মিনিট কখনো কখনো এক ঘণ্টায় পরিণত হয়।
একটি ভিডিও শেষ হলে আরেকটি ভিডিও আসে। একটি পোস্টের পর আরেকটি পোস্ট। একটি রিল শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী রিল প্রস্তুত।
আমরা ভাবি- ‘আরেকটা দেখি।’
তারপর আরো একটি।
শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, যে সময়টি পড়াশোনা, কাজ, ঘুম, পরিবার কিংবা বিশ্রামের জন্য বরাদ্দ ছিল, তার বড় একটি অংশ চলে গেছে স্ক্রিনের পেছনে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি- আমাদের মনোযোগ।
অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগুলোর একটি হলো মনোযোগের বিভাজন।
একজন চাকরিজীবী অফিসে বসে গুরুত্বপূর্ণ একটি রিপোর্ট তৈরি করছেন। হঠাৎ ফোনে নোটিফিকেশন এলো। তিনি ফোনটি দেখলেন। একটি মেসেজ, তারপর ফেসবুক, তারপর একটি ভিডিও।
কয়েক মিনিট পর তিনি আবার কাজে ফিরলেন।
কিন্তু মস্তিষ্ক কি আগের অবস্থায় ফিরতে পারে?
এভাবে দিনে অসংখ্যবার ফোনের নোটিফিকেশন আমাদের মনোযোগ ভেঙে দেয়। ফলে কাজের গতি কমে, ভুলের সম্ভাবনা বাড়ে এবং গভীর মনোযোগের প্রয়োজন এমন কাজ কঠিন হয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দিতে পারে। বই খুলে পড়তে বসেছে, কিন্তু পাশে ফোন। একটি নোটিফিকেশনই যথেষ্ট- পড়াশোনা থেকে মন চলে যায় স্ক্রিনে।
অর্থাৎ মোবাইল শুধু আমাদের সময় নিচ্ছে না; আমাদের মনোযোগও টুকরো টুকরো করে ভেঙে দিচ্ছে।
পরিবারে মানুষ আছে, কিন্তু যোগাযোগ নেই।
আমাদের পরিবারে এখন একটি দৃশ্য খুব পরিচিত।
একই ঘরে বাবা, মা ও সন্তান বসে আছেন। সবাই উপস্থিত, কিন্তু প্রত্যেকে নিজের নিজের মোবাইলের জগতে। বাবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখছেন। মা ভিডিও দেখছেন। সন্তান গেম খেলছে।
ঘরে নীরবতা। কেউ কারো সঙ্গে কথা বলছে না। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি- একসঙ্গে থাকা আর একসঙ্গে সময় কাটানো এক বিষয় নয়।
একটি শিশু হয়ত তার বাবা-মায়ের সঙ্গে একই ঘরে আছে, কিন্তু সে কি তাদের মনোযোগ পাচ্ছে?
অনেক সময় আমরা সন্তানের হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে তাকে ব্যস্ত রাখি। এতে সাময়িকভাবে হয়ত বাবা-মা স্বস্তি পান। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শিশুর সঙ্গে আমাদের যে কথোপকথন, খেলা, গল্প এবং আবেগের সম্পর্ক তৈরি হওয়ার কথা- সেটি কি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে না? শিশু-কিশোরদের জন্য ঝুঁকি আরো বেশি ।
শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।
প্রযুক্তি তাদের শিক্ষার সুযোগ বাড়িয়েছে। অনলাইন ক্লাস, শিক্ষামূলক ভিডিও, ডিজিটাল বই ও গবেষণার সুযোগ- সবই ইতিবাচক। কিন্তু শিক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবহার আর অবিরাম বিনোদন এক জিনিস নয়।
যখন পড়াশোনার চেয়ে গেম, বইয়ের চেয়ে ভিডিও, বাস্তব খেলাধুলার চেয়ে স্ক্রিন এবং পরিবারের সঙ্গে কথোপকথনের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, তখন ভারসাম্য নষ্ট হয়।
আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো শিশুরা শুধু কী দেখছে সেটিই নয়, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কী ধরনের তথ্য শেয়ার করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন বুলিং, প্রতারণা, ভুয়া তথ্য, ক্ষতিকর কনটেন্ট এবং ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের অপব্যবহার- সবকিছুর ঝুঁকিই রয়েছে। তাই শিশুদের হাতে শুধু স্মার্টফোন তুলে দিলেই হবে না; তাদের ডিজিটালভাবে সচেতন ও দায়িত্বশীল করে তুলতে হবে।
সামাজিক সম্পর্কও বদলে যাচ্ছে । সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের অনেক মানুষের সঙ্গে যুক্ত করেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনলাইনে যোগাযোগ যত বাড়ছে, অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব জীবনের যোগাযোগ তত কমছে।
একজন মানুষ শত শত অনলাইন ‘ফ্রেন্ড’ নিয়ে ব্যস্ত, অথচ পাশের বাসার মানুষের সঙ্গে পরিচয় নেই। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত শেয়ার করছেন, কিন্তু কাছের মানুষের সঙ্গে বসে কথা বলার সময় নেই। আমরা অন্যের জীবনের ছবি দেখছি, অন্যের ভ্রমণ দেখছি, অন্যের সাফল্য দেখছি। ফলে অনেক সময় নিজের জীবন নিয়েও অযথা তুলনা, হতাশা বা অসন্তুষ্টি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার শুধু সময় নয়- আমাদের সামাজিক ও মানসিক জগতকেও প্রভাবিত করতে পারে।
সাম্প্রতিক একটি ঘটনা, একটি কঠিন প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে- সম্প্রতি পটুয়াখালীর দশমিনায় একটি মর্মান্তিক ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছে। দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এক বাবা তাঁর দেড় বছরের শিশুকে এক লাখ টাকা দিয়ে বিক্রি করে সেই অর্থে একটি আইফোন কিনেছিলেন। যদিও পুলিশ শিশুটিকে পরবর্তীকালে উদ্ধার করে এবং ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়।
এটি নিঃসন্দেহে একটি চরম অমানবিক ঘটনা। যদিও একটি ঘটনা দিয়ে পুরো সমাজ বা মোবাইল ব্যবহারকারীদের বিচার করা যায় না। তবু ঘটনাটি আমাদের সামনে কিছু কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়-
একটি প্রযুক্তিপণ্য কখন মানুষের প্রয়োজনের বাইরে গিয়ে মানুষের আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হয়?
একটি ফোন কি কখনো মানুষের সম্পর্ক, দায়িত্ব কিংবা মূল্যবোধের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে?
‘আমি কি আমার ফোনকে নিয়ন্ত্রণ করি, নাকি আমার ফোন আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে?’
প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের প্রত্যেককে নিজের জীবন থেকেই খুঁজে নিতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









