বিশ্ব এক অস্থির সময় পার করছে। বিশ্বে এই অস্থিরতা শুরু হয়েছে ২০২০ সালে কোভিড মহামারি ভয়ংকর রূপ ধারণ করলে। কোভিড মহামারীর মধ্যে বিশ্ব এক চরম স্থবিরতায় চলে যায়। যেখানে প্রায় সমগ্র বিশ্বই শাটডাউন দিতে বাধ্য হয়। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়, বেকারত্ব বেড়ে যায় এবং এক ধরনের অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়। এ অবস্থা শেষ হতে না হতেই শুরু হয় ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ। যে যুদ্ধ মনে হচ্ছিল খুব শীঘ্রই শেষ হবে, কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়ে তা আজও চলমান রয়েছে। যুদ্ধটি নিয়ে সমগ্র বিশ্ব উদ্বিগ্ন থাকলেও চরম মূল্য দিতে হচ্ছে ইউরোপীয় দেশগুলোকে। যে ঢেউ থেকে বাংলাদেশ নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। যেমন ডলারের দাম লাগাম ছাড়া হয়ে যায় এবং রিজার্ভ তলানিতে নামে। একই সাথে দ্রব্যমূল্যের দাম লাগামছাড়া হয়ে যায়, যা আজও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।
নতুন করে যুক্ত হয় ২০২৫ সালের মার্কিন শুল্ক নীতি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর এপ্রিল ২০২৫ হতে সারা বিশ্বে ৬০ থেকে ৭০টি দেশের উপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন। ভেনেজুয়েলের প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। নতুন করে ছোট ছোট যুদ্ধ সংঘটিত হয় সমগ্র বিশ্বে, যা আজও কিছু চলমান রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভারত-পাকিস্তান, আফগানিস্তান-পাকিস্তান, থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া, সুদান এবং সবচাইতে আলোচিত ও প্রভাব বিস্তার করা যুদ্ধ হলো ফিলিস্তিনি-ইসরাইল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। যে যুদ্ধের ফলে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যই আক্রান্ত হয়, মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পরস্পরে বিভিন্ন তেল শোধনাগারে হামলা চালায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়, যা বিশ্বের ২৫ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহকারী প্রণালীটি আরো চরম অস্থিরতা তৈরি করে সমগ্র বিশ্বেই। এছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে অঘোষিত স্নায়ুযুদ্ধ চলমান রয়েছে। বৈরিতা রয়েছে চীন-ভারতেও। পুরো ইউরোপজুড়ে দাবানলের ব্যাপক মাত্রায় প্রভাব এবং চীন-ভারতের মতো খাদ্য উৎপাদনশীল দেশে বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সুতরাং এই অস্থির বিশ্বে বাংলাদেশকে অনেক সংযত ও দক্ষতার সহিত সম্পর্ক বজায় রেখে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণ করতে হবে। দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্তই পারবে বাংলাদেশকে আগামী দিনে নিরাপদ রাখতে।
একটি উদাহরণ দেওয়া যাক, ১৯৩০ সালের ‘স্মুট-হাউলি শুল্ক আইন’ ছিল একটি সুরক্ষাভিত্তিক বাণিজ্যনীতি, যা বিপরীত প্রভাব ফেলেছিল বিশ্ব জুড়েই। এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক খারাপ করে এবং বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা আরো গভীর করে তোলে। যার পরিণতিতে ১৯৩০ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত সারা বিশ্বে চরম এক অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। বিশ্বে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এই সময়টুকুতে কিছু ছোট ছোট যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যা পরবর্তীকালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়। আবার ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন তার প্রথম মেয়াদে চীনা পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করলে চীন পাল্টা শুল্ক দেয়, যার ফলে উভয় দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ে। এই বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, বাণিজ্য প্রবাহে ধীরগতি আসে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং করোনা মহামারীর কারণে এর প্রভাবটি ভিন্ন খাতে চলে যায়।
এই ঘটনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয়, ২০২৫ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে শুল্ক আরোপ করলেন বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের উপর, তা এক ধরনের অর্থনৈতিক বার্তা প্রদান করে যে বিশ্ব খুব শীঘ্রই অস্থিরতায় পড়বে। কারণ, বিশ্বের দুটি যুদ্ধ অনেকটাই দৃশ্যমান, যে যুদ্ধ দুটির খুব সহজে শেষ হবে না। অথচ যুদ্ধে জড়িত দেশগুলো খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহে অন্যতম অবদান রাখে। আবার বিশ্ব অর্থনীতির ৩১ শতাংশ অবদান রাখা রাষ্ট্রটি নিজেই আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত। যেমন, দেশটির জাতীয় ঋণ এক দশকে দ্বিগুণ হয়ে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ঋণের সুদ পরিশোধে কর-রাজস্বের ২০ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে। আর জর্জরিত বলেই অন্য রাষ্ট্রকে শুল্কনীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। তাই হয়তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত না হলেও বিশ্ব এক চরম মন্দায় পতিত হবে, এটা অনেকটাই অনুমেয়। বাংলাদেশ কি সেই অগ্রিম প্রস্তুতি এবং নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবে?
বাংলাদেশের উচিত এ বিষয়গুলো মাথায় নিয়ে ধীরস্থিরভাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে সে লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। প্রতিবেশীর সাথে সাম্য ও মর্যাদার ভিত্তিতে সুসম্পর্ক রক্ষা করা, কখনোই বৈরিতা কাম্য নয় এবং যার কাছ থেকে যতটুকু সুবিধা গ্রহণ করা যায়, সেই সুবিধাটুকু অর্জন করা। খাদ্যশস্য থেকে শুরু করে প্রতিটি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ন্যূনতম পর্যায়ে মজুদ বৃদ্ধি করা। বিশেষ করে খাদ্য ও জ্বালানি। বাংলাদেশের জ্বালানি নিয়ে যা হচ্ছে, তা কখনোই কাম্য নয়। আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতে জ্বালানি সংকট তৈরি হবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু তা নিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে, এটা স্বাভাবিক নয়। এখানেই সরকারের দক্ষতার পরিচয় বহন করে। সবাই বিশ্বাস করে, বর্তমান সরকার সকল সমস্যার সুন্দরভাবে সমাধান করবে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারকে বিতাড়িত করার অন্যতম কারণ হলো, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, যা মানুষকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। ফলে, সাধারণ জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হয় এবং আন্দোলন বেগবান করেন। একটি সময় বিগত সরকার পালাতে বাধ্য হয়। বর্তমান সরকারকে সেই দিকটা স্মরণ রাখতে হবে।
বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের আগের ১৯৭৩ সালের ১০ জুন দৈনিক পত্রিকায় একটি খবর ছাপা হয়। গাইবান্ধা শহর থেকে ১০ মাইল দূরবর্তী মহিমাগঞ্জ এলাকা থেকে আগত ৫ শতাধিক অর্ধ-উলঙ্গ নারী মিছিল সহকারে শহরের প্রধান রাস্তা প্রদক্ষিণের পর মহকুমা প্রশাসকের বাসভবন ঘেরাও করে কাপড়ের দাবি জানায়। ওই একই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, থানার তুলসিঘাট এলাকায় জনৈকা শাশুড়ি বস্ত্রাভাবে জামাইয়ের সামনে ঘর থেকে বেরোতে না পেরে আত্মহত্যা করেন। এমনই হয়েছিল বস্ত্র সংকটে জর্জরিত বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের চিত্র।
বর্তমান বাংলাদেশের চিত্র একটু ভিন্ন। বাংলাদেশ বর্তমানে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার দ্বার প্রান্তে। তাই এমন মিছিল হবে না, এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমান সময়ে যে চিত্র লক্ষ্য করা যায়, যেমন- সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি রিলস বেশ জনপ্রিয় হয়, যেখানে দেখা যায় একজন নারী বিদ্যুৎ বিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির সামনে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে এবং ঈদের আগে যোগাযোগমন্ত্রীর কথায় স্কুল পড়ুয়া এক ছেলের সরাসরি প্রতিবাদ- এসব বিষয় ভালো বার্তা দেয় না। সুতরাং এগুলো একটি সংকেত বা বার্তা। এ সমস্ত বিষয় আমলে নিয়ে, আরো বেশি সংযত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান সময়ে বিরোধী দল এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে বৈরিতা করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা সহজ হবে না। বিপদকালে বা আপৎকালে সকলকে সঙ্গে নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে হবে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বমন্দা খুবই সন্নিকটে। বিশ্বমন্দা আসুক বা না আসুক, আপনাকে প্রস্তুত থাকতেই হবে। তবেই হয়ত খুব সহজে এই সংকট মোকাবেলা করা বা বিশ্বমন্দার হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









