একটি দেশের অর্থনীতির চাকা কতটা সচল ও গতিশীল থাকবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে সে দেশের ব্যাংকিং খাতের সার্বিক স্বাস্থ্য ও কার্যকারিতার ওপর। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্র সঞ্চয় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়ন- সবকিছুর পেছনেই এক অদৃশ্য অথচ শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে ব্যাংক।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে আশির দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত বাংলাদেশের আর্থিক খাত ছিল পুরোপুরি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত। পরবর্তীতে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আশির দশকের প্রথমার্ধে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচির আওতায় আসে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে বেসরকারিকরণ ও উদারীকরণের সূচনা ঘটে এবং পুরো খাতের কাঠামোগত আমূল পরিবর্তন হয়। সেই ঐতিহাসিক রূপান্তরের পর থেকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে এক তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ।
তবে নিছক শাখা বৃদ্ধি বা চোখধাঁধানো বিজ্ঞাপনের আড়ালে একটি ব্যাংকের প্রকৃত সক্ষমতা কতটা মজবুত, তা নির্ণয় করা সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যাংকিং খাত কেবল অর্থ লেনদেনের কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি কোটি মানুষের আস্থার আমানতখানা। তাই এই খাতের সঠিক দক্ষতা মূল্যায়ন করা কেবল বিনিয়োগকারীদের জন্যই নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির টেকসই ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বিশালত্ব ও ব্যাপ্তি আজ চোখে পড়ার মতো। অর্থনীতির প্রতিটি ধমনীতে রক্ত সঞ্চালন নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে এর কার্যক্রম। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট ৪৭টি ব্যাংক পরিচালিত হচ্ছে; যার মধ্যে রয়েছে ৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক, ৪টি বিশেষায়িত উন্নয়ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ৩০টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক। সারা দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা ৭,২৪৬টি শাখার মাধ্যমে এই সুবিশাল আর্থিক নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে। এই বিপুল কর্মযজ্ঞের আর্থিক পরিধিও বিশাল; ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪,৪১১.৯৮ বিলিয়ন টাকা এবং সাধারণ মানুষের গচ্ছিত আমানতের পরিমাণ ৩,৩২৯.০৮ বিলিয়ন টাকা।
ব্যাংকের মূল চালিকাশক্তি ও সবচেয়ে কম খরচের তহবিল হলো গ্রাহকদের এই আমানত। সংগৃহীত এই বিপুল আমানতকে ব্যাংক কতটা দক্ষতার সঙ্গে লাভজনক ঋণে রূপান্তরিত করতে পারছে, তার ওপরই নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানটির সুদজনিত আয় ও সার্বিক মুনাফা। আমানত ও ঋণের এই চক্রই ব্যাংকের টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন। ব্যাংক যদি গচ্ছিত এই অর্থ লাভজনক খাতে বিনিয়োগ বা ঋণ হিসেবে পরিচালনায় ব্যর্থ হয়, তবে তা কেবল মুনাফাতেই ধস নামায় না, বরং আমানতকারীদের জন্যও ভয়াবহ অশনিসংকেত হয়ে দেখা দেয়। তাই এই অর্থের সর্বোচ্চ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যে কোনো ব্যাংকের জন্যই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও নৈতিক দায়িত্ব।
বাইরে থেকে কোনো ব্যাংকের বিশাল ভবন বা সম্পদের পাহাড় দেখে তার আসল আর্থিক স্থায়িত্ব বোঝা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন নিখুঁত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও পরিমাণগত বিশ্লেষণ। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ শক্তি, আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা এবং সার্বিক স্থিতিশীলতা পরিমাপের জন্য বিশ্বব্যাপী একটি জনপ্রিয় ও কার্যকর পদ্ধতি হলো 'ক্যামেল' অনুপাত বিশ্লেষণ। এটি মূলত ব্যাংকের স্বাস্থ্য পরীক্ষার এক পূর্ণাঙ্গ এক্স-রে রিপোর্ট, যার মাধ্যমে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড বিশ্লেষণ করা হয়- মূলধনের পর্যাপ্ততা, সম্পদের গুণগত মান, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, উপার্জনক্ষমতা এবং তারল্য।
মূলধনের পর্যাপ্ততা হলো ব্যাংকের মেরুদণ্ড, যা যে কোনো অপ্রত্যাশিত আর্থিক ক্ষতির আকস্মিক ধাক্কা সামলে ওঠার ক্ষেত্রে সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এই অনুপাতটি যত শক্তিশালী হবে, ব্যাংকের আর্থিক ভিত ততটাই মজবুত বলে গণ্য হবে। অন্যদিকে, ব্যাংকের উপার্জনক্ষমতা পরিমাপের ক্ষেত্রে 'রিটার্ন অন অ্যাসেট' (আরওএ) এবং 'রিটার্ন অন ইক্যুইটি' (আরওই) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। উপাত্ত অনুযায়ী, ব্যাংকের মুনাফা অর্জনের হার ও তারল্য পরিস্থিতির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সুস্বাস্থ্যের সরাসরি ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে; অর্থাৎ, এই সূচকগুলো যত উন্নত হবে, ব্যাংকটির দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি ততটাই কমে আসবে। ২০০৪ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ আট বছরের সময়ভিত্তিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এই মানদণ্ডগুলোর ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণির ব্যাংকের কার্যক্ষমতায় দৃশ্যমান পার্থক্য রয়েছে, যা আমাদের ব্যাংকিং খাতের অন্তর্নিহিত শক্তি ও দুর্বলতার এক নিখুঁত চিত্র তুলে ধরে।
ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাধি বা নীরব ঘাতক হলো খেলাপি ঋণ, যা একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্পদের গুণগত মানকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়। গভীর পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে আমাদের ব্যাংকিং খাতের এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। উপাত্ত থেকে প্রমাণিত হয়, মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের অনুপাত এবং ব্যাংকের সুদজনিত আয়ের মধ্যে এক শক্তিশালী নেতিবাচক সম্পর্ক বিদ্যমান। পুরো ব্যাংকিং শিল্পের ক্ষেত্রে এই নেতিবাচক সম্পর্কের মাত্রা -০.৯৬২২, যা পরিসংখ্যানের ভাষায় অত্যন্ত জোরালো ও উদ্বেগজনক একটি সংকেত।
সহজ কথায়, ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার যত কমবে, তার সুদজনিত আয় তত দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। ব্যাংক যখন ঋণ হিসেবে দেওয়া মূলধন সঠিক সময়ে ফেরত পায় না, তখন সেই বিপুল অর্থ অর্থনীতিতে অলস হয়ে পড়ে এবং নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এখানেই মূলত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা দক্ষতার আসল পরীক্ষা। আমানতের বিপরীতে কী পরিমাণ ঋণ দেওয়া হচ্ছে এবং পরিচালন ব্যয় কীভাবে দক্ষতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, তা-ই একটি ব্যাংকের চূড়ান্ত নিয়তি নির্ধারণ করে দেয়। তাই ব্যাংকিং খাতকে যদি সত্যিকার অর্থে লাভজনক, গতিশীল ও টেকসই হতে হয়, তবে যে কোনো মূল্যে খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে; এর কোনো বিকল্প নেই।
তীব্র প্রতিযোগিতার এই যুগে টিকে থাকতে হলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক- উভয় দিক থেকেই আসা নানামুখী অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত চাপ মোকাবিলার সক্ষমতা ব্যাংকিং খাতকে অর্জন করতেই হবে। আমাদের দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি, বিদেশি ও বিশেষায়িত- এই চার ধরনের ব্যাংকের পারফরম্যান্সের তুলনামূলক চিত্র দেখিয়ে দেয় যে, কেবল সম্পদের পরিমাণ বা শাখার সংখ্যা বৃদ্ধিই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। একটি ব্যাংকের প্রকৃত সাফল্য ও দীর্ঘস্থায়িত্ব লুকিয়ে থাকে আমানতের দক্ষ ব্যবহার, ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ এবং কঠোর হাতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার ওপর।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশের সার্বিক ও টেকসই উন্নয়নের প্রধান পূর্বশর্ত হলো এক সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ ও কার্যকর ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ব্যাংকগুলো যখন তাদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা সাহসিকতার সঙ্গে কাটিয়ে ওঠে এবং আর্থিক সূচকগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক ধারা বজায় রাখে, তখন তা কেবল তাদের নিজেদেরই লাভজনক করে না, বরং কোটি কোটি মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাও সুনিশ্চিত করে। সাধারণ মানুষের আস্থার ওপর ভর করেই একটি দেশের অর্থনীতি তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়, আর সুস্থ ব্যাংকিং খাত সেই অগ্রযাত্রার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সারথি হিসেবে কাজ করে।
লেখক : কবি ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









