তিন দিন আগে ঢাকা গিয়েছিলাম। ঢাকা থেকে ফেরার পথে কয়েকটি জায়গায় চোখে পড়ল সুন্দর সুন্দর তোরণ। বড় বড় সাইনবোর্ডে লেখা দরবার শরীফ। কোথাও কোনো বাবার নাম। কোথাও কোনো পীরের নাম। রাস্তার পাশে এমন অনেক দরবার শরীফ দেখে মনে হলো, এগুলোকে ঘিরে নিশ্চয়ই বড় ধরনের জনসমাগম ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্পৃক্ত রয়েছে। বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তুলল।
যে গাড়িতে ফিরছিলাম সেটি ছিল একটি প্রাইভেট গাড়ি। গাড়ির চালককে জিজ্ঞেস করলাম, এসব দরবার শরীফে কখনো গিয়েছেন কিনা। তিনি জানালেন, নিয়মিতই যান। অনেক মানুষ সেখানে যান। কেউ সিন্নি দেন। কেউ নজরানা দেন। আমি জানতে চাইলাম, এসব সিন্নি কারা খান? নজরানার টাকা কারা গ্রহণ করেন? চালক তখন ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। তার দৃষ্টিতে যেন একটা প্রশ্ন ছিল, এসব বিষয়ও কি আমাকে বুঝিয়ে বলতে হবে?
আমি আসলে তাকে পরীক্ষা করছিলাম। জানতে চাইছিলাম, মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক সম্পর্কটা কী। আমাদের দেশের অনেক মানুষ বিশ্বাস করেন, কোনো পীর বা বুজুর্গের দরবারে হাজিরা দিলে বিপদ-আপদ দূর হয়। বিশেষ করে, অনেক পেশাদার গাড়িচালক মনে করেন, দরবারে নজরানা দিলে রাস্তায় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। গাড়ি নিরাপদে চলবে। পথের বিপদ কেটে যাবে। এটি যার যার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়। মানুষের বিশ্বাস নিয়ে বিদ্রূপ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু বিশ্বাসের জায়গা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জায়গা এক বিষয় নয়।
একজন মানুষ নিজের বিশ্বাস থেকে কোনো মাজারে দান করতে পারেন। সিন্নি দিতে পারেন। কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অর্থ দিতে পারেন। কিন্তু সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, কে পরিচালনা করছেন এবং কত টাকা কোথা থেকে আসছে, এসব প্রশ্ন করার অধিকার মানুষের অবশ্যই থাকা উচিত। কারণ, দান ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় হলেও দানের অর্থ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি জনস্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। আমার আপত্তি কোনো পীর, বুজুর্গ বা আলেমের প্রতি নয়। যারা আল্লাহওয়ালা মানুষ হিসেবে মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন, তাদের প্রতি মানুষের সম্মান থাকতেই পারে।
আমার প্রশ্ন, মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে। বিশেষ করে, সেখানে যদি বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হয় এবং সেই অর্থের আয়-ব্যয়ের কোনো স্বচ্ছ হিসাব না থাকে, তাহলে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। একজন মানুষ ইন্তেকাল করার পর তাঁর প্রতি সম্মান দেখানো এক বিষয়। তাঁর কবরকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা আরেক বিষয়। কবরের মানুষ তো আর সেই অর্থ নিজের হাতে গ্রহণ করতে পারেন না। তাহলে তাঁর নামে সংগৃহীত অর্থের প্রকৃত মালিকানা, ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে, সেটি জানা প্রয়োজন। কোথায় কত টাকা উঠছে এবং সেই টাকা কোথায় যাচ্ছে, তার একটি গ্রহণযোগ্য হিসাব থাকা দরকার।
আমাদের দেশে অনেক মাজার ও দরবার শরীফ রয়েছে। কোথাও প্রতিদিন মানুষ আসে। কোথাও সাপ্তাহিক বা বার্ষিক আয়োজন হয়। কোথাও সিন্নি বিতরণ করা হয়। কোথাও দান বাক্স থাকে। কোথাও নগদ নজরানা দেওয়া হয়। কোথাও জমি, সম্পদ বা অন্যান্য সম্পত্তিও থাকতে পারে। এত বড় একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ হিসাব কি আমাদের কাছে আছে? প্রশ্ন হওয়া উচিত, বাংলাদেশে মোট কতটি মাজার আছে? কতটি দরবার শরীফ আছে? কতটি ওয়াক্ফ সম্পত্তির আওতায় রয়েছে? কতটি ট্রাস্ট বা অন্য কোনো বৈধ কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে? কতগুলোর নিয়মিত আয় ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করা হয়? এসব প্রতিষ্ঠানে বছরে কত টাকা দান হিসেবে জমা পড়ে? কত টাকা জনকল্যাণে ব্যয় হয়? এসব তথ্য সাধারণ মানুষের সামনে কতটা প্রকাশিত হয়? যদি সরকারের কাছে এসবের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান না থাকে, তাহলে এখনই একটি জাতীয় তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ওয়াক্ফ প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে দেশের মাজার ও দরবার শরীফগুলোর একটি তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে পারে। কোন প্রতিষ্ঠান কোথায়, তার ব্যবস্থাপনা কার হাতে, কী ধরনের সম্পত্তি রয়েছে এবং বার্ষিক আয়-ব্যয় কত, এসব তথ্য পর্যায়ক্রমে সংগ্রহ করা যেতে পারে। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। আমি মাজার বন্ধ করার কথা বলছি না। কারো ধর্মীয় বিশ্বাসে হস্তক্ষেপ করার কথাও বলছি না। কেউ মাজারে যাবেন কি যাবেন না, দান করবেন কি করবেন না, সেটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্রের কাজ হওয়া উচিত মানুষের বিশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করা নয়। রাষ্ট্রের কাজ হওয়া উচিত অর্থনৈতিক কার্যক্রমে আইন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। আমার মনে হয়, মাজার বা দরবার শরীফে সংগৃহীত অর্থের হিসাব একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার মধ্যে আনা যেতে পারে।
দান বাক্স থেকে পাওয়া অর্থের হিসাব রাখা যেতে পারে। বড় অঙ্কের অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রহণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেই হিসাব সাধারণ মানুষের জন্য প্রকাশের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে প্রকৃত ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে। আরো একটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। যেসব প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ অর্থ দান হিসেবে আসে, তাদের বৈধ কাঠামোর মধ্যে থেকে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কল্যাণে অর্থ ব্যয়ের ব্যবস্থা করা যায় কিনা, তা নিয়ে নীতিগত আলোচনা হতে পারে।
কোনো দরিদ্র মানুষকে ব্যবসার পুঁজি দেওয়া যেতে পারে। কাউকে গবাদিপশু কিনে দেওয়া যেতে পারে। কাউকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া যেতে পারে। কোনো অসহায় পরিবারকে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। কোনো দরিদ্র শিক্ষার্থীর পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়া যেতে পারে। এতে দানের অর্থ মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। আমাদের দেশে এখনো বহু মানুষ দিনে একবেলা খাবার জোগাড় করতে পারেন না। অনেক পরিবার চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারে না। অনেক তরুণ সামান্য পুঁজির অভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন না। সেখানে মানুষের ধর্মীয় আবেগ থেকে সংগৃহীত অর্থ যদি পরিকল্পিতভাবে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়, তাহলে এর সামাজিক প্রভাব অনেক বড় হতে পারে। আমি একই বিষয় ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও দেখতে চাই। দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে দেশ-বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অনুদান সংগ্রহ করা হয়। সব প্রতিষ্ঠানকে সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই।
অসংখ্য প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত সৎভাবে মানুষের অর্থ ব্যবহার করে। কিন্তু যেখানেই বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়, সেখানেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন। বিদেশ থেকে আসা অনুদান আইনগত ও ব্যাংকিং নিয়ম মেনে দেশে আসছে কিনা, অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে কিনা, সেগুলোও নিয়মিত যাচাই হওয়া উচিত। এ কথা বললে কেউ যেন এটিকে মাদ্রাসাবিরোধী বক্তব্য মনে না করেন। এটি ইসলামী শিক্ষার বিরোধিতা নয়। বরং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করার দাবি। স্বচ্ছতা কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। জবাবদিহিতা কোনো ইবাদতের বিরুদ্ধে নয়। মানুষের দেওয়া আমানতের হিসাব রাখা নৈতিক দায়িত্বেরই অংশ। আমাদের দেশে ধর্মীয় অনুভূতি অত্যন্ত শক্তিশালী। এই অনুভূতিকে সম্মান করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন মানুষের অর্থের ওপর অস্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোনো মাজারে মানুষের বিশ্বাস থাকতেই পারে। কিন্তু সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কেউ ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ে তুলছে কিনা, সেটি দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের রয়েছে। আমরা যদি সত্যিই পীর-বুজুর্গদের সম্মান করি, তাহলে তাঁদের নামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোতেও স্বচ্ছতা চাইতে পারি। এতে তাঁদের সম্মান কমবে না। বরং মানুষের আস্থা বাড়বে। যারা সত্যিকার অর্থে মানুষের কল্যাণ করতে চান, তারা হিসাব দিতে ভয় পাওয়ার কথা নয়। তাই আমার প্রস্তাব খুব সাধারণ। দেশে কতগুলো মাজার ও দরবার শরীফ আছে, তার একটি পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান তৈরি করা হোক। তাদের আইনগত অবস্থান নির্ধারণ করা হোক।
যেসব প্রতিষ্ঠানে মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়, সেসব অর্থের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করা হোক। প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা হোক। আর দানের অর্থের একটি অংশ কীভাবে দরিদ্র মানুষের কল্যাণে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটিও বিবেচনা করা হোক। কারো বিশ্বাস কেড়ে নেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করাও নয়। আমার প্রশ্ন শুধু মানুষের দেওয়া অর্থ নিয়ে। বিশ্বাস ব্যক্তিগত হতে পারে। কিন্তু মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থের হিসাব অস্বচ্ছ থাকা উচিত নয়। মাজারে যার যে বিশ্বাস, সে বিশ্বাস তার থাকুক। পীর-বুজুর্গদের প্রতি যার যে সম্মান, সেটিও থাকুক। কিন্তু মাজারের নামে মানুষের কাছ থেকে যে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেই অর্থের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হোক। ধর্মীয় অনুভূতি থাকুক। তার সঙ্গে থাকুক সুশাসন, সততা এবং মানুষের কল্যাণ। তাহলেই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা আরো শক্তিশালী হবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









