পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা, উন্নয়ন, ভূমি বিরোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মতো জটিল বিষয়গুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে সরকার উচ্চপর্যায়ের তিনটি কমিটি গঠন করেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারিকৃত পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে গঠিত এসব কমিটির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের জটিল সমস্যাগুলোর টেকসই সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সরকারের এ উদ্যোগের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো- পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে শুধু নিরাপত্তা কিংবা শুধু উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে নিরাপত্তা, ভূমি, প্রশাসন, উন্নয়ন, সীমান্ত সুরক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে একই কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয়, নির্বাহী ও পরামর্শক- এই তিন স্তরের কমিটি গঠনের ফলে নীতিনির্ধারণ, বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত গ্রহণের মধ্যে সমন্বয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা।
১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৯ বছর পরও এর মৌলিক ধারাগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং আদিবাসীদের অধিকার নিশ্চিত হয়নি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে পাহাড়িরা অন্তত দুবার রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার হয়েছে। এতে অন্তত সাত আদিবাসী নিহত হন। অথচ পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব স্থানীয় প্রতিনিধির হাতে দেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি।
গত ১০ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পৃথক প্রজ্ঞাপনে প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটি, স্বরাষ্ট্রসচিবকে সভাপতি করে নির্বাহী কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়। পরামর্শক কমিটিকে দুই মাসের মধ্যে উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাহী কমিটি তিন মাসের মধ্যে জাতীয় কর্মকৌশলের খসড়া করবে। জাতীয় কমিটি তা চূড়ান্ত করবে।
নির্বাহী কমিটিকে প্রচলিত আইন, চুক্তির শর্ত ও বিধিবিধান পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংস্কার এবং নতুন আইন প্রণয়নের সুপারিশও করতে বলা হয়েছে। এসব উদ্যোগ আশাজনক মনে হলেও এতে শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বৈধ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা, কমিটিগুলো গোয়েন্দা নিয়ন্ত্রণমুক্তভাবে পুনর্গঠন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান বাস্তবতায় এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই অনুভূত হয়ে আসছে। পাহাড়ে বিভিন্ন সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, সংঘাত ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের কারণে সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। জেএসএস (সন্তু) ও ইউপিডিএফ (প্রসীত)-সহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর পারস্পরিক বিরোধও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় নতুন কমিটিগুলো সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ মোকাবিলা, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং পাহাড়ে বসবাসরত সব সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত কর্মকৌশল প্রণয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে প্রচলিত আইন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির শর্ত এবং বিদ্যমান বিধি-বিধান পর্যালোচনার সুযোগ থাকায় দীর্ঘদিনের নীতিগত ও প্রশাসনিক জটিলতাগুলোও চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পরামর্শক কমিটিতে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন সংক্রান্ত কাঠামো, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, আঞ্চলিক পরিষদ এবং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়েছে। ফলে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও স্থানীয় অংশীজনদের মতামত বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সার্বিকভাবে, সরকারের এ উদ্যোগকে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাকে বিচ্ছিন্নভাবে মোকাবিলা না করে একটি সমন্বিত জাতীয় নীতির আওতায় আনার প্রয়াস হিসেবে দেখা যেতে পারে। কমিটিগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবভিত্তিক সুপারিশ, নিরপেক্ষভাবে সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণ এবং দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভূমি বিরোধের ন্যায়সংগত সমাধান, উন্নয়ন কার্যক্রমের সুফল নিশ্চিতকরণ এবং সব সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা তৈরির মাধ্যমে এগোতে পারলে পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম এলাকার মানুষের জীবিকা উন্নয়ন, জলাধার ব্যবস্থাপনা ও প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্পে প্রায় ৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের সুপারিশ করেছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। অতি সম্প্রতি সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত এ প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) যৌথ অর্থায়নে ‘জলবায়ু সহনশীল জীবিকা উন্নয়ন ও পার্বত্য চট্টগ্রামে জলাধার’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রকল্পের কার্যক্রম পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে পরিচালিত হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের একটি প্যাকেজের আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হয়। এতে ৫৭ কোটি ৯০ লাখ ১৭ হাজার ৬৫২ টাকা ব্যয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম এলাকার মানুষের জীবিকা উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হবে।
পাশাপাশি জলাধার ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ থাকবে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্প বাস্তবায়নে কারিগরি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি পরিকল্পনা প্রণয়ন, বিভিন্ন কার্যক্রমের তদারকি ও ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য এলাকার জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা আরো টেকসই করার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে জলাধার ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সহায়তা করবে এ উদ্যোগ।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে দীর্ঘদিন ধরেই বহু জাতি, বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতি ও বহু ধর্মের মানুষের সম্মিলিত বসবাস। এই বৈচিত্র্যই বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম শক্তি ও গৌরব। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রাম খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান। এই বৈচিত্র্যের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি, যেখানে পাহাড়, বন, নদী, জীববৈচিত্র্য এবং ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জীবনধারা মিলেমিশে এক অপূর্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরি করেছে। আমাদের দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এটা উপলব্ধি করতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যের এক জীবন্ত জনপদ।
এখানে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, খুমি, লুসাইসহ প্রায় ১৩টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত বসবাস রয়েছে। প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও জীবনধারা, যা এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধিকে বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। এই বৈচিত্র্য কোনো বিভাজনের প্রতীক নয়, বরং এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত শক্তি, সম্ভাবনা ও পরিচয়ের মূল ভিত্তি। তবে দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কিছু চ্যালেঞ্জ ও সংকট পরিলক্ষিত হয়েছে। কখনো কখনো জাতিগত পরিচয়কে কেন্দ্র করে ভুল বোঝাবুঝি, পারস্পরিক অবিশ্বাস, গুজব ও অপপ্রচারের কারণে সামাজিক পরিবেশে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
এসব পরিস্থিতি শান্তি, উন্নয়ন ও সহাবস্থানের জন্য অনুকূল নয়। একটি অঞ্চলের স্থায়ী অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন সেখানে বসবাসরত সকল জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা, শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার পরিবেশ সুদৃঢ় থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে মৌলিক সত্য হলো, এখানে বসবাসকারী সকল জনগোষ্ঠীই বাংলাদেশের নাগরিক। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ভিন্ন হলেও জাতীয় পরিচয়ের জায়গায় সবাই সমান ও অভিন্ন। এই অভিন্ন পরিচয়কে শক্তিশালী করা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে প্রতিষ্ঠিত করাই শান্তি ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি। কোনো জনগোষ্ঠীকে ছোট করে দেখা, অবমূল্যায়ন করা বা সাংস্কৃতিক পরিচয়কে অস্বীকার করা সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে এবং দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে।
শান্তি ও সম্প্রীতির মূল শর্ত হলো- পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও একে অপরের অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসকে সম্মান করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বিভাজনমূলক বক্তব্য, উসকানি, গুজব ও অপপ্রচার থেকে সবাইকে দূরে থাকতে হবে। ইতিহাস প্রমাণ করে, যে সমাজে সংলাপ, সহনশীলতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া শক্তিশালী, সেখানে সংঘাতের সম্ভাবনা অনেক কমে যায় এবং উন্নয়নের পথ সুগম হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন নীতি গ্রহণ অপরিহার্য। উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কৃষি, পর্যটন, কর্মসংস্থান এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সমন্বিত অগ্রগতি। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি।
আমরা জানি, উন্নয়ন তখনই সফল হয়, যখন তা সকল জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। কোনো একটি সম্প্রদায়কে উন্নয়ন প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলে তা সামাজিক বৈষম্য ও অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের মতামত, প্রয়োজন ও বাস্তবতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা যে কোনো উন্নয়ন প্রক্রিয়ার পূর্বশর্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চলে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। গুজব, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য অনেক সময় সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। তাই তথ্যের সত্যতা যাচাই করা এবং দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রত্যেক নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দায়িত্বশীল, নিরপেক্ষ ও তথ্যনির্ভর সাংবাদিকতা সমাজে আস্থা ও বোঝাপড়া বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে বিভ্রান্তিকর বা পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ সামাজিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। তাই গণমাধ্যমকে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে সহাবস্থানমূলক। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং সামাজিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যকে আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পারস্পরিক উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সামাজিক সম্প্রীতির উদ্যোগ এবং যৌথ কার্যক্রম মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও আস্থা বৃদ্ধি করতে পারে। তরুণ প্রজন্ম এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্মাতা। তাদের চিন্তাভাবনা, শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গি আগামী দিনের শান্তি ও উন্নয়নের ভিত্তি নির্ধারণ করবে। তাই তরুণদের মধ্যে সহনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও জাতীয় ঐক্যের চেতনা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সামাজিক সম্প্রীতি, নৈতিক শিক্ষা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ আরো জোরদার করা প্রয়োজন। পার্বত্য চট্টগ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশগত বৈচিত্র্য।
এই অঞ্চল পর্যটন, কৃষি ও পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিপুল সম্ভাবনাময়। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, বন উজাড় ও প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার ভবিষ্যতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতৃত্ব, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত ভূমিকা অপরিহার্য। কোনো একক পক্ষের প্রচেষ্টায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থার ভিত্তিতেই একটি স্থিতিশীল ও উন্নত সমাজ গড়ে ওঠে। পার্বত্য চট্টগ্রাম কোনো একক জনগোষ্ঠীর নয়, এটি বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সব জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত আবাসভূমি। এখানে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকার, মর্যাদা ও দায়িত্ব রয়েছে। এই সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতেই সামাজিক শান্তি ও উন্নয়ন টেকসই হতে পারে।
ফলে জাতিগত বিভাজনের পরিবর্তে জাতীয় ঐক্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। ভিন্নতা আমাদের দুর্বলতা নয়, বরং সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি শক্তিতে পরিণত হতে পারে। সংলাপ, সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব। সবশেষে বলা যায়,পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমাদের সম্মিলিত সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর। বিভাজন নয়, সম্প্রীতি। অবিশ্বাস নয়, আস্থা। সংঘাত নয়, সংলাপ। এই হোক আমাদের পথচলার মূল দর্শন। একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও সম্প্রীতিময় পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়ে তোলা শুধু একটি লক্ষ্য নয়, এটি আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব ও অঙ্গীকার।
লেখক : কথাসাহিত্যিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









