সংশ্লিষ্ট যে কেউ এটা বিনা সংকোচে স্বীকার করবেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যে-সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে তা খুব 'সুখের সময়' নয়। সেই ‘সহজ পাঠ’, ‘বীর পুরুষ’, কিংবা ‘পোস্টমাস্টার’ বদলে গিয়ে আজ TED Talk, Kindle-এর দুনিয়ায় বিচরণ শিক্ষার্থীদের। পরিবর্তন তাদের ক্লাসরুম ভাবনায়, ক্যারিয়ার গঠনে, পরিবর্তন তাদের মননে, চিন্তায়। প্রযুক্তি, বৈশ্বিক যোগাযোগ, আর্থ-সামাজিক অবস্থা বদলে দিয়েছে তাদের ভাবনার জগত। আজকের শিক্ষার্থীদের সেই মানসিক, প্রযুক্তিগত ও সামাজিক রূপান্তরের মুখে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে দাঁড়িয়ে আছে- তা নিয়ে ভাবার সময় বোধয় এখনই।
এক সময় শিক্ষার্থীর হাতে থাকত বই, খাতা, কলম। শিক্ষকের মুখের কথাই ছিল জ্ঞানের প্রধান উৎস। পাঠ্যবই ছিল জানার জানালা, আর শ্রেণিকক্ষ ছিল সেই জানালার সামনে বসে পৃথিবীকে দেখার জায়গা। আজকের শিক্ষার্থী সেই পৃথিবীতে বাস করে না। তার হাতে বইয়ের পাশাপাশি স্মার্টফোন, সামনে শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি ইউটিউব, গুগল, ফেসবুক, টিকটক, অনলাইন কোর্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অসংখ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। সে একই সঙ্গে স্থানীয় ও বৈশ্বিক। ফলে, বদলে গেছে শিক্ষার্থী। বদলেছে তার চিন্তার ধরন, মনোযোগের কাঠামো, সম্পর্কের ধরন, জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি, স্বপ্ন, ভয়, আকাঙ্ক্ষা এমনকি নিজের পরিচয় নির্মাণের পদ্ধতিও। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলাতে পেরেছে? উত্তরটি খুব আশাব্যঞ্জক নয়।
এটা সত্য-বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে প্রবেশাধিকার ও বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু বিদ্যালয়ে যাওয়া আর শেখা বা জ্ঞান অর্জন এক বিষয় নয়। ২০২৬ সালের বাংলাদেশ এডুকেশন সেক্টর এনালিসিস-এর প্রাথমিক তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিক পর্যায়ে প্রবেশাধিকারের উন্নতি হলেও উচ্চতর স্তরে ঝরে পড়া এখনো বড় সমস্যা; প্রায় অর্ধেক শিশুর মৌলিক পঠন দক্ষতা এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশের মৌলিক গণনাদক্ষতা অর্জিত হয়নি।
একই বিশ্লেষণে দরিদ্র, প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বৈষম্যের কথাও উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইনডিকেটর সার্ভে-এর তথ্য আরো গুরুত্বপূর্ণ। ৭-১৪ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৫০.২ শতাংশের মৌলিক পড়ার দক্ষতা এবং ৩৯.২ শতাংশের মৌলিক গণনাদক্ষতা রয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়ে থাকার হারও মাত্র ৫০.৮ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার হার ৪৩.৯ শতাংশ। অর্থাৎ আমাদের সংকট শুধু শিক্ষার্থী স্কুলে যাচ্ছে কিনা- সেটি নয়; স্কুলে গিয়ে সে কী শিখছে, কীভাবে শিখছে এবং সেই শিক্ষা তার জীবনকে কতটা প্রস্তুত করছে- সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
আজকের শিক্ষার্থী আগের চেয়ে অনেক বেশি তথ্যসমৃদ্ধ, কিন্তু সবসময় জ্ঞানসমৃদ্ধ নয়। এখানে টি এস এলিয়ট কে মনে পড়ে- ‘Where is the wisdom we have lost in knowledge? Where is the knowledge we have lost in information?’ শিক্ষার্থীরা দ্রুত তথ্য পায়, কিন্তু তথ্য যাচাই করার দক্ষতা সবসময় অর্জন করে না। তারা প্রশ্ন করতে চায়, কিন্তু অনেক সময় গভীরভাবে ভাবার ধৈর্য হারাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও, সংক্ষিপ্ত পোস্ট, রিলস কিংবা শর্টসের অভ্যাস তার মনোযোগের ধরন বদলে দিচ্ছে। বর্তমানে একজন শিক্ষার্থী যখন একই সময়ে নোটিফিকেশন, মেসেজ, ভিডিও, অনলাইন ক্লাস, গেম এবং পড়াশোনার মধ্যে চলাচল করে, তখন দীর্ঘ সময় ধরে একটি বই পড়া বা একটি জটিল ধারণা নিয়ে চিন্তা করা তার কাছে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে, মুখস্থ করার ক্ষমতা হয়ত থাকে, কিন্তু গভীর পাঠ, বিশ্লেষণ, ধৈর্য, কল্পনা ও মননশীলতার জায়গায় তৈরি হচ্ছে নতুন সংকট।
তাই মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও শিক্ষার মূল আলোচনায় আসা প্রয়োজন। বাংলাদেশের ৩,৫৭১ জন স্কুলগামী কিশোর-কিশোরীর ওপর পরিচালিত একটি জাতীয় গবেষণায় কোভিড-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে মাঝারি থেকে তীব্র বিষণ্ণতার লক্ষণ ৩৭.৩ শতাংশ এবং উদ্বেগের লক্ষণ ২১.৭ শতাংশ পাওয়া গিয়েছিল। গবেষণায় একাডেমিক বিলম্বের উদ্বেগ, অভিভাবকের অন্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে তুলনা এবং সাইবার বুলিংয়ের সঙ্গে মানসিক সমস্যার সম্পর্কও পাওয়া যায়। অর্থাৎ শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনের মানুষ নয়। তার ভয় আছে, একাকিত্ব আছে, সামাজিক চাপ আছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে, পারিবারিক প্রত্যাশা আছে এবং নিজের সঙ্গে নিজেরও এক ধরনের সংগ্রাম আছে। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বাংলাদেশের তরুণদের জীবনকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছে।
এর ইতিবাচক দিক অস্বীকার করার উপায় নেই। একজন শিক্ষার্থী আজ পৃথিবীর যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতা শুনতে পারে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে, অনলাইন কোর্স করতে পারে, নিজের লেখা প্রকাশ করতে পারে, এমনকি নিজের উদ্যোগে একটি বৈশ্বিক পরিচয়ও তৈরি করতে পারে। কিন্তু একই প্ল্যাটফর্ম তাকে ভুল তথ্য, সাইবার বুলিং, ঘৃণামূলক বক্তব্য, অতিরিক্ত তুলনা এবং মানসিক চাপের মধ্যেও ফেলতে পারে। ২০২৫ সালে ইউনিসেফ বালাদেশের প্রায় ২৯ হাজার তরুণের U-Report জরিপে দুই-তৃতীয়াংশ উত্তরদাতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ভুয়া তথ্য ও মিস-ইনফরমেশনকে সবচেয়ে বড় উৎপীড়ক বা স্ট্রেসর হিসেবে উল্লেখ করেছে। বুলিং ও নেগেটিভ কমেন্টস এবং হার্মফুল/আপসেটিং কনটেন্টও উল্লেখযোগ্য উদ্বেগের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
তাই আজকের শিক্ষার্থীর জন্য শুধু ডিজিটাল লিটারেসি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ডিজিটাল উইজডম, যার মানে হলো- কোন তথ্য বিশ্বাস করব, কোনটি শেয়ার করব না, কোন কনটেন্ট আমাকে প্রভাবিত করছে, কোনটি আমাকে ব্যবহার করছে- এসব বোঝার ক্ষমতা। আবার এইআই এসে শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে পুরনো প্রশ্নগুলোর একটি নতুনভাবে সামনে এনেছে- শিক্ষার্থী কী জানে, নাকি সে কীভাবে জানতে পারে? চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা অন্যান্য জেনারেটিভি এআই দিয়ে একটি রচনা লেখা যায়, উত্তর তৈরি করা যায়, অনুবাদ করা যায়, সারাংশ তৈরি করা যায়, পেজেন্টেশন বানানো যায়, এমনকি গবেষণার ধারণাও পাওয়া যায়। ফলে, শুধু এসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীর শেখা যাচাই করা ক্রমেই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তবে এখানে এআইকে নিষিদ্ধ করার চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়। বরং শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে - এআই কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, কোথায় ব্যবহার করা যায় না, এআই-এর তথ্য কীভাবে যাচাই করতে হয়, সাইটেশন কীভাবে দিতে হয় এবং নিজের চিন্তার জায়গাটি কীভাবে অক্ষুণ্ণ রাখতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত এআই-রেসিস্টেন্ট এডুকেশন নয়, বরং এআই-এওয়ার এডুকেশন।
আজকের শিক্ষার্থীর আরেকটি বড় পরিবর্তন ঘটছে তার মনস্তস্ত্বে- অর্থাৎ নিজের সত্তা, পরিচয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বোধে। আগে একজন শিক্ষার্থীর পরিচয় অনেকটা নির্ধারিত হতো পরিবার, বিদ্যালয়, ধর্মীয়-সামাজিক পরিবেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতির মাধ্যমে। এখন তার পরিচয় নির্মাণে যুক্ত হয়েছে একটি বিশাল ভার্চুয়াল পৃথিবী। গ্লোবাল ভিলেজের বাসিন্দা এখন সে। কিন্তু এই বহুমাত্রিক পরিচয়ের সঙ্গে এসেছে পরিচয় সংকট। অন্যের জীবন, সাফল্য, পোশাক, ভ্রমণ, ফলাফল, লাইফ স্টাইল দেখে নিজের জীবনকে ছোট মনে করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিউরেটেড রিয়ালিটি অনেক সময় শিক্ষার্থীর আত্মমর্যাদাকে প্রভাবিত করে।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত শিক্ষার্থী বদলেছে, কিন্তু শিক্ষাদানের দর্শন যথেষ্ট বদলায়নি। এখনো অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার নম্বরই শিক্ষার প্রধান মাপকাঠি। শ্রেণিকক্ষ এখনও শিক্ষক কেন্দ্রিকই। শিক্ষক পড়ান, শিক্ষার্থী শোনে; শিক্ষক প্রশ্ন করেন, শিক্ষার্থী উত্তর দেয়; শিক্ষক এসাইনমেন্ট দেন, শিক্ষার্থী জমা দেয়- এই একমুখী কাঠামো এখনো প্রবল। কিন্তু পৃথিবী যখন রিয়াল লাইফ এডুকেশন, প্রবলেম সল্ভিং, ক্রিয়েটিভিটি, কমিউনিকেশন, কোলাবোরেশন, ক্রিটিক্যাল থিংকিং এবং এডাপটিবিলিটি চাইছে, তখন শুধু মুখস্থ জ্ঞান দিয়ে ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব নয়।
সংকটের একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের লারনিং পোভারটি ব্রিফ রিপোর্টে। রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাথমিকের শেষ পর্যায়ে বয়স উপযোগী একটি ছোট লেখা পড়ে অর্থ বুঝতে পারে না- এমন শিশুর হার ৫১ শতাংশ। আমরা হয়ত পরীক্ষার ফলাফল, জিপিএ, সার্টিফিকেট এবং ডিগ্রি নিয়ে অনেক কথা বলি। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী স্বাধীনভাবে একটি বই পড়ে বুঝতে পারছে কিনা, যুক্তি দিয়ে কথা বলতে পারছে কিনা, নিজের মতামত লিখতে পারছে কিনা, একটি সমস্যার সমাধান করতে পারছে কিনা- এই মৌলিক প্রশ্নগুলো অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়।
তাহলে করণীয় কী? প্রথমত, শিক্ষার লক্ষ্য পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়; একজন চিন্তাশীল, মানবিক, দক্ষ ও দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, মূল্যায়ন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু লিখিত পরীক্ষার পরিবর্তে প্রজেক্ট, প্রেজেন্টেশন, ভাইভা, পোর্ফোলিও, গ্রুপ ওয়ার্ক, রিফ্লেক্টিভ রাইটিং, প্রোবলেম সল্ভিং এবং রিয়াল লাইফ টাস্ক যুক্ত করতে হবে। এআই-এর যুগে এসেসমেন্ট এমন হতে হবে যেখানে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত চিন্তা ও প্রয়োগক্ষমতা দৃশ্যমান হয়। তৃতীয়ত, শিক্ষককে শুধু কনটেন্ট প্রোভাইডার হিসেবে দেখলে চলবে না। গুগল এবং এআই-এর যুগে শিক্ষক তথ্যের একমাত্র উৎস নন। শিক্ষককে হতে হবে মেন্টর, ফ্যাসিলিটেটর ক্রিটিক্যাল রিডার এবং লারনিং ডিজাইনার। শিক্ষককে নতুন প্রযুক্তি, এআই, ইনক্লুসিভ পেডাগজি, মেন্টাল হেলথ এবং ডিফারেনশিয়েটেড বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
বাংলাদেশে ইউনিসেফ-এর সাম্প্রতিক ডিফারেনশিয়েটেড টিচিং পাইলট-এও দেখা গেছে, শিক্ষার্থীর বর্তমান শেখার স্তর বুঝে সেই অনুযায়ী টিচিং করা এবং নিয়মিত আন্ডারস্ট্যান্ডিং চেক করা শেখার ক্ষেত্রে কার্যকর। চতুর্থত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেন্টাল হেলথ সাপোর্ট বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। কেননা, আমাদের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই এখন 'মন খারাপ', ‘ভাল্লাগে না’, ' আপসেট', 'ফ্রাস্টেটেড' রোগে ভোগে। শিক্ষার্থীর ওপর সবচেয়ে বড় চাপের একটি আসে কমপ্যারিজন কালচার থেকে- ‘ও এত পেল, তুমি কেন পারলে না?’ একজন শিশুকে প্রতিদিন অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে করতে আমরা হয়তো তার জিপিএ বাড়াতে পারি, কিন্তু আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিতে পারি। অভিভাবকের কাজ শুধু ফলাফল জানতে চাওয়া নয়; সন্তানের কথা শোনা, তার আগ্রহ বোঝা, ব্যর্থতাকে গ্রহণ করতে শেখানো এবং তার মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তাই প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর, রেফারাল মেকানিজম এবং সেফ স্পেস থাকা উচিত। আশার কথা, ইউনিসেফ-এর সহযোগিতায় বাংলাদেশে স্কুল-বেইসড মেন্টাল হেলথ এন্ড সাইকোলজিক্যাল সাপোর্ট বা এমএইচপিএসএস-এর উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে; এটিকে আরো বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক করা প্রয়োজন। পঞ্চমত, ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে হবে।
২০২৫ সালের এমআইসিএস অনুযায়ী বাংলাদেশে ৭২.১ শতাংশ পরিবারের ঘরে ইন্টারনেট আছে- অর্থাৎ প্রায় তিনটি পরিবারের একটি এখনো এই সুবিধার বাইরে। শহরের শিক্ষার্থী যদি হাই-স্পিড ইন্টারনেট, ল্যাপটপ, প্রাইভেট টিউটরিং এবং এআই টুলস নিয়ে এগোয়, আর হাওর, চা-বাগান, পাহাড়ি বা প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থী যদি দুর্বল ইন্টারনেট ও সীমিত ডিভাইস নিয়ে একই পরীক্ষায় বসে, তাহলে তাকে শুধু ‘সমান সুযোগ’ বলা যাবে না। ষষ্ঠত, শিক্ষাকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সিলেটের চা-বাগানের শিক্ষার্থীকে শুধু গণিত, সাহিত্য পড়ালে হবে না; তার নিজের জীবন, শ্রম, পরিবেশ, ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসও শিক্ষার অংশ হতে হবে। হাওরের শিক্ষার্থীর কাছে ক্লাইমেট চেঞ্জ কোনো টেক্সটবুক কনসেপ্ট নয়- এটি তার জীবনের বাস্তবতা। উপকূলের শিক্ষার্থীর কাছে দুর্যোগ বাস্তব অভিজ্ঞতা। পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষার্থীর কাছে বায়োডায়ভারসিটি বাস্তব পৃথিবী। আমাদের এটা মনে রাখতে হবে, শিক্ষা তখনই অর্থবহ হয়, যখন শিক্ষার্থী নিজের জীবনকে শিক্ষার ভেতরে খুঁজে পায়।
বাংলাদেশের শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গেলে ঢাকা বা বড় শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে তাকাতে হবে। চা-বাগান, হাওর, চর, পাহাড়, উপকূল, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকা এবং দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরাও এই দেশের ভবিষ্যৎ। শুধু ডিজিটাল বাংলাদেশ বললেই ডিজিটাল শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। শুধু স্মার্ট ক্লাসরুম বানালেই স্মার্ট শিক্ষা হয় না। স্মার্ট শিক্ষা তখনই হবে, যখন শিক্ষার্থী কীভাবে চিন্তা করবে, কীভাবে শিখবে এবং কীভাবে নিজের জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করবে- তা শিখবে।
পরিশেষে বলব, শিক্ষার্থী বদলেছে, এখন আমাদেরও বদলাতে হবে। আজকের শিক্ষার্থী এক দশক আগের শিক্ষার্থীর চেয়ে খারাপ নয়; সে শুধু ভিন্ন। তার পৃথিবী ভিন্ন, তার তথ্যের গতি ভিন্ন, তার স্বপ্ন ভিন্ন, তার ভয়ও ভিন্ন। তাই তাকে পুরোনো মাপে বিচার করলে চলবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে- একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু তার শিক্ষার্থীরা কত নম্বর পেল কিংবা পাবলিক পরীক্ষায় কত পার্সেন্ট উত্তীর্ণ হলো তার ওপর নির্ভর করে না; বরং শিক্ষার্থীরা কতটা চিন্তা করতে পারে, কতটা মানবিক হতে পারে, কতটা সৃজনশীল হতে পারে, ভুল তথ্য থেকে সত্যকে আলাদা করতে পারে, প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে পারে এবং পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে নিজেদের নতুন করে তৈরি করতে পারে- তার ওপর নির্ভর করে।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে এআই, অটোমেশন, ক্লাইমেট চেঞ্জ, গ্লোবালাইজেশন এবং ডিজিটার ট্রান্সফরমেশন; অন্যদিকে পুরনো পরীক্ষা-কেন্দ্রিকতা, মুখস্থনির্ভরতা, বৈষম্য, শিক্ষকদের জীবনমানের বেহাল দশা, শিক্ষক সংকট ও মানসিক চাপ। এই দ্বন্দ্বের সমাধান শুধু নতুন কারিকুলাম দিয়ে হবে না। দরকার নতুন শিক্ষাদর্শন। আমাদের এই প্রশ্ন নিয়ে এগুতে হবে- শিক্ষার্থী বদলে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা কবে বদলাব?
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ইংরেজি বিভাগ, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









