শরতের আগমন মানেই, বাংলার আকাশে ছড়িয়ে দেয় এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা। যেখানে হালকা মৃদু বাতাস, শিউলির গন্ধ ও কাশফুলের দোলা একসঙ্গে মিলে মানুষের অন্তরে জাগায় অমোঘ আনন্দের ঝলক। পাড়ার মণ্ডপে ঢাকের তাল, শিশিরমাখা ভোরের আলো, মাটির ভিজে গন্ধ সবকিছু যেন একত্রে রচনা করছে এক মহাকাব্য। যা শুধু আনন্দ নয়, বরং মানবিকতার, ভ্রাতৃত্বের এবং সৌন্দর্যের চিরন্তন বার্তা বহন করে।
বাংলার মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায় শারদীয় দুর্গাপূজার উৎসবধ্বনি, যা শুধুমাত্র দেবীর আরাধনার সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি সম্প্রীতি, সহমর্মিতা, মানবিক দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক সংহতির এক মহোৎসবের প্রতিফলন। বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে শারদীয় দুর্গাপূজা যে বিশেষ স্থান অধিকার করে, তা কেবল ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয়।
বরং এটি কৃষি, প্রকৃতি, পরিবেশ সচেতনতা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হস্তান্তরিত সামাজিক ঐতিহ্যের সূক্ষ্ম মিলনস্থল। দুর্গাপূজার আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত কৃষিজাত উপকরণ, যেমন- ধান, কলা, কচু, ডালিম, ফুল, লতা-পাতা, আম্রপল্লব এবং নদীর জল কেবল পূজার আভিজাত্য বৃদ্ধি করে না, বরং বাংলার কৃষিপ্রধান জীবনের সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্ক, প্রকৃতির সঙ্গে সেতুবন্ধন এবং আধ্যাত্মিক সংযোগকে জীবন্ত করে তোলে। প্রতিটি উপকরণ, প্রতিটি লতাপত্র, প্রতিটি শস্য ও জল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের এক নিখুঁত সাক্ষ্য বহন করে। দুর্গাপূজার সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর আচারগুলোর মধ্যে নবপত্রিকা পূজা বিশেষ স্থান দখল করে আছে। নবপত্রিকা মূলত ৯টি গাছের সম্মিলিত আকার, যা বাংলার কৃষি, প্রকৃতি এবং আধ্যাত্মিক চেতনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।
এই পূজা প্রকৃতি পূজার প্রতীকী প্রকাশ, যেখানে গঙ্গাজলসহ ৯ ধরনের চারা ও গাছ দিয়ে পূজার ঘট সাজানো হয়। শাস্ত্রে এই ৯টি উদ্ভিদকে কবিতার ছন্দে এইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে- রম্ভা, কচ্চী, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বিল্ব, দাড়িম্ব, অশোক, মানকচু এবং ধান্যঞ্চ নবপত্রিকা। প্রতিটি গাছ বাংলার কৃষি ও প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং দেবী দুর্গার ৯টি বিশেষ রূপের প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়। উদাহরণস্বরূপ, কদলী বা রম্ভা (কলাগাছ) ব্রহ্মাণীর অধিষ্ঠাত্রী, কচুগাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কালিকা, হরিদ্রা বা হলুদ গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী উমা, জয়ন্তীগাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কার্তিকী, বিল্ব বা বেলগাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী শিবা, দাড়িম্ব বা ডালিমের অধিষ্ঠাত্রী দেবী রক্তদন্তিকা, অশোকগাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী শোকরহিতা, মানকচু গাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী চামুণ্ডা এবং ধানগাছের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মী। এইভাবে নবপত্রিকা পূজা একদিকে কৃষি ও প্রকৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রকাশ, অন্যদিকে দেবীর নবরূপের আরাধনা।
নবপত্রিকার সাজানো ও স্নানের আচার কেবল আধ্যাত্মিক নয়; এটি বাংলার কৃষিপ্রধান সমাজে ফসলের শুভতা, শস্য উৎপাদন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি কৃতজ্ঞতারও প্রতীক। কখনো কখনো দুর্গাকে বনদুর্গা রূপে পূজা করা হয়; বনের গাছকেই দুর্গা হিসেবে গ্রহণ করে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষভাবে, বিয়ের মতো অনুষ্ঠানের শুরুতে এটি একটি মাঙ্গলিক আচার হিসেবে পালন করা হয়, যা কৃষি, পরিবেশ এবং আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য সংযোগ স্থাপন করে। রবীন্দ্রনাথও এই মিলনের গভীরতা অনুভব করেছেন, যেমন- তিনি লিখেছেন ‘মাটির ঘ্রাণে, শস্যের সুবাসে, আমাদের প্রাণ বোনা বাংলার ধরণী।’ সুতরাং নবপত্রিকা পূজা শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক রীতি নয়; এটি বাংলার কৃষি, প্রকৃতি, বন ও সামাজিক ঐতিহ্যের এক চিরন্তন সংযোগ, যা প্রতি পূজায় বাংলার গ্রামীণ ও শহুরে সংস্কৃতিকে একত্র করে।
ষষ্ঠী তিথি দুর্গাপূজার সূচনা পর্ব। এ দিনে দেবীর আগমনের মধ্য দিয়ে মণ্ডপ সাজানো হয়, যেখানে ফুল, লতা, শস্য ও শস্যজাত উপকরণ ব্যবহার করা হয়। ফুল ও উদ্ভিদ যেমন- বেল, অশোক, জয়ন্তী প্রতিদিনকার কৃষিকাজ ও পরিবেশের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক স্মরণ করায়। নদী ও জলাশয় থেকে নেওয়া জল সযত্নে ব্যবহার হয়, যা পরিবেশ সচেতনতার এক উত্তম উদাহরণ। সপ্তমী তিথিতে নবপত্রিকার স্নান নদীতে বা জলাশয়ে করানো হয়। পুরোহিত কাঁধে নবপত্রিকা বহন করে নদীতে স্নান করান, যা বাংলার কৃষিপ্রধান সমাজের জন্য এক প্রাকৃতিক ও আধ্যাত্মিক উদযাপন।
এই স্নানের মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতিকে সম্মান জানায়, ফলনশীলতা ও শুভতা প্রার্থনা করে। নবপত্রিকা গণেশের পাশে বসানো হয় এবং স্থানীয় লোকমুখে গণেশ ঠাকুরের স্ত্রী ‘কলাবউ’ নামে পরিচিত। তবে, প্রকৃতপক্ষে এটি ৯টি দেবীর শক্তির সম্মিলিত রূপ। ধান, কলা, কচু, ডালিম ইত্যাদি কৃষিজাত উপকরণ শুধু পূজার অংশ নয়; এরা বাংলার কৃষিজীবনের অঙ্গ। ধান লক্ষ্মীর প্রতীক হিসেবে খাদ্য নিরাপত্তা ও শস্য উৎপাদনের গুরুত্ব তুলে ধরে, কলা ও কচু কৃষিকাজের বহুমুখী প্রয়োগ চিহ্নিত করে। অষ্টমী বা মহাঅষ্টমী তিথি দুর্গাপূজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন দেবী চামুণ্ডা রূপে পূজিত হন।
বিভিন্ন মন্দিরে চালকুমড়া, চিনি, ফুল ও শস্যভোগ নিবেদন করা হয়। অষ্টমী সন্ধিপূজায় ৬৪ ডাকিনী যোগিনীর আরাধনা করা হয়। এদিন লুচি, সুজি, ফল ও শস্যভোগে বাংলার কৃষিজীবনের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি শ্রদ্ধা ফুটে ওঠে। কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে আধ্যাত্মিক বন্ধনের সমন্বয় এ পূজায় প্রতিফলিত হয়। নবমী তিথি দুর্গার শক্তি ও বীরত্ব আরাধনার দিন। পূজায় ব্যবহৃত শস্য ও ফুল স্থানীয় উৎপাদিত খাদ্য ও কৃষিজাত উপকরণের গুরুত্ব তুলে ধরে। নদী ও জলাশয় থেকে সংগৃহীত জল পুনর্ব্যবহার করা হয়, যা পরিবেশবান্ধব আচারের পরিচয় বহন করে। কৃত্তিবাসী রামায়ণের বর্ণনা অনুসারে, রামচন্দ্রের অকালবোধনের কাহিনিও পরিচিত। ‘অকাল’ অর্থ অসময়ে এবং ‘বোধন’ মানে উদ্বোধন। রামচন্দ্র রাবণ বধের তাড়নায় আশ্বিন মাসে তিনি দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। সপ্তমী, মহাষ্টমী ও সন্ধিপূজা সম্পন্ন হয়। কুমারী পূজা দুর্গাপুজার এক অনন্য অধ্যায়। তন্ত্রশাস্ত্র মতে, ১৬ বছরের কম বয়সী কন্যা কুমারীকে দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়।
কুমারীকে সাত্ত্বিক আহার খাওয়ানো হয়, যা বাংলার কৃষিপ্রধান সমাজে শস্যের সঙ্গে দেবীর অন্তর্নিহিত সম্পর্ক প্রতিফলিত করে। কুমারী পূজায় বছরের বিভিন্ন বয়সী কন্যাকে বিশেষ নাম দিয়ে পূজা করা হয়, এক বছর- সন্ধ্যা, দুই বছর- সরস্বতী, তিন বছর- ত্রিধামূর্তি, চার বছর- কালিকা, পাঁচ বছর- সুভগা, ছয় বছর- উমা, সাত বছর- মালিনী, আট বছর- কুঞ্জিকা, নয় বছর- কালসন্দর্ভা, দশ বছর- অপরাজিতা, এগারো বছর- রুদ্রাণী, বারো বছর- ভৈরবী, তেরো বছর- মহালক্ষ্মী, চৌদ্দ বছর- পঠিনায়িকা, পনেরো বছর- ক্ষেত্রজ্ঞা এবং ষোলো বছরের কন্যাকে অম্বিকা। সন্ধিপূজা অষ্টমী ও নবমী তিথির সংযোগকালে অনুষ্ঠিত হয়। মোট ৪৮ মিনিট স্থায়ী এই পূজায় দেবীকে চামুণ্ডা রূপে পূজা করা হয়। মহিষাসুর বধের মাহেন্দ্রক্ষণও এই সময়। ফুল, লতা, শস্য ও জল ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে আধ্যাত্মিক সংযোগ ফুটে ওঠে। প্রাচীন আচার বাংলার কৃষি ও প্রকৃতির সঙ্গে দেবীর সম্পর্কের ইতিহাস বহন করে।
বিজয়া দশমীতে অপরাজিতা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পূজামণ্ডপের ঈশান কোণে অষ্টদল পদ্ম আঁকা হয় এবং অপরাজিতা লতা স্থাপন করে চতুর্ভুজা দেবী পূজা করা হয়। হাতে শঙ্খ, চক্র, বর ও অভয়মুদ্রা; গায়ের রঙ নীল, ত্রিনয়না, মাথায় চন্দ্রকলা- এটি নবদুর্গার শক্তির এক চিরন্তন প্রতীক। এখানে অপরাজিতা ফুল বা লতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ; এটি দেবীর অপরাজেয় শক্তির প্রতীক, আবার নীল আকাশ, গভীর জল ও ভক্তির নিখুঁততারও প্রতিফলন।
ফলে, পূজায় অপরাজিতা লতার ব্যবহার শুধু আচার নয়, বরং প্রকৃতি, আকাশ, জল ও পরিবেশের সঙ্গে এক আধ্যাত্মিক সংযোগ প্রকাশ করে। আজকের আধুনিক যুগেও দুর্গাপূজা প্রাচীন ঐতিহ্য ও পরিবেশ সচেতনতার এক মিলনস্থল হিসেবে বেঁচে আছে। এটি শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক আনন্দ নয়; বরং কৃষি ও প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, নারীশক্তির উদযাপন, পরিবেশবান্ধব চেতনা এবং সামাজিক ঐক্যের বার্তা বহন করে।
লেখক : কৃষিবিদ, কলামিস্ট এবং উপদেষ্টা, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি, ঢাকা


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









