জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, তারেক রহমানের হাতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সুরক্ষিত নয়।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে সংসদ ভবনের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। বিএনপি সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনমূলক আইন পাস, বিরোধী মত দমন এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণের প্রতিবাদে কর্মসূচিটির আয়োজন করে এনসিপি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “বিএনপি সরকার মানবাধিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেও এমন আইন ও প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে, যা নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণের সুযোগ তৈরি করছে।”
তিনি বলেন, “গুমের অভিযোগের সঠিক তদন্ত না হওয়া, বিরোধীমত দমনে আইন প্রয়োগ, মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে দেশে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।”
তিনি আরো বলেন, “তারা বেশ কয়েকটি আইন পাস করেছে, যেটা এই দেশের জনগণের মানবাধিকারের বিপক্ষে। তাদের কথা ছিল, এই সরকার মানবাধিকারের সুরক্ষা দেবে। কিন্তু সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করার বদলে মানবাধিকার হরণ করা যায়—এ ধরনের আইন ও প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে।”
গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, “দেশের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য মানুষ যে লড়াই করেছিল, সেই অধিকার এখনো নিশ্চিত হয়নি। এ কারণেই সংসদ ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে জনগণের কাছে সেই বার্তা দিতে তারা মানববন্ধন করছেন।”
মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, “মিরাজ শেখ কোথায়? পাঁচ মাস হয়ে গেল, কেন মিরাজ শেখের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না?”
সরকারের মন্ত্রীরা গত সাত মাসে কোনো গুম হয়নি বলে বক্তব্য দিচ্ছেন— এমন দাবি করে তিনি বলেন, “মিরাজ শেখের গুমের ঘটনা পুরো বিশ্ববাসী জানে।”
মিরাজ শেখের পরিবারের হয়রানির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “পরিবারটি প্রথমে থানায় গিয়ে মামলা করতে চাইলেও মামলা নেওয়া হয়নি। পরে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নেওয়া হলেও সেখানে কোস্টগার্ডের নাম লিখতে দেওয়া হয়নি।”
কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান নেই জানিয়ে তিনি বলেন, “একজন নাগরিককে গুম করা যাবে না—এই মৌলিক অধিকারের পক্ষেই তারা অবস্থান নিয়েছেন।”
গাজী সালাহউদ্দিন তানভীরের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, “সরকারপ্রধানকে নিয়ে খারাপ ভাষায় কটূক্তি করায় এনসিপি দলীয়ভাবে তানভীরের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছিল। কিন্তু তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা, রিমান্ড এবং শুরুতে জামিন না দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।”
গাজীপুরের সিফাতের বিরুদ্ধেও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, “তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গালি দেওয়া কি এক ধরনের সন্ত্রাস? কারো বিরুদ্ধে কথা বলা বা মিম তৈরি করা সমর্থনযোগ্য নয়। তবে সেটিকে সন্ত্রাস হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মাধ্যমে মানুষের মুখ ও মতপ্রকাশের অধিকার বন্ধ করা হচ্ছে।”
হবিগঞ্জে ছাত্রশক্তির কিশোর আলিফের চোখ হারানোর প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, “বিরোধীদল ও মত দমন এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।”
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, মানবাধিকার কমিশন আইন, এসআরবি এবং সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “এসব আইন নিয়ে এনসিপির জাতীয় নেতারা বিস্তারিত কথা বলেছেন।”
তার অভিযোগ, “গুমের অভিযোগের তদন্ত যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমেই করা হয়, তাহলে এক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অন্য বাহিনীর বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত করতে পারবে না।”
তিনি বলেন, “কোনো অভিযোগ পরবর্তী সময়ে ভুল প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এতে মানুষ গুমের অভিযোগ করতেও ভয় পাবে।”
বিএনপির আমলে গুম হওয়া নেতাকর্মীদের প্রসঙ্গ তুলে সালাহউদ্দিন আহমেদ ও ইলিয়াস আলীর নাম উল্লেখ করেন নাহিদ ইসলাম। তার দাবি, “বিরোধীদলে থাকা অবস্থায় বিএনপি গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেছিল। কিন্তু এখন সরকারে এসে জাতীয় পর্যায়েও কার্যকর তদন্ত হতে দিচ্ছে না।”
তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফরের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, “বিগত ১৬ বছর বিএনপির নেতারা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের কাছে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। এখন সরকারে থেকে তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কী জবাব দেবেন।”
তিনি বলেন, “আমরা তারেক রহমানকেও বলব, দ্রুত সময়ের মধ্যে আপনি সঠিক দিশায় আসুন, গণতন্ত্রের পথে আসুন।”
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তার অভিযোগ, “সরকার ছয় মাস পর দুদক পুনর্গঠন করে এনসিপি ও বিরোধী দলকে টার্গেট করছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অতীতের দুর্নীতির অভিযোগও তদন্ত করা উচিত।”
পুলিশ সংস্কার কমিশন না করা, পুলিশকে বিরোধীদল দমনের জন্য প্রস্তুত করা এবং নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার অভিযোগও করেন তিনি।
তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফর প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, “তিনি সেখানে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন না, বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন। জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় ঐক্য দেখিয়েছিলেন; কিন্তু তারেক রহমান সেই জাতীয় ঐক্য দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন।”
নাহিদ ইসলাম বলেন, “আপনি সেখানে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন। আপনি সেখানে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন না।”
তিনি আরো বলেন, “বিএনপির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জনগণের ভেতরে থাকা রাজনৈতিক শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে পারে এবং ‘গণআন্দোলন আসন্ন।”
রকারের বিরুদ্ধে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সুশাসন দিতে ব্যর্থতার অভিযোগও করেন তিনি।
মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষায় আইন সংশোধনের দাবি জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, “গুমের অভিযোগের সঠিক তদন্ত, মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কার্যক্রম এবং সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনের নামে যাতে মতপ্রকাশের অধিকার হরণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









