রোগ যখন রূপক হয়ে ওঠে
অসুখেরও কি ভাষা আছে? প্রশ্নটি শুনতে খুব সহজ। কিন্তু শরীরে যখন অসুখ আসে, তখন তার সঙ্গে শুধু ব্যথা বা জ্বর আসে না; আসে ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ, সামাজিক দৃষ্টি। কখনো কখনো আসে এমন কিছু শব্দ, যেগুলো অসুখের চেয়েও ভারী। আমরা বলি, রোগের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। শরীর লড়ছে। রোগ আক্রমণ করেছে। তাকে পরাজিত করতে হবে। যেন শরীর একটি যুদ্ধক্ষেত্র, রোগ শত্রু আর চিকিৎসক সৈনিক।
সুসান সন্টাগ এই ভাষার দিকেই তাকিয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত ‘ইলনেস এজ মেটাফোর’ বইয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, অসুখকে আমরা কেন এত রূপকের ভেতর আটকে রাখি? কেন রোগকে কেবল শরীরের একটি বাস্তব ঘটনা হিসেবে দেখতে পারি না? ১৯৮৯ সালে ‘এইডস এন্ড ইটস মেটাফোর’ বইয়ে তিনি একই প্রশ্নকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান। তার কাছে সমস্যা শুধু ভুল শব্দের নয়; সমস্যা হলো সেই শব্দের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক বিচার।
রোগ তখন আর রোগ থাকে না। রোগীও আর শুধু রোগী থাকেন না। তার অসুখ যেন তার চরিত্রের ব্যাখ্যা হয়ে দাঁড়ায়।
যক্ষ্মাকে একসময় কল্পনা করা হতো সংবেদনশীলতা ও সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে। ক্যানসারকে বলা হয়েছে দমিত আবেগের ফল। এইডসকে ঘিরে তৈরি হয়েছে যৌনতা, পাপ, অপরাধ ও শাস্তির নানা গল্প। অর্থাৎ শরীর অসুস্থ হলেই আমরা তার ভেতরে একটি নৈতিক গল্প খুঁজতে শুরু করি। মানুষটি কীভাবে জীবন কাটিয়েছেন, কী ভুল করেছেন, কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি—রোগ যেন সেসবের গোপন হিসাব নিয়ে এসেছে।
সন্টাগ বললেন, না। রোগের ওপর নৈতিকতার বোঝা চাপানো বন্ধ করতে হবে।
তার যুক্তি ছিল, রোগের নিজস্ব বাস্তবতাকে তার নিজের জায়গায় থাকতে দেওয়া দরকার। ক্যানসার ক্যানসারই; তাকে যুদ্ধ বানালে রোগীর ওপর নতুন এক চাপ তৈরি হয়। ‘ক্যানসারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’—এই বহুল ব্যবহৃত বাক্যটি শুনতে শক্তিশালী। কিন্তু এর ভেতরে একটি বিপজ্জনক ধারণা লুকিয়ে থাকতে পারে। রোগী যদি সুস্থ না হন, তাহলে কি তিনি যথেষ্ট লড়েননি? তিনি মারা গেলে কি বলা হবে—তিনি যুদ্ধে হেরে গেলেন? এভাবে ভাষা অজান্তেই রোগীকে নিজের অসুখের জন্য দায়ী করে তুলতে পারে।
আর শরীর তো কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়। শরীর আরও জটিল, আরও ব্যক্তিগত। সেখানে রোগ ও সুস্থতা, স্মৃতি ও বয়স, পরিবেশ ও বংশগতি—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে। শরীরের ভেতরের একটি প্রক্রিয়াকে ‘শত্রুর আক্রমণ’ বলে ব্যাখ্যা করলে তার কিছুটা বোঝা যায় হয়তো, কিন্তু একই সঙ্গে কিছুটা আড়ালও পড়ে যায়।
সন্টাগের লেখার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, তিনি রূপকের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে নিজেও রূপক ব্যবহার করেন। অসুস্থতাকে তিনি জীবনের ‘অন্ধকার দিক’ হিসেবে কল্পনা করেছিলেন—যেন আমরা সবাই একটি দেশের নাগরিক, কিন্তু জীবনের কোনো এক সময়ে অন্য একটি দেশে যেতে হতে পারে; সেই দেশের নাম অসুস্থতা। সেখানে আমাদের পরিচয় বদলে যায়। আমরা হঠাৎ অন্যরকম মানুষ হয়ে উঠি।

এখানে সন্টাগের নিজের দ্বিধাটিও ধরা পড়ে। রূপক থেকে পুরোপুরি পালানো যায় না। ভাষা নিজেই রূপকে ভরা। আমরা বলি হৃদয় ভেঙে গেছে, সময় উড়ে যায়, শহর ঘুমায়। কিন্তু সব রূপক একই কাজ করে না। কিছু রূপক আমাদের অভিজ্ঞতা বুঝতে সাহায্য করে, আবার কিছু রূপক মানুষের ওপর বিচার চাপিয়ে দেয়। তাই সন্টাগের আসল প্রশ্ন হয়তো রূপক ব্যবহার করব কি করব না—এটি নয়। বরং কোন রূপক কী করছে, সেটি বোঝা।
এই প্রশ্ন থেকেই তার ভাবনার সঙ্গে প্রতিবন্ধিতাবিষয়ক অধ্যয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। প্রতিবন্ধিতাবিষয়ক গবেষকেরা দেখিয়েছেন, অন্ধত্ব, বধিরতা, পঙ্গুত্ব কিংবা অসুস্থতাকে আমরা প্রায়ই শুধু শরীর বোঝাতে ব্যবহার করি না; সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতাও বোঝাই এসব শব্দ দিয়ে। কোনো রাজনীতি ‘অন্ধ’, কোনো প্রতিষ্ঠান ‘বধির’, কোনো সমাজ ‘পঙ্গু’, কোনো অর্থনীতি ‘অসুস্থ’—এ ধরনের বাক্য আমাদের কাছে স্বাভাবিক। কিন্তু একটু থামলে দেখা যায়, এখানে একটি শরীরকে অন্য কিছুর প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অন্ধ মানুষটি তখন আর মানুষটি নন; তিনি হয়ে উঠছেন অজ্ঞতার প্রতীক। বধিরতা হয়ে যাচ্ছে শুনতে না চাওয়ার প্রতীক। পঙ্গুত্ব হয়ে যাচ্ছে অচলতার ছবি। অসুস্থতা হয়ে উঠছে সামাজিক অবক্ষয়ের রূপক। শরীর তখন নিজের জন্য কথা বলতে পারে না। তাকে অন্য একটি গল্প বলার কাজে লাগানো হয়।
এই জায়গায় সন্টাগের প্রশ্ন আজও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভাষা কখনো নিরীহ নয়। একটি শব্দ আমরা উচ্চারণ করি, তারপর তা বাতাসে মিলিয়ে যায়—এমনটা সব সময় ঘটে না। কোনো শব্দ মানুষের শরীরে গিয়ে বসে থাকতে পারে। কোনো রূপক রোগীকে নিজের শরীর সম্পর্কে অপরাধী করে তুলতে পারে। কোনো উপমা প্রতিবন্ধী মানুষকে তাঁর নিজের পরিচয় থেকে সরিয়ে শুধু একটি ‘অক্ষমতার’ প্রতীকে পরিণত করতে পারে।
সন্টাগ নিজেও এই অভিজ্ঞতার বাইরে ছিলেন না। তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার বাবা মারা গিয়েছিলেন যক্ষ্মায়। অসুখ তার কাছে কেবল বইয়ের বিষয় ছিল না; শরীরের খুব কাছের অভিজ্ঞতা ছিল। তবু ‘ইলনেস এজ মেটাফোর’ আত্মজীবনী হয়ে ওঠেনি। তিনি নিজের কষ্টকে সামনে রেখে পাঠককে আবেগে ভাসাতে চাননি। বরং নিজের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সমস্যার দিকে তাকিয়েছেন।
এখানে সন্টাগনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই ‘অ্যাগেইনস্ট ইন্টারপ্রিটেশন’-এর সঙ্গে একটি যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে তিনি শিল্পকর্মের ওপর অতিরিক্ত ব্যাখ্যা চাপানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন। কোনো শিল্পকে শুধু তার ‘অর্থ’ দিয়ে ধরতে গেলে তার উপস্থিতি, তার শরীর, তার অনুভূতি হারিয়ে যেতে পারে। অসুখের ক্ষেত্রেও যেন একই বিপদ। আমরা রোগের শরীরকে দেখি না; তার অর্থ খুঁজি। ক্যানসার মানে কী? এইডস মানে কী? যক্ষ্মা মানে কী? প্রশ্নগুলো যখন রোগের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন রোগী কোথায় থাকেন?
এই প্রশ্নই পরবর্তী সময়ে প্রতিবন্ধিতাবিষয়ক অধ্যয়নের নানা আলোচনায় ফিরে আসে। ক্ষেত্রটি যখন নিজের ইতিহাস নির্মাণ করতে শুরু করে, তখন তাকে কয়েকটি ধাপ বা ‘তরঙ্গ’-এ ভাগ করার প্রবণতা দেখা যায়—অধিকার, সামাজিক নির্মাণ, পরিচয়, সংস্কৃতি, শরীর, আন্তঃসম্পর্ক ইত্যাদি। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস কখনো এত সরল নয়। পুরোনো প্রশ্ন হারিয়ে যায় না; নতুন ভাষায় ফিরে আসে।
সন্টাগের ক্ষেত্রেও তাই। প্রতিবন্ধিতাবিষয়ক অধ্যয়নের প্রথম দিককার গুরুত্বপূর্ণ সংকলনে তার লেখা স্থান পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তার উপস্থিতি কিছুটা আড়ালে চলে যায়। কিন্তু একটি নাম কোনো সংকলন থেকে সরে গেলেই কি তার প্রশ্নও অদৃশ্য হয়ে যায়? হয় না। বরং সময় বদলালে পুরোনো প্রশ্ন নতুন পোশাকে ফিরে আসে।
কোভিড মহামারির সময় আমরা আবার দেখেছি রোগকে যুদ্ধের ভাষায় বর্ণনা করার প্রবণতা। ‘শত্রু’, ‘আক্রমণ’, ‘জয়’, ‘পরাজয়’—শব্দগুলো ফিরে এসেছিল। সেই সঙ্গে এসেছিল ভয়, বিচ্ছিন্নতা, সন্দেহ। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থ মানুষের জন্য মহামারি শুধু একটি নতুন ভাইরাসের আগমন ছিল না; পুরোনো সামাজিক বৈষম্যেরও নতুন প্রকাশ ছিল। তখন সন্টাগের প্রশ্ন আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে—আমরা রোগকে কীভাবে দেখছি?
অবশ্য সন্টাগের বইয়ের সবকিছু আজ সমানভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান এগিয়েছে। রোগ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বদলেছে। তার গবেষণাপদ্ধতিও আজকের একাডেমিক মানদণ্ডে অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে। আবার সব রূপক যে ক্ষতিকর, এমনও নয়। কোনো রূপক মানুষকে নিজের অভিজ্ঞতা বোঝার নতুন ভাষা দিতে পারে, প্রতিবাদের শক্তি দিতে পারে। সমস্যা রূপকের অস্তিত্বে নয়; সমস্যা তার অদৃশ্য ক্ষমতায়। একটি শব্দ কাকে মানুষ হিসেবে রাখছে, আর কাকে প্রতীকে পরিণত করছে—এই প্রশ্নটাই জরুরি।
‘অসুস্থ’ বললে আমরা কাকে বোঝাচ্ছি? ‘স্বাভাবিক’ বলার সময় কার শরীরকে মানদণ্ড করছি? ‘অক্ষম’ বলার সময় আমরা কি কেবল শরীরের কথা বলছি, নাকি এমন একটি সমাজের কথাও বলছি, যে সমাজ অন্যরকম শরীরের জন্য যথেষ্ট জায়গা তৈরি করেনি?
সন্টাগ আমাদের সেখানে এসে থামিয়ে দেন। একটু থামো। শব্দটির দিকে তাকাও। তারপর শরীরটির দিকে। তারপর মানুষটির দিকে। হয়তো এই থামাটুকুই তার বড় শিক্ষা। কারণ রোগী তার রোগ নন। প্রতিবন্ধী মানুষ কোনো সামাজিক ব্যর্থতার প্রতীক নন। শরীর কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়। রোগ কোনো নৈতিক রায়ও নয়। কথাগুলো খুব সহজ। প্রায় শিশুর মতো সহজ। অথচ আমাদের বারবার বলতে হয়।
কারণ আমরা ভুলে যাই। তারপর আবার মনে করি। আবার ভুলে যাই। ইতিহাসও বোধ হয় এমনই—সোজা পথে এগোয় না। ফিরে আসে, অন্য শব্দে, অন্য শরীরে, অন্য সময়ে। তাই অতীতকে মনে রাখা শুধু অতীতের প্রতি দায় নয়; সামনে হাঁটারও প্রস্তুতি।
সুসান সন্টাগকে মনে রাখা মানে তার প্রতিটি কথা মেনে নেওয়া নয়। বরং তার প্রশ্নটিকে জীবিত রাখা। এই ভাষা কী করছে? এই রূপকটি কাকে আড়াল করছে? এই শব্দটি কার শরীরকে ব্যাখ্যা করছে? আর সবশেষে, সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হয়তো এটিই— আমরা কি মানুষটির কথা শুনছি? নাকি তার শরীরের ওপর নিজেদের গল্প লিখেই চলেছি?

পরিচিতি
সুসান সন্টাগ (১৯৩৩–২০০৪) ছিলেন মার্কিন লেখক, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, চলচ্চিত্র-নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক সমালোচক। বিশ শতকের প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি সাহিত্য, শিল্প, আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র, রাজনীতি ও অসুস্থতার মতো বিচিত্র বিষয় নিয়ে লিখেছেন। তার লেখায় তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণের সঙ্গে ছিল প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহস।
নিউইয়র্কে বেড়ে ওঠা সন্টাগ খুব অল্প বয়সেই বই ও দর্শনের জগতে প্রবেশ করেন। তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য বেনিফ্যাক্টর’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে। তবে তাকে ব্যাপকভাবে পরিচিত করে তোলে প্রবন্ধসংকলন ‘অ্যাগেইনস্ট ইন্টারপ্রিটেশন অ্যান্ড আদার এসেস’ (১৯৬৬)। এই বইয়ের প্রবন্ধগুলো তাকে সমকালীন মার্কিন সাংস্কৃতিক চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠে পরিণত করে।
তার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে আছে ‘অন ফটোগ্রাফি, ‘ইলনেস অ্যাজ মেটাফর’, ‘এইডস অ্যান্ড ইটস মেটাফরস’, ‘দ্য ভলকানো লাভার’ এবং ‘ইন আমেরিকা’। আলোকচিত্রের নৈতিকতা, শিল্পের ব্যাখ্যা, অসুস্থতাকে ঘিরে সামাজিক রূপক এবং যুদ্ধ ও রাজনীতির ভাষা নিয়ে তার চিন্তা আজও আলোচিত।
সুসান সন্টাগ শুধু লেখেননি; চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন, যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের সময় সরেজমিনে গিয়েছেন, এবং শিল্প ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। ২০০৪ সালে নিউইয়র্কে তার মৃত্যু হয়। তার লেখার সবচেয়ে স্থায়ী উত্তরাধিকার সম্ভবত একটি অভ্যাস—পরিচিত কোনো ধারণাকেও আরেকবার নতুন করে দেখতে শেখা। প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









