জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির নেত্রী সামান্তা শারমিন।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দীর্ঘ এক বিবৃতি দিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। একই সঙ্গে দলের রাজনৈতিক অবস্থান, জোটের কৌশল, নির্বাচন এবং নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে নিজের আপত্তির কথাও তুলে ধরেন।
গত ২৩ অক্টোবর ঘোষিত এনসিপির নতুন কমিটিতে সামান্তা শারমিনকে শুধু যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রাখা হয়। বিষয়টি তার পদাবনতি হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় কমিটি ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
ফেসবুক পোস্টে সামান্তা শারমিন জানান, প্রায় এক বছর আগে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি দলের ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। তার মতে, নীতিগত কিংবা কৌশলগত কোনো দিক থেকেই জামায়াত এনসিপির মিত্র হওয়ার উপযুক্ত নয়। এ ধরনের জোটের কারণে দলকে বড় রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন।
তিনি আরও জানান, গত ১১ মাসে দলের অতীত কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ, প্রস্তাব এবং আলোচনা করেছেন। দলের ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের জন্য অভ্যন্তরীণ মতাদর্শিক লড়াই চালিয়ে যাওয়াকে নিজের রাজনৈতিক দায়িত্ব মনে করেছিলেন। তবে এখন তার উপলব্ধি, এনসিপির পক্ষে প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধের প্রতি আন্তরিক থাকা আর সম্ভব হচ্ছে না।
সামান্তা শারমিনের ভাষ্য, দলের কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ হিসেবে পদত্যাগ না করে তিনি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মতপার্থক্যের পরিপ্রেক্ষিতেই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার মতে, জামায়াতের সঙ্গে জোট ত্যাগের মতো সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে নেওয়া হলেও এনসিপি পুরোনো রাজনৈতিক ধারার বাইরে নিজস্ব পরিচয়, চিন্তা ও কর্মসূচি গড়ে তুলতে পারবে কি না, তা নিয়ে তার সংশয় রয়েছে।
জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে আপত্তি
পদত্যাগের বিবৃতিতে সামান্তা শারমিন এনসিপির রাজনৈতিক দর্শন ও সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সাংবিধানিক সংস্কার, আইনের সংস্কার এবং রাজনৈতিক দল ও রাজনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি।
তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এসব সংস্কারকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ হিসেবে ধারণ করে না। তার মতে, জামায়াতের দার্শনিক ভিত্তি ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্রব্যবস্থা উদার গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ১৯৭১ সালে দলটির ভূমিকা নিয়ে জাতির কাছে ক্ষমা না চাওয়া এবং সেই অবস্থান পরিবর্তন না করাকেও তিনি সমালোচনা করেন।
সামান্তার দাবি, জামায়াতকে সংস্কারের সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করায় উদার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষের একটি অংশ এনসিপির রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছে। তার মতে, নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে না পারায় বিভিন্ন ইস্যুতে এনসিপিকে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানের সহায়ক ভূমিকা নিতে হচ্ছে।
নির্বাচনী কৌশল নিয়েও অসন্তোষ
২০২৬ সালের নির্বাচনকে শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের নির্বাচন না করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেন সামান্তা শারমিন।
তার মতে, ঐকমত্য কমিশন, নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে ব্যর্থতা থাকলেও পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে থাকা শক্তিগুলোকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল এনসিপির সামনে। প্রয়োজনে এককভাবেও নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে পারত দলটি।
তিনি অভিযোগ করেন, ১১ দলীয় ঐক্যের মতো নির্বাচনী কৌশলে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে এনসিপি নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তার মতে, নির্বাচনী জয়কে রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় দলটি সংস্কারের প্রশ্নে নিজের অবস্থান দুর্বল করেছে।
এ প্রসঙ্গে শহীদ ওসমান হাদির নির্বাচনী প্রচারণার উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি। সামান্তার দাবি, ওসমান হাদি কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে এককভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন। অথচ তার মৃত্যুর ঘটনাকে বড় দলের সঙ্গে জোট করার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা সামান্তার মতে অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন
বিবৃতির বড় একটি অংশজুড়ে ছিল ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা ও পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে তাদের অবস্থান নিয়ে আলোচনা।
সামান্তা শারমিন বলেন, গণঅভ্যুত্থানে নারীরা শুধু অংশগ্রহণই করেননি, বরং সম্মুখসারিতে থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। ব্যারিকেডের সামনে তাদের সাহসী অবস্থান আন্দোলনকে সার্বজনীন রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
কিন্তু অভ্যুত্থানের পর নারীদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার মতে, এনসিপির সামনে নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ থাকলেও দলটি তা কাজে লাগাতে পারেনি।
তিনি বলেন, শুধু দলে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করলেই সমতা নিশ্চিত হয় না। নেতৃত্ব, সাংগঠনিক ক্ষমতা, প্রতিনিধিত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হয়। অথচ এনসিপিও পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতো পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা থেকে বের হতে পারেনি।
সামান্তার মতে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। তাদের রাজনৈতিক মতামত ও আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করা মানে দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের অভিজ্ঞতা ও দাবিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা।
তিনি আরও বলেন, নারীদের দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করতে ইতিবাচক বৈষম্য, অধিক প্রতিনিধিত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেশি ক্ষমতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু এনসিপি বিভিন্ন ক্ষেত্রে জামায়াত ও অতি-ডানপন্থী শক্তির রক্ষণশীল রাজনৈতিক অবস্থানের অনুসারী হয়েছে বলে তার অভিযোগ।
বিবৃতির শেষাংশে সামান্তা শারমিন প্রশ্ন তোলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় নারীদের সামনের সারিতে রাখা হলেও বিজয়ের পর তাদের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অধিকার কেন উপেক্ষিত হবে? তার মতে, যে আন্দোলন বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছিল, সেই আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহনকারী কোনো রাজনৈতিক দল নিজের সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে পারে না।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মতপার্থক্য, জামায়াতের সঙ্গে জোটের প্রশ্ন, নির্বাচনী কৌশল এবং নারীর রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে এসব আপত্তি তুলে ধরেই এনসিপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন সামান্তা শারমিন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









