ফুটবল বিধাতা হয়তো সব গল্পে সুখী সমাপ্তি লেখেন না। যদি লিখতেন, তবে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের মঞ্চটা লিওনেল মেসির জন্য হতে পারতো এক রূপকথার শেষ পাতা। কাতার বিশ্বকাপের সেই অতিমানবিক ও মহাকাব্যিক অর্জনের পর, বিশ্বজুড়ে কোটি ফুটবল রোমান্টিক আশা করেছিলেন—বিদায়বেলায় চেনা জাদুকর আরও একবার ট্রফি উঁচিয়ে ধরবেন, মাঠজুড়ে উড়বে আকাশি-সাদা আবির। কিন্তু ফুটবল যেমন দুহাত ভরে দেয়, তেমনি কখনো কখনো নির্মমভাবে কেড়েও নেয়।
কোটি ভক্তের হৃদয় ভেঙে দিয়ে, মাঠের সবুজ ঘাসে একরাশ বিষণ্ণতা আর আক্ষেপ ছড়িয়ে এবার শূন্য হাতেই বিদায় নিতে হলো ফুটবল ঈশ্বরকে। বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে শূন্য হাতে ফিরলেও, লিওনেল আন্দ্রেস মেসি ফুটবল নামক খেলাটিতে রেখে গেলেন এক সুবিশাল ও অজেয় সাম্রাজ্য। যে সাম্রাজ্যের মুকুটহীন রাজা চিরকাল তিনিই থাকবেন। জাদুকরের বিদায় হতে পারে, কিন্তু জাদুর রেশ রয়ে যাবে অনন্তকাল।
অথচ টুর্নামেন্ট শুরুর আগেও গল্পটা এমন বিষাদময় ছিল না। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার মিশন আর মেসির শেষ বিশ্বকাপকে রাঙিয়ে রাখার এক বুক স্বপ্ন নিয়ে কোটি চোখ তাকিয়ে ছিল আমেরিকার মাঠগুলোর দিকে। কিন্তু আধুনিক ফুটবলের গতি, শারীরিক শক্তি আর প্রতিপক্ষের নিখুঁত ট্যাকটিকাল ব্লকের সামনে এবার চেনা জাদুকরকে বড্ড একাকী লেগেছে। বয়স আর সময়ের অমোঘ নিয়মকে ফাঁকি দিয়ে জাদুদণ্ডের শেষ ছোঁয়া দিয়ে দলকে টেনে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা তিনি করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু ভাগ্য এবার আর সহায় হয়নি।
যখন শেষ বাঁশিটা বাজলো, তখন ক্যামেরা আর কোটি জোড়া চোখ শুধু একজনের দিকেই নিবদ্ধ ছিল। মাঠে নিথর দাঁড়িয়ে থাকা ১০ নম্বর জার্সিধারী সেই মানুষটি, যিনি যুগের পর যুগ ধরে ফুটবল বিশ্বকে বুঁদ করে রেখেছিলেন আনন্দ-উল্লাসে, আজ তাঁর নিজের চোখেই টলমল করছিল জল। এই শূন্যতা শুধু আর্জেন্টিনার নয়, এই শূন্যতা পুরো ফুটবল বিশ্বের।
ফুটবল ইতিহাসে মেসির গল্পটা সবসময়ই ছিল চরম নাটকীয়তায় ভরা। ২০১৪ সালের মারাকানার সেই ট্রাজিক ফাইনাল, কিংবা টানা দু'টি কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে গিয়ে ২০১৬ সালের সেই কান্নাসিক্ত সাময়িক অবসর—মেসিকে ভাঙতে দেখেছে বিশ্ব। এরপর ২০২১-এর কোপা আমেরিকা এবং ২০২২-এর কাতার বিশ্বকাপে ট্রফি জিতে তিনি যেন পৌঁছে গিয়েছিলেন অমরত্বের চূড়ায়।
সবাই ভেবেছিল, অলিম্পাসের সেই চূড়াতেই হয়তো শেষ হবে তাঁর যাত্রা। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা আর নিজের দেশের প্রতি টান তাঁকে টেনে এনেছিল ২০২৬-এর মঞ্চে। আর সেখানেই লুকিয়ে ছিল নিয়তির অন্য এক স্ক্রিপ্ট। কাতারের সেই সোনালী ট্রফি জয়ের পর এই শূন্য হাতে বিদায় যেন ভক্তদের আরও বেশি করে মনে করিয়ে দিচ্ছে—ফুটবল কতখানি নিষ্ঠুর হতে পারে।
খেলার পরিসংখ্যান কিংবা ইতিহাসের পাতায় হয়তো লেখা থাকবে, ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে মেসি কিছুই পাননি। কিন্তু ফুটবল কি কেবলই ট্রফি আর মেডেলের শুষ্ক হিসাব? লিওনেল মেসি নামক যে জাদুকর গত দুই দশক ধরে প্রতি শনি-রবিবারে কোটি মানুষকে জীবনের ক্লান্তি ভুলিয়ে এক পরম আনন্দ উপহার দিয়েছেন, তাঁর বিদায়কে কোনো ধাতব ট্রফির মাপকাঠিতে বিচার করা অসম্ভব।
তিনি এবার মেডেল পাননি ঠিকই, কিন্তু মাঠ থেকে যখন তিনি শেষবারের মতো হেঁটে টানেলের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন গ্যালারিজুড়ে প্রতিপক্ষ ভক্তদেরও দাঁড়িয়ে দেওয়া করতালি আর কোটি মানুষের চোখের জল প্রমাণ করে গেছে—তাঁর অর্জন ট্রফির চেয়েও বহুগুণ বেশি। তিনি ফুটবলকে যা দিয়েছেন, তা কোনো মিউজিয়ামের শোকেসে বন্দি করা যায় না; তা মিশে আছে ফুটবল ইতিহাসের ডিএনএ-তে।
মারাকানার কান্না যেমন কাতারে গিয়ে হাসিতে রূপ নিয়েছিল, ফুটবলের এই চিরন্তন চক্রে এবার বিদায়ের সুরটা বড্ড করুণ, বড্ড অসমাপ্ত। ট্রফিহীন এই বিদায় হয়তো আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে একটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে থাকবে, কিন্তু ফুটবল রোমান্টিকদের মনে মেসি চিরকাল অমর থাকবেন তাঁর পায়ের সেই অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং, চোখ ধাঁধানো ফ্রি-কিক আর মাঠের ভেতরের বিশুদ্ধ সৌন্দর্যের জন্য, ট্রফির সংখ্যায় নয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









