ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যা সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না। বিশ্বকাপ ফাইনালের একটি গোল—মাত্র একটি স্পর্শ, একটি নিখুঁত শট, একটি নিঃশ্বাস আটকে যাওয়া মুহূর্ত—কখনও কখনও একটি পুরো প্রজন্মকে চিহ্নিত করে। যে খেলোয়াড় সেই গোলটি করেন, তিনি আর শুধু একজন ফুটবলার থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন জাতির স্মৃতির অংশ। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ফেরান তোরেস ঠিক সেই অমরত্বই ছুঁয়ে ফেললেন।
নিউ জার্সির আলোঝলমলে রাতে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে করা তার একমাত্র গোল স্পেনকে এনে দিয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা। আর সেই এক মুহূর্তেই বার্সেলোনা ফরোয়ার্ড নিজের নাম লিখিয়েছেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সম্মানজনক তালিকাগুলোর একটিতে।
ম্যাচের ৬২তম মিনিটে মিকেল ওয়ারসাবালের বদলি হিসেবে মাঠে নামেন ফেরান তোরেস। খেলার গতি তখন ধীরে ধীরে অতিরিক্ত সময়ের ক্লান্তির দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু বড় খেলোয়াড়েরা প্রায়ই সবচেয়ে বড় মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করেন।
১০৬তম মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের হেডে নামানো বল পেয়ে কোনো দ্বিধা না করে ডান পায়ের জোরালো শটে বল জড়িয়ে দেন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেসের জালে। সেটিই ছিল ম্যাচের একমাত্র গোল, আর সেটিই স্পেনকে আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বানায়। ফেরান তোরেস ইতিহাস হয়ে যান।
বিশ্বকাপ ফাইনালের নায়কদের কাতারে
বিশ্বকাপ ফাইনালে জয়সূচক গোল করার সৌভাগ্য খুব কম ফুটবলারের ভাগ্যে জোটে। এই গোলগুলো শুধু ম্যাচ জেতায় না; এগুলো একটি দেশের ফুটবল ইতিহাসকে বদলে দেয়।
স্পেনের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপাও এসেছিল এমনই এক মুহূর্তে। ২০১০ সালে জোহানেসবার্গে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের ১১৬তম মিনিটে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার গোল আজও স্প্যানিশ ফুটবলের সবচেয়ে স্মরণীয় দৃশ্যগুলোর একটি।
১৬ বছর পর, সেই উত্তরাধিকার নতুন করে বহন করলেন ফেরান তোরেস।
এক গোলের ব্যবধানে নির্ধারিত বিশ্বকাপ ফাইনালের জয়সূচক গোলদাতারা
১৯৩৪ ইতালি ২–১ চেকোস্লোভাকিয়া (অতিরিক্ত সময়) অ্যাঞ্জেলো স্কিয়াভিও
১৯৫০ উরুগুয়ে ২–১ ব্রাজিল আলসিদেস গিগিয়া
১৯৫৪ পশ্চিম জার্মানি ৩–২ হাঙ্গেরি হেলমুট রাহন
১৯৭৪ পশ্চিম জার্মানি ২–১ নেদারল্যান্ডস গার্ড মুলার
১৯৮৬ আর্জেন্টিনা ৩–২ পশ্চিম জার্মানি হোর্হে বুরুচাগা
১৯৯০ পশ্চিম জার্মানি ১–০ আর্জেন্টিনা আন্দ্রেয়াস ব্রেমে
২০১০ স্পেন ১–০ নেদারল্যান্ডস (অতিরিক্ত সময়) আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা
২০১৪ জার্মানি ১–০ আর্জেন্টিনা (অতিরিক্ত সময়) মারিও গ্যোটসে
২০২৬ স্পেন ১–০ আর্জেন্টিনা (অতিরিক্ত সময়) ফেরান তোরেস
ইতিহাস বলছে, এক গোলের ব্যবধানে সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ ফাইনাল জিতেছে জার্মানি (পশ্চিম জার্মানিসহ)। চারবার তারা এমন নাটকীয় জয় উদযাপন করেছে। এখন সেই নাটকীয় জয়ের তালিকায় নিজেদের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় যোগ করেছে স্পেন।
সংখ্যার বাইরেও ফেরান তোরেসের গোলের গুরুত্ব
একসময় স্পেনের হয়ে নিয়মিত একাদশে নিজের জায়গা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়া এই ফরোয়ার্ড বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে বদলি হিসেবে নেমে এমন একটি মুহূর্ত উপহার দিলেন, যা হয়তো তার পুরো ক্যারিয়ারকে নতুনভাবে পথ দেখাবে।
ফুটবলে কিছু গোল শুধু স্কোরলাইন বদলায়। কিছু গোল বদলে দেয় একটি দেশের ইতিহাস। আর খুব অল্প কয়েকটি গোল একজন খেলোয়াড়কে কিংবদন্তিতে পরিণত করে।
২০২৬ সালের সেই নিউ জার্সির রাতে, ফেরান তোরেস ঠিক তেমনই একটি গোল করেছিলেন। তাঁর নাম এখন ইনিয়েস্তা, গ্যোটসে, ব্রেমে, বুরুচাগা, গার্ড মুলার এবং গিগিয়াদের পাশে—বিশ্বকাপ ফাইনালের সেই বিরল নায়কদের সারিতে, যাদের একটি শট কোটি মানুষের স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে থাকে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









