২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমে বাংলাদেশ যে দৃশ্যের জন্ম দিয়েছে, তা হয়তো সিরিজ শুরুর আগে অনেকের কল্পনাতেও ছিল না। ডারউইনে প্রথম টেস্টের দুই দিন শেষে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ তুলেছে ৬ উইকেটে ৩৫১ রান। ফলে হাতে চার উইকেট রেখে সফরকারীদের লিড ১৫৩ রান। বল হাতে হাসান মাহমুদের ক্যারিয়ারসেরা ৬ উইকেটের পর ব্যাট হাতে তানজিদ হাসান তামিমের ঐতিহাসিক ১০১—দুই দিনেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই বাংলাদেশের হাতে।
এই পারফরম্যান্সে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশের পেস আক্রমণ। সাবেক অধিনায়ক ও পেস বোলিং অলরাউন্ডার খালেদ মাহমুদ সুজন প্রথম দিনই হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেনের বোলিংয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। তার মতে, অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে বিদেশি কোনো দলের পেসারদের এত দ্রুত সঠিক লাইন-লেন্থ খুঁজে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বোলিং করতে দেখা বিরল। তিনি এটিকে কোনো ‘ফ্লুক’ নয়, বরং দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, সঠিক পরিকল্পনা ও পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের ফল হিসেবে দেখেছেন।
সুজনের বিশ্লেষণে বাংলাদেশের সাফল্যের মূল জায়গাটি ছিল ‘ধৈর্য ও নিয়ন্ত্রণ’। তার মতে, অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা সাধারণত আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে চায়। কিন্তু বাংলাদেশের পেসাররা দীর্ঘ সময় ভালো লেন্থে, উইকেট-টু-উইকেট এবং সুইং করিয়ে বল করায় সেই আক্রমণাত্মক পরিকল্পনাই অস্ট্রেলিয়ার জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে হাসান মাহমুদের ইনসুইং-আউটসুইং নিয়ন্ত্রণ, তাসকিনের ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘ ইনজুরির পর এবাদতের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়াকে তিনি আলাদা করে উল্লেখ করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের এই বোলিং দেখে শুধু বাংলাদেশের সাবেকরাই নন, অস্ট্রেলিয়ার সাবেকরাও বিস্মিত। সাবেক অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নার বাংলাদেশের পেসারদের দ্রুত কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং নিখুঁত বোলিংয়ের প্রশংসা করেছেন। আর সাবেক অস্ট্রেলিয়ান লেগ স্পিনার কেরি ও’কিফি প্রথম দিনটিকে বাংলাদেশের ‘টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম সেরা দিন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, বাংলাদেশের পারফরম্যান্স অস্ট্রেলিয়ার জন্য একটি পরিষ্কার বার্তা—বাংলাদেশ সেখানে শুধু খেলতে যায়নি, লড়াই করতেই গেছে।
ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রেও বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ছবি দেখা যাচ্ছে। সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল সিরিজ শুরুর আগে জিম্বাবুয়ে সফরের ব্যর্থতাকে অতিরিক্ত বাউন্স ও কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তার মতে, অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে প্রস্তুতি ম্যাচ এবং আগেভাগে কন্ডিশনে যাওয়ার সুযোগ থাকায় ব্যাটাররা এবার নিজেদের প্রস্তুত করার ভালো সুযোগ পেয়েছে। আশরাফুল তখনও বলেছিলেন, জিম্বাবুয়ের অভিজ্ঞতা অস্ট্রেলিয়া সিরিজে কাজে লাগতে পারে এবং একটি খারাপ সিরিজের কারণে দলের ওপর আস্থা হারানোর কারণ নেই।
সেই আশার প্রতিফলনই যেন দেখা গেল দ্বিতীয় দিনে। ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমে তানজিদ হাসান তামিম মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজলউড ও নাথান লায়নের মতো বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে ১০১ রানের ইনিংস খেলেছেন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সেঞ্চুরি করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার হয়েছেন তিনি। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত টেস্ট ইনিংস ছিল হান্নান সরকারের ৭৬ রান, যা তানজিদ ছাড়িয়ে গেছেন।
তানজিদের সেঞ্চুরির পর সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালের নামও আলোচনায় এসেছে। ডারউইনে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় তামিমের চোখেও এখন স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছে। ম্যাচের পরিস্থিতি নিয়ে তার বক্তব্যের সারকথা—বাংলাদেশকে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে পরের কয়েকটি সেশনে, কারণ এই উইকেটে সময় গড়ানোর সঙ্গে ব্যাটিং আরও সহজ হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়া সিরিজ নিয়ে এর আগেই আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার। তার মূল্যায়ন ছিল, অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের অন্যতম সেরা দল হলেও বাংলাদেশকে আলাদা কোনো ক্রিকেট খেলতে হবে না; নিজেদের সেরা ক্রিকেট খেলতে পারলেই অস্ট্রেলিয়াকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব। আগেভাগে অস্ট্রেলিয়া গিয়ে কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
দুই দিনের ক্রিকেটে বাশারের সেই আত্মবিশ্বাসের বাস্তব রূপই যেন দেখা যাচ্ছে। প্রস্তুতি ম্যাচে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার পর মূল টেস্টে বাংলাদেশের এমন ঘুরে দাঁড়ানোও বিশেষ তাৎপর্যের। সাবেক ভারতীয় স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিনও বাংলাদেশের এই পাল্টে যাওয়া পারফরম্যান্সকে বিস্ময়কর হিসেবে উল্লেখ করেছেন—প্রস্তুতি ম্যাচের ব্যর্থতা থেকে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে অস্ট্রেলিয়াকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেওয়া তার কাছে টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্যেরই উদাহরণ।
তবে সাবেকদের প্রশংসার মাঝেও সতর্কতার সুর সবচেয়ে স্পষ্ট সুজনের কথায়। প্রথম দিনের তিন সেশন বাংলাদেশ জিতলেও তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, টেস্ট ম্যাচে তখনও অনেক ক্রিকেট বাকি ছিল। তার হিসাব ছিল, আরো কয়েকটি সেশন একইভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে তবেই জয় বাস্তব সম্ভাবনায় পরিণত হবে।
দুই দিন শেষে অবশ্য সেই সম্ভাবনাই এখন আরও উজ্জ্বল। হাসান মাহমুদের নেতৃত্বে পেসারদের আগুনঝরা বোলিং, তানজিদের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি, মুমিনুল হকের ৪৯ এবং নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ রানের ইনিংস বাংলাদেশকে ১৫৩ রানের লিড এনে দিয়েছে। মেহেদী হাসান মিরাজ ৩২ রানে অপরাজিত, সঙ্গে আছেন হাসান মাহমুদ। অর্থাৎ তৃতীয় দিনে বাংলাদেশের হাতে আরও রান যোগ করার সুযোগ রয়েছে।
সাবেকদের বক্তব্যগুলো পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের এই সাফল্যের একটি অভিন্ন ছবি পাওয়া যায়—‘বোলিংয়ে পরিকল্পনা, ব্যাটিংয়ে ধৈর্য এবং কন্ডিশনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া।’ বছর কয়েক আগেও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে কি না। ডারউইনের প্রথম দুই দিন সেই প্রশ্নের অন্তত প্রাথমিক উত্তর দিয়েছে। এখন বাংলাদেশের সামনে কাজ একটাই—সাবেকদের প্রশংসাকে ইতিহাসে পরিণত করা। আর সেটির জন্য তৃতীয় দিনটিই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









