অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জেতা—বাংলাদেশের ক্রিকেটে এত দিন কথাটা ছিল ভবিষ্যৎ কালের। রোববার ডারউইনে সেই ভবিষ্যৎ বর্তমান হয়ে গেল। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে গিয়ে বাংলাদেশ শুধু জিতলই না, বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট দলের বিপক্ষে জিতল এমন দাপটে, যাতে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক তারকারাও বিস্ময় লুকাতে পারলেন না।
মারারা স্টেডিয়ামে ৫৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৪.২ ওভারেই জয় নিশ্চিত করে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। জয় ৯ উইকেটে। অর্থাৎ ম্যাচের চার দিনজুড়ে বাংলাদেশই যেন ছিল চালকের আসনে। হাসান মাহমুদের প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট, তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরি, বাংলাদেশের ৪২৬ রানের বড় লিড, এরপর মেহেদী হাসান মিরাজের পাঁচ উইকেট—সব মিলিয়ে এটি এমন এক জয়, যাকে কেবল অঘটন বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। অস্ট্রেলিয়াকে তাদের ঘরের মাঠে প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পেছনে ফেলেই জয়টি পেয়েছে বাংলাদেশ।
এই জয় তাই শুধু বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে উৎসবের কারণ হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে টেলিভিশন স্টুডিও—ক্রিকেটের সাবেক তারকারা একে একে বলতে শুরু করেছেন, বাংলাদেশকে এত দিন যে জায়গায় রাখা হতো, সেই জায়গাটা এবার নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
‘মোমেন্টাস’—ইয়ান বিশপের চোখে
ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক পেসার ও জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকার ইয়ান বিশপ এই জয়কে বলেছেন বাংলাদেশের জন্য যুগান্তকারী অর্জন।
বিশপের চোখে অবশ্য জয়টা কোনো একজনের নয়। মেহেদী হাসান মিরাজ, তানজিদ হাসানসহ অনেকের অবদান তিনি আলাদা করে উল্লেখ করেছেন। তবে হাসান মাহমুদের কথা বলতে গিয়ে আরও এক ধাপ এগিয়েছেন। তার মতে, পুরোপুরি সুস্থ থাকলে হাসান কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের একজন ভালো ‘লাইন বোলার’; ডারউইনে সেই বোলারই বড় মঞ্চে নিজের সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছেন। কোচ ফিল সিমন্স ও তার দলকেও অভিনন্দন জানিয়েছেন বিশপ।
বিশপের কথায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত আছে। বাংলাদেশের জয়কে তিনি আর ‘একদিনের অঘটন’ হিসেবে দেখছেন না। বরং দীর্ঘদিনের পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছেন।
ওয়াসিম জাফর: ‘এটা শুধু জয় নয়, একটা ঘোষণা’
বাংলাদেশের সঙ্গে আগে কাজ করা ভারতের সাবেক ওপেনার ওয়াসিম জাফরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। তার চোখে, অস্ট্রেলিয়াকে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবার হারানো বাংলাদেশের ক্রিকেটে ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
জাফর বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন তানজিদ হাসান, হাসান মাহমুদ, মেহেদী হাসান মিরাজ ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে। তার ভাষায়, এটি শুধু একটি জয় নয়; বিশ্ব ক্রিকেটের মঞ্চে বাংলাদেশের উন্নতির একটি ‘স্টেইটমেন্ট’।
শব্দটা গুরুত্বপূর্ণ—‘স্টেটমেন্ট’। কারণ বাংলাদেশ এর আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডেতে সাফল্য পেয়েছে, ২০১৭ সালে টেস্টেও অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয় ছিল অধরাই। এবার সেই দরজাটাও খুলে গেল।
কেভিন পিটারসেনের বিস্ময়— ‘বাংলাদেশ ওয়াও’
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক কেভিন পিটারসেনের প্রতিক্রিয়া ছিল অনেক ছোট। কিন্তু হয়তো সেই ছোট্ট প্রতিক্রিয়াটিই সবচেয়ে বেশি কথা বলে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন—‘বাংলাদেশ ওয়াও’।
একজন সাবেক ইংলিশ অধিনায়কের কাছ থেকে বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া-বিজয়কে নিয়ে এই এক শব্দের বিস্ময়ও বলে দেয়, ডারউইনের ফলটা ক্রিকেটবিশ্বে কী ধরনের আলোড়ন তুলেছে।
লিসা স্টালেকার: আভাসটা তিনি আগেই পেয়েছিলেন
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক নারী ক্রিকেটার লিসা স্টালেকারের প্রতিক্রিয়ায় অবশ্য বিস্ময়ের সঙ্গে ছিল ভবিষ্যদ্বাণীর ছাপও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘরের মাঠের ওয়ানডে পারফরম্যান্স, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পরই তার মনে হয়েছিল, টেস্ট সিরিজটি যতটা একপেশে ভাবা হচ্ছিল, ততটা হবে না।
ডারউইনের জয়ের পর তিনি বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়ে লিখেছেন, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজটি ‘সবাই যতটা ভেবেছিল তার চেয়ে কঠিন’ হবে—এমনটাই তিনি আগে মনে করেছিলেন।
সেই অনুমান যে এতটা সত্যি হবে, সম্ভবত স্টালেকারও ভাবেননি।
অশ্বিনের চোখে আসল কারণ—ডারউইনের কন্ডিশন
ভারতের সাবেক অফ স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিন বাংলাদেশের জয়কে দেখেছেন একটু অন্যভাবে। তিনি বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেছেন, পাশাপাশি বলেছেন, এই ম্যাচটি আবারও দেখাল নির্দিষ্ট টেস্ট ভেন্যুর গুরুত্ব। ডারউইনের কন্ডিশন অস্ট্রেলিয়াকেই কিছুটা চমকে দিয়েছে—এমন পর্যবেক্ষণ তার।
তবে কন্ডিশন বাংলাদেশের পক্ষে ছিল বলেই জয় এসেছে—এমন সরল ব্যাখ্যায় আটকে থাকলে ডারউইনের চার দিনের গল্পটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কন্ডিশন ছিল দুদলের জন্যই। পার্থক্যটা তৈরি করেছে কে সেই কন্ডিশনকে ভালোভাবে ব্যবহার করেছে।
প্রথম দিনেই হাসান মাহমুদের ৬ উইকেট তার বড় প্রমাণ। পরে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানেরা ৪২৬ করে যে ২২৮ রানের লিড এনে দেন, সেটিই ম্যাচের মোড় স্থায়ীভাবে ঘুরিয়ে দেয়।
ড্যামিয়েন ফ্লেমিং: ‘বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়’
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পেসার ড্যামিয়েন ফ্লেমিংয়ের মন্তব্যে ছিল পরাজয়ের স্বীকারোক্তি এবং বাংলাদেশের প্রশংসা—দুটিই।
তিনি লিখেছেন, ডারউইন বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায় হয়ে গেল। তার ভাষায়, বাংলাদেশ খেলেছে ‘গিফট, ডিসিপ্লিন এন্ড স্কিল’—লড়াই, শৃঙ্খলা ও দক্ষতার ক্রিকেট। অস্ট্রেলিয়ার ঘরের মাঠে এত বড় ধাক্কা তিনি অনেক দিন দেখেননি বলেও মন্তব্য করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক একজন পেসারের মুখে বাংলাদেশের পেস আক্রমণের প্রশংসা—জয়টির গুরুত্ব বোঝার জন্য এর চেয়ে ভালো প্রতীক আর কী হতে পারে?
মার্ক ওয়াও: ‘অস্ট্রেলিয়ায় আমার মনে পড়া সবচেয়ে বড় অঘটন’
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ব্যাটসম্যান মার্ক ওয়াও তো আরও এক ধাপ এগিয়েছেন। ফক্স ক্রিকেটে তিনি বলেছেন, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তার মনে পড়া সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর একটি এটি। এমনকি ওয়েস্ট ইন্ডিজের গ্যাবায় সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক জয়ের সঙ্গেও তুলনা করেছেন তিনি।
রেকর্ডের দিকে তাকালেও কেন এমন মন্তব্য, তা বোঝা যায়। অস্ট্রেলিয়া ঘরের মাঠে ১৯৮ রানে অলআউট। বাংলাদেশ ৪২৬। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ২৮৪। আর বাংলাদেশের সামনে মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যও এক উইকেট হারিয়ে পেরিয়ে গেছে তারা।
অর্থাৎ জয়টা শুধু স্কোরকার্ডের নয়, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণেরও।
পন্টিংয়ের বিস্ময়, হেইডেনের লজ্জা
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক রিকি পন্টিংয়ের প্রতিক্রিয়াও ছিল বাংলাদেশের জন্য বড় স্বীকৃতি। তিনি স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশ যেভাবে খেলেছে, তা তাকে সত্যিই বিস্মিত করেছে। বাংলাদেশের পেস, স্পিন ও ব্যাটিং—তিন বিভাগেই আধিপত্যের প্রশংসা করেছেন তিনি। মেহেদী হাসান মিরাজের অলরাউন্ড পারফরম্যান্সও আলাদা করে উল্লেখ করেছেন।
আরেক অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি ম্যাথু হেইডেনের মন্তব্যে ছিল নিজেদের দলের জন্য হতাশা। তার মতে, অস্ট্রেলিয়ার এমন পারফরম্যান্স তিনি আশা করেননি; এটি অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের জন্য ‘এ্যামবেরেসিং মুমেন্ট’। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রশংসা করেছেন তিনি।
বাংলাদেশের জন্য এর চেয়ে তৃপ্তির আর কী হতে পারে—অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তিরাই যেখানে নিজেদের দলের পারফরম্যান্সের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করছেন।
ডারউইনে বাংলাদেশ শুধু অস্ট্রেলিয়াকে হারায়নি। চার দিনের ক্রিকেটে একবারও মাথা নিচু করেনি।
আর সেই কারণেই হয়তো কেভিন পিটারসেনের দুটি শব্দই যথেষ্ট—
‘বাংলাদেশ ওয়াও’।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









