বাংলাদেশের ফুটবলের প্রতি মানুষের আবেগ বরাবরই মুগ্ধ করেছে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার ক্লদিও ক্যানিজিয়াকে। ঢাকায় এসে সেই ভালোবাসা আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের ফুটবল, জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ, বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন, হামজা চৌধুরী এবং আর্জেন্টিনার বর্তমান ফুটবল নিয়েও কথা বলেছেন সাবেক এই তারকা।
বাংলাদেশে এসে ক্যানিজিয়া সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছেন এ দেশের মানুষের ফুটবলপ্রেমে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের সমর্থকদের ভালোবাসাকে তিনি দেখছেন বিরল এক সম্পর্ক হিসেবে। ভৌগোলিকভাবে দুই দেশ হাজার হাজার মাইল দূরে হলেও ফুটবল কীভাবে মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে, বাংলাদেশের সমর্থকদের মধ্যে তারই উদাহরণ দেখেছেন তিনি।
বাংলাদেশের বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা নিয়েও আশাবাদী ক্যানিজিয়া। তার মতে, বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেওয়ার পথ কঠিন হলেও স্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকা উচিত নয়। বর্তমানে বিশ্বকাপে ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে—এ বিষয়টিকেও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য বাড়তি সুযোগ হিসেবে দেখছেন তিনি।
ক্যানিজিয়ার মতে, বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে খেলতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি খেলোয়াড় তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু স্থানীয় পর্যায়ে নয়, বাংলাদেশের প্রতিভাবান ফুটবলারদের ইউরোপের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় খেলার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এতে তারা আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় দলের জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতাও অর্জন করতে পারবেন।
বাংলাদেশ জাতীয় দলের অন্যতম আলোচিত ফুটবলার হামজা চৌধুরী সম্পর্কেও ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন ক্যানিজিয়া। ইংলিশ ফুটবলে খেলা হামজাকে বাংলাদেশের জন্য বড় সম্পদ হিসেবে দেখছেন তিনি। তার মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নতি করতে হলে বাংলাদেশের আরও খেলোয়াড়কে ইউরোপের শক্তিশালী লিগে খেলার সুযোগ করে দিতে হবে।
বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা সমর্থকদের প্রশংসাও করেছেন ক্যানিজিয়া। বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের মানুষের উচ্ছ্বাসের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আর্জেন্টিনার সঙ্গে বাংলাদেশের সমর্থকদের সম্পর্ক সত্যিই অসাধারণ। আর্জেন্টিনার জয়-পরাজয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ জড়িয়ে থাকাটা তাকে সবসময়ই বিস্মিত করেছে।
আর্জেন্টিনার বর্তমান ফুটবল প্রসঙ্গে আলোচনায় স্বাভাবিকভাবেই এসেছে লিওনেল মেসির নাম। ২০৩০ বিশ্বকাপে মেসিকে দেখা যাবে কি না, সে বিষয়ে ক্যানিজিয়ার মত—তখন মেসির বয়স অনেক বেশি হয়ে যাবে, তাই খেলা কঠিন হতে পারে। তবে মেসির মতো একজন ফুটবলারের ক্ষেত্রে অসম্ভব বলে কিছু নেই বলেও মনে করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটা মেসির নিজের ওপরই নির্ভর করবে।
মেসি, দিয়েগো ম্যারাডোনা ও পেলের মধ্যে কে সেরা—এমন প্রশ্নেরও সরাসরি উত্তর দেননি ক্যানিজিয়া। তার মতে, তিনজনই ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা প্রতিভাদের মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে ম্যারাডোনা ও মেসি দুজনই আর্জেন্টিনার হওয়ায় সেটিকে দেশের জন্য বড় গর্ব হিসেবে দেখেন তিনি।
নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের আলোচিত ২০০২ বিশ্বকাপের লাল কার্ডের প্রসঙ্গও উঠে আসে। ক্যানিজিয়ার মতে, ওই ঘটনায় রেফারির সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে রেফারির ভুলের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা তার ছিল এবং ২০০২ সালের ঘটনাটিও তার কাছে তেমনই একটি ঘটনা।
বাংলাদেশ জাতীয় দলের সঙ্গে ভবিষ্যতে কাজ করার সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেছেন ক্যানিজিয়া। এ মুহূর্তে তার কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আসেনি বলে জানান তিনি। তবে ভবিষ্যতে এমন সুযোগ এলে বিষয়টি বিবেচনা করার ইঙ্গিত দিয়েছেন আর্জেন্টিনার সাবেক এই তারকা।
বাংলাদেশের ফুটবল এখনো আন্তর্জাতিক সাফল্যের অপেক্ষায়। সেই জায়গা থেকে ক্যানিজিয়ার মতো বিশ্বখ্যাত ফুটবলারের ইতিবাচক মন্তব্য দেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তার কথায়, পথ কঠিন হলেও বাংলাদেশের বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে—আর সেই স্বপ্ন বাস্তব করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রতিভার সঠিক পরিচর্যা এবং আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলের সঙ্গে নিয়মিত সংযোগ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









