ম্যানচেস্টার সিটির জন্য রাতটি ছিল নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার। মাঠের বাইরে আর্থিক অনিয়মের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ক্লাবটি যখন সংকটের মুখে, তখন তাদের ঘরের মাঠে ফেরার মুহূর্তটি হয়ে উঠেছিল প্রতিরোধের প্রদর্শনী।
বার্তা স্পষ্ট—বাইরের পৃথিবী যা-ই বলুক, সিটি একসঙ্গে আছে। কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো মাঠের বাইরের সব আয়োজনকে মুহূর্তে ম্লান করে দেয়। পিএসজির বিপক্ষে প্রথমার্ধে ঠিক সেটিই ঘটল।
দশ বছর ধরে যে ক্লাবকে সাফল্যে সাজিয়েছেন পেপ গার্দিওলা, সেই ইতালীয় নয়, কাতালান কোচ ফিরলেন পরিচিত ইতিহাদ স্টেডিয়ামে—এবার দর্শকসারিতে। মাথায় ফ্ল্যাট ক্যাপ, পাশে ক্লাব চেয়ারম্যান খালদুন আল মুবারক ও প্রধান নির্বাহী ফেরান সোরিয়ানোকে সমর্থনের নীরব বার্তা। স্বাধীন কমিশনের রায়ে আর্থিক বিধি ভাঙার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও আপিলের মাধ্যমে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের লড়াইয়ে নেতৃত্বের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
গার্দিওলার নামে স্ট্যান্ডে জ্বলল ‘সিটিআইডি’—সিটি টিল আই ডাই। আতশবাজি আর আলোর প্রদর্শনীতে ম্যাচের আগে তৈরি হলো উৎসবের আবহ। কিন্তু বাঁশি বাজার পর সেই আত্মবিশ্বাসের সামনে দাঁড়াল লুইস এনরিকের পিএসজি।
ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নদের ফুটবল ছিল দ্রুত, সাহসী ও নির্মম। দেজিরে দুয়ে, উসমান দেম্বেলে ও ভিতিনিয়ার গোলে প্রথমার্ধেই ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল তারা। গ্যালারিতে গার্দিওলার নামে যে গর্জন উঠেছিল, প্রথম ১৫ মিনিটের মধ্যেই তা নেমে এল স্তব্ধতায়।
লিভারপুলের অ্যানফিল্ডে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে যে সিটি সংযম ও শৃঙ্খলার পরিচয় দিয়েছিল, নিজেদের মাঠে সেই দলকেই যেন অচেনা লাগছিল। পিএসজির চাপ সামলাতে গিয়ে খেলোয়াড়েরা বারবার দিশা হারাচ্ছিলেন। বিরতির স্কোরলাইন বরং সিটির প্রতি কিছুটা দয়ালু ছিল।
তবে দ্বিতীয়ার্ধে ছবিটা বদলাল। কোচ এনজো মারেস্কার তিনটি পরিবর্তন সিটিকে আরও আক্রমণাত্মক করে তুলল।
আর্লিং হলান্ড গোল করে আশার আলো জ্বালালেন। পরে গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মার ভুলে ব্যবধান কমানোর সুযোগও তৈরি হলো। সিটি একের পর এক আক্রমণ করল, শট নিল, গ্যালারিকে জাগিয়ে তুলল। কিন্তু প্রথমার্ধের ক্ষতি আর পূরণ হলো না। শেষ পর্যন্ত ৪-২ গোলে জিতল পিএসজি।
গার্দিওলা দর্শকসারিতে বসেও যেন ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তে জড়িয়ে ছিলেন। ইয়োশকো গভার্দিওলের হেড গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হলে তিনি মুখে হাত দিলেন; হলান্ড গোল করলে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুললেন। কোচ হিসেবে নয়, ফুটবলের এক নিবেদিত দর্শক হিসেবেও এমন উন্মত্ত ম্যাচ উপভোগ করার কথা তার।
মারেস্কা বললেন, পিএসজির সাহসী, খেলোয়াড়ে-খেলোয়াড়ে চাপ তৈরির কৌশলের বিরুদ্ধে তার দল দ্বিতীয়ার্ধে যথেষ্ট সুযোগ তৈরি করেছে। সিটির সাবেক ডিফেন্ডার নেদুম ওনুহা ম্যাচটিকে বললেন দুর্দান্ত বিনোদন, তবে স্বাভাবিক ফুটবল নয়—দুই দলের সেরা সময় যেন একই সঙ্গে আসেনি।
এনরিকের জন্য এটি ছিল আরেকটি বড় জয়। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে লিভারপুল, অ্যাস্টন ভিলা, টটেনহ্যাম ও আর্সেনালের বিপক্ষেও তার দল নিজেদের শক্তি দেখিয়েছে। সিটির রাতটি তাই শুধু হার নয়; এটি দুই বিপরীত বাস্তবতার সংঘর্ষ—মাঠের বাইরে আত্মপক্ষসমর্থনে ব্যস্ত এক ক্লাব, আর মাঠে নিজেদের ফুটবল দিয়ে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এক দল।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









