স্টুটগার্টের মাঠে প্রথমার্ধে আতলেতিকো মাদ্রিদকে দেখে মনে হচ্ছিল, সিমিওনের দল যেন নিজেদের খেলাটাই ভুলে গেছে। প্রতিপক্ষের চাপ, একের পর এক ভুল পাস আর বল হারানোর তাড়াহুড়োয় দিশেহারা তারা। কিন্তু ফুটবলে কখনো কখনো একটি গোল শুধু স্কোরলাইন বদলায় না, বদলে দেয় একটি দলের শরীরী ভাষাও। হুলমান্ডের লাল কার্ডে দশজন হয়ে যাওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলে ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়ল আতলেতিকো। আর সেই প্রত্যাবর্তনের কেন্দ্রে ছিলেন হুলিয়ান আলভারেস—মৌসুমে নিজের প্রথম গোল করে যিনি যেন নিজের কাঁধ থেকেও নামালেন দীর্ঘ অপেক্ষার ভার।
সিমিওনের দল শুরু করেছিল নতুন ছকে। মৌসুমে প্রথমবারের মতো সামনে দুই স্বীকৃত স্ট্রাইকার—আলভারেস ও জোনাথন ডেভিড। চোটের কারণে কুটি রোমেরো না থাকায় রক্ষণে সুযোগ পান পাবিল। তবে কাগজে সাজানো ছক মাঠে নামতেই ভেঙে পড়ে স্টুটগার্টের আগ্রাসী ফুটবলে। পেছন থেকে বল বের করতে গিয়ে প্রথমেই বিপদে পড়েন লরেন্তে। মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মাথায় এল খানুসের নিচু শট ঠেকাতে হয় ইয়ান ওবলাককে।
সিমিওনে বুঝতে পারেন, প্রতিপক্ষের চাপ এভাবে চলতে থাকলে তার দলকে বড় ঝড়ের মুখে পড়তে হবে। তাই গোলরক্ষক ওবলাককে লম্বা বল খেলতে নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনাও কাজে এল না। উঁচু বল ধরে রাখার মতো খেলোয়াড় আতলেতিকোর খুব বেশি ছিল না। জুলিয়ানো কয়েকবার বল নামিয়ে দিতে পারলেও ডেভিড আকাশি লড়াইয়ে সুবিধা করতে পারছিলেন না। অন্যদিকে স্টিলারের নেতৃত্বে স্টুটগার্টের খেলোয়াড়েরা প্রতিটি দ্বিতীয় বলের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছিলেন। আতলেতিকোর রক্ষণ থেকে বল বেরোলেই তা আবার ফিরে আসছিল তাদের পায়ে। দুই মিনিটেরও কম সময়ে গোলমুখে তিনটি শট—প্রথমার্ধের শুরুতেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় স্বাগতিকদের হাতে।
প্রথম ৩০ মিনিটে আতলেতিকো বল পেয়েছে, কিন্তু খেলা গড়তে পারেনি। বারবার বল হারিয়ে নিজেরাই স্টুটগার্টের পাল্টা আক্রমণের সুযোগ তৈরি করেছে। বাঁ দিকে মিতেলশটাড, ফ্যুরিশ ও এল খানুসের সম্মিলিত আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল তাদের রক্ষণ। মাঝমাঠে বারিওস, বায়েনা কিংবা আলভারেস—কেউই খেলায় ছন্দ আনতে পারছিলেন না। বারিওস অন্তত বল চেয়ে, জায়গা তৈরি করে খেলার মধ্যে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তার সামনে এগোনোর পথ খুলছিল না।
শেষ পর্যন্ত আতলেতিকোর আরেকটি ভুল থেকেই গোল পায় স্টুটগার্ট। নিজেদের বক্সের কাছাকাছি বল হারান পাবিল। লেউয়েলিং সুযোগটি কাজে লাগিয়ে বাঁ পায়ে শট নেন। বলটি হুলমান্ডের গোড়ালিতে লেগে দিক বদলে ওবলাকের কাছের পোস্ট দিয়ে জালে ঢুকে যায়। বিরতির দশ মিনিট আগে পাওয়া গোলটি ছিল প্রথমার্ধের খেলায় স্টুটগার্টের আধিপত্যের যথার্থ প্রতিফলন।
প্রথম ৪৫ মিনিটে আতলেতিকোর উল্লেখযোগ্য আক্রমণ ছিল মাত্র তিনটি। কয়েকটি কর্নার ও থ্রো-ইন ছাড়া আক্রমণে তাদের উপস্থিতি ছিল সামান্য। সিমিওনে সেসব সেট পিস থেকে কিছু একটা ঘটানোর আশায় জুলিয়ানোকেও বক্সে বল পাঠাতে বলেছিলেন। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। বিরতিতে তাই সিদ্ধান্ত বদলাতে হলো তাকে। ডেভিডকে তুলে মাঠে নামালেন আদেমোলা লুকম্যানকে। নতুন আক্রমণভাগে আলভারেসের পাশে একজন গতিশীল খেলোয়াড় যোগ হওয়ায় আতলেতিকোর খেলায় ফিরল প্রাণ।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই বদলের ফল দেখা গেল। প্রথমার্ধে লম্বা বলে দলের সবচেয়ে কার্যকর খেলোয়াড় ছিলেন জুলিয়ানো। তাঁর হেড থেকে বল গেল বারিওসের কাছে। বারিওস দ্রুত লুকম্যানকে খুঁজে নিলেন। ইংলিশ ফরোয়ার্ডের নিচু ক্রস এসে পৌঁছাল পেনাল্টি স্পটে দাঁড়িয়ে থাকা আলভারেসের পায়ে। বাঁ পায়ের নিখুঁত, শক্তিশালী শটটি এত দ্রুত ও জোরে ছুটে গেল যে স্টুটগার্টের গোলরক্ষক সাইমেন যেন জায়গা থেকে নড়ারও সুযোগ পেলেন না।
আলভারেস দৌড়ে গিয়ে উদ্যাপন করলেন না। জায়গায় দাঁড়িয়েই মুঠি শক্ত করে ধরলেন। সেই উদ্যাপনে ছিল স্বস্তি, অপেক্ষার অবসান এবং নিজের কাছে ফিরে আসার আনন্দ। আগের কয়েকটি ম্যাচে গোলের কাছাকাছি গিয়েও বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলেন তিনি। পেনাল্টি বক্সের আশপাশে তার মুভমেন্ট ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল যথেষ্ট ভালো, কিন্তু গোল আসছিল না। এবার সেই বাধা কাটল। আতলেতিকোর হয়ে এটি তাঁর ৫০তম গোলও। গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে আর্সেনালের বিপক্ষে গোল করার পর থেকে তিনি ৪৯-এ আটকে ছিলেন।
গোলের পর আতলেতিকোকে অনেক বেশি সাবলীল দেখাচ্ছিল। স্টুটগার্টের তীব্রতাও যেন কিছুটা কমে এসেছিল। কিন্তু ঠিক যখন মনে হচ্ছিল, সিমিওনের দল ম্যাচে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে পারবে, তখনই বিপদ। মাঝমাঠে পাল্টা আক্রমণ থামাতে গিয়ে স্টিলারের ওপর বিপজ্জনক ফাউল করেন হুলমান্ড। সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে তাঁকে মাঠ থেকে বের করে দেন রেফারি।
ম্যাচের তখনও আধঘণ্টার বেশি বাকি। আতলেতিকোর সামনে আবার সেই পুরোনো পরীক্ষা—সংখ্যায় কম হয়ে প্রতিপক্ষের চাপ সামলানো। সিমিওনে জানেন, তার দলের পরিচয় শুধু আক্রমণাত্মক ফুটবলে নয়; কখন পিছু হটতে হবে, কখন জায়গা বন্ধ করে দিতে হবে, কখন সৌন্দর্যের বদলে টিকে থাকাটাই প্রধান কাজ হয়ে ওঠে—সেই হিসাবেও। দশজন হয়ে যাওয়ার পর তাই আতলেতিকো আবার ফিরে গেল পরিচিত দুর্গে।
বায়েনার বদলে কার্ডোসো, বারিওসের বদলে ওবেদ ভার্গাস এবং জুলিয়ানোর বদলে লে নরমাঁ ও সোরলথকে নামিয়ে দলকে নতুন শক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন সিমিওনে। লক্ষ্য ছিল পরিষ্কার: মাঝমাঠে জায়গা কমিয়ে দেওয়া, রক্ষণকে ঘন করা এবং স্টুটগার্টের আক্রমণের ঢেউ যতক্ষণ সম্ভব ঠেকিয়ে রাখা। আতলেতিকো তখন আর ম্যাচের সৌন্দর্য নিয়ে ভাবছিল না। তাদের কাছে প্রতিটি ক্লিয়ারেন্স, প্রতিটি ট্যাকল, প্রতিটি মুহূর্তের প্রতিরোধই হয়ে উঠেছিল গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত সেই পুরোনো দৃঢ়তাই তাদের বাঁচাল। স্টুটগার্টের মাঠে প্রথমার্ধে যে আতলেতিকো নিজেদের ছন্দ খুঁজে পাচ্ছিল না, সেই দলই একজন কম নিয়ে শেষ পর্যন্ত ড্র ধরে রাখল। আলভারেসের গোল তাদের ম্যাচে ফিরিয়েছিল; হুলমান্ডের লাল কার্ড তাদের আবার রক্ষণে ঠেলে দিয়েছিল। আর সেই চাপের মধ্যে সিমিওনের দল দেখাল, কখনো কখনো ফুটবলে টিকে থাকাটাও একধরনের জয়।
আলভারেসের জন্য এটি ছিল গোলের খরা কাটানোর মুহূর্ত। আতলেতিকোর জন্য, কঠিন মাঠ থেকে মূল্যবান পয়েন্ট নিয়ে ফেরার রাত। আর সিমিওনের জন্য, নিজের ফুটবলদর্শনের পুরোনো সত্যে ফিরে যাওয়ার আরেকটি উপলক্ষ: সব ম্যাচ জেতা যায় না, সব সময় আধিপত্যও করা যায় না। তবে পরিস্থিতি যখন প্রতিকূলে, তখন দলকে কীভাবে দাঁড় করিয়ে রাখতে হয়—সেই শিক্ষা তাঁর খেলোয়াড়েরা আবারও দিলেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









